সার কারখানা গেটে চাঁদাবাজি, চিহ্নিত চক্রের দৌরাত্ম্যে অসহায় শ্রমিকরা
রাজন্য রুহানি, জামালপুর : দেশের অন্যতম বৃহৎ দানাদার ইউরিয়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে অবস্থিত যমুনা সার কারখানা গেটে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে একটি চিহ্নিত চক্র। শ্রমিকরা বেতন তুলে কারখানার ১ নম্বর গেটে আসার পর ওই চক্রটি তাদের ইচ্ছেমতো টাকা আদায় করলেও রহস্যজনক কারণে নিরব ভূমিকা পালন করছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। এতে সারা মাস শ্রম দিয়ে শ্রমিকদের কেউ কেউ অর্ধেক আবার পুরো বেতনের অংশ চাঁদাবাজদের দিয়ে শূন্য পকেটে বাড়ি ফিরেছেন কেউ কেউ। এ বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দিয়েও মেলেনি প্রতিকার। উল্টো বেড়ে গেছে শ্রমিকদের হেনস্তা এবং চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য। এমনই সব অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শ্রমিকরা।
শ্রমিকদের অভিযোগ, আমাদের বেতনে অলিখিত কর বসিয়েছে চিহ্নিত ওই চক্রটি। চাঁদাবাজরা বলেছে 'তোরা কামাই করস, আমরা বেকার, কামাই থেকে অর্ধাঅর্ধি ভাগ দিওন লাগবো।' তারা কারো কাছ থেকে ৪ হাজার, কারো কাছ থেকে ৮ হাজার, কেউ দিতে না চাইলে তাদের কাছ থেকে পুরো বেতনই ছিনিয়ে নিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শ্রমিক জানিয়েছেন, গত ১২ মে সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত যমুনা সারকারখানার দৈনিক ভিত্তিক কর্মচারীদের বেতন হয়। বেতন তুলে গেটে আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের পথরোধ করে চিহ্নিত চক্রের উজ্জ্বল, অংকন, ইউসুফ, হালিম, মজনু ও জুলহাসসহ ২৫/৩০ জন ব্যক্তি। তারা প্রত্যেক শ্রমিকের বেতন থেকে ইচ্ছেমতো টাকা ছিনিয়ে নেয়। যারা দিতে অনীহা প্রকাশ করেছিল, তাদের চাকরি খাওয়াসহ প্রাণনাশের হুমকি দেন তারা। এ সময় চক্রের সদস্যরা জোরজবরদস্তি করে প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে ৪ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়।
তারা আরও জানায়, আমাদের ডে শিফটে শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ১৬৫ জন। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ স্থানীয় হলেও ওই চক্রের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় না কেউ। এ চক্রটিই যমুনার গেট এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে সবসময়। ফ্যাসিস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ওই চক্রটি চাঁদাবাজিতে মেতে উঠলেও নিরুপায় হয়ে এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কিছুতেই পেরে উঠছেন না ভুক্তভোগী শ্রমিকরা। এর আগে কারখানা কর্তৃপক্ষসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার মেলেনি। উল্টো অভিযোগকারী শ্রমিকদের হেনস্থা করেছে ওই চক্রটি। এমনকি বেতনের বেশি অংশ ছিনিয়ে নিয়েছে তারা। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী শ্রমিকরা কোনো প্রতিকার না পেয়ে প্রতিমাসে এই চাঁদাবাজি ঘটনা নীরবে সহ্য করে যাচ্ছেন।
একজন শ্রমিক কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, বেতন পেয়ে ছেলেমেয়ের বেতন ও সাংসারিক কাজে ব্যয় করার কথা ছিল। চাঁদাবাজরা আমার বেতনের ১৭ হাজার টাকা থেকে ৬ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে। এতে করে ছেলেমেয়ের বেতন দিতে পারি নাই। সংসার চালানোও দায় হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে ঋণ করতে করতে ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে!
কারখানা এলাকার লোকজন জানায়, ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই দরিদ্র এবং নিরীহশ্রেণির। তাদের পক্ষে প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। শ্রমিক ইউনিয়নও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কখনো! কারখানা কর্তৃপক্ষও নীরব। যদিও কারখানার পাশেই পুলিশ ফাঁড়ি। চাঁদাবাজির সময় শ্রমিকদের সাহায্যে কাউকেই পাওয়া যায় না। বেতন দেয়ার নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হয় ওই চক্রটি।
প্রতিমাসে বেতনখেঁকো চাঁদাবাজদের কারণে সার কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চাপা অসন্তোষ এবং প্রত্যেকের হৃদয়ে বয়ে যাচ্ছে নীবর কান্না! দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিলে কারখানা এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।
ঘটনার বিষয়ে যমুনা সার কারখানা শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলম তালুকদার সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আমরা বিষয়টি শুনেছি। তবে এটি সম্পূর্ণ কারখানা কর্তৃপক্ষের দেখভালের বিষয়।
যমুনা সার কারখানার জিএম (প্রশাসন) দেলোয়ার হোসেন ঘটনার বিষয়টি স্বীকার করে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বেতন থেকে টাকা কেটে রাখা বা চাঁদা আদায়ের বিষয়টি আমরা জেনেছি। এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ও দুঃখজনক ঘটনা। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট একটি পরিস্থিতি প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে জানান তিনি।
সরিষাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, মৌখিকভাবে বিষয়টি শুনলেও এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
(আরআর/এসপি/মে ২২, ২০২৬)
