# শহীদ পরিবারগুলোর মানবেতর জীবনযাপন


 

রূপক মুখার্জি নড়াইল : প্রমত্তা মধুমতী, নবগঙ্গা, বানকানা নদী বিধৌত নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ইতনা গ্রামে ১৯৭১’র ২৩ মে একটি ভয়াল দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকাররা লোহাগড়া উপজেলার পূর্বাঞ্চলের ইতনা গ্রামে একের পর এক ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। নির্বিচারে গুলি চালিয়ে শিশুসহ হত্যা করে হিরু মাস্টার, সফি উদ্দিন মোল্যা , তবি শেখ, হাদি সিকদার, নালু খাঁসহ ৩৯ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে। নিহতদের লাশ আগুনে ফেলে দিয়ে উল্লাস করে পাক সেনারা ও তাদের দোসররা। 

অথচ অপ্রিয় হলেও সত্য যে, মহান স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও গণহত্যায় নিহত শহীদ পরিবারগুলোর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি জোটে নাই। গণকবরগুলো অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। নামফলক ছাড়া গণহত্যার আর কোন স্মৃতি সংরক্ষিত নাই।

ইতিহাস থেকে জানা গেছে , লোহাগড়া উপজেলার মধুমতী নদী তীরবর্তী পাশাপাশি দুই গ্রাম ইতনা ও চরভাট পাড়া। এই দুই গ্রামে বসেই মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর ওপর আক্রমণের নানা পরিকল্পনা করত।

ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা এই দুই গ্রামে অবস্থান করে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাতেন। ২২ মে পাক সেনারা চরভাটপাড়া গ্রামে গানবোট নিয়ে হামলা চালায়, আগুন ধরিয়ে ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। এ সময় ওই গ্রামের সাহসী অনিল কাপালি পাহারায় নিয়োজিত একজন পাক সেনার রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে নদীতে ফেলে দিয়ে সাতরিয়ে ওপারের ইতনা গ্রামে চলে যায়। এ ঘটনার পর পাকসেনারা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে যে, অনিল কাপালির বাড়ি নদীর ওপারে ইতনা গ্রামে। শুরু হয় ইতনা গ্রামে পাক সেনাদের হামলার পরিকল্প

পাক-সেনাদের পরিকল্পনা মোতাবেক পরের দিন ২৩ মে ভোরে ফজরের আযানের সময় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর স্হানীয় রাজাকাররা গানবোট করে ইতনা গ্রামে ইতিহাসের এক জঘন্যতম গণহত্যা চালায়। গণহত্যায় শিশুসহ ৩৯ জন নারী-পুরুষ হত্যার শিকার হয়। ২৩ মে ইতনা গ্রাম প্রেতপুরীতে পরিণত হয়। নিহতদের কবর দেওয়ার মতো কোনো মানুষ ইতনা গ্রামে ছিল না। পরে নিহতদের আত্মীয়-স্বজন নিহত ৩৯ জনকে গ্রামেই গণকবর দিয়ে প্রাণ ভয়ে অন্যত্র পালিয়ে যান।

নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলায় ১৯৭১ সালে ২৩ মে ইতনা গ্রামে সংগঠিত গণহত্যার ইতিহাস অবিস্মরণীয় ঘটনা।

অথচ গণহত্যায় নিহতদের আজও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলে নাই।' নির্মাণ হয়নি কোনো স্মৃতিসৌধ। এ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে রয়েছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ।

১৯৯৪ সালের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ২৩ মের বীর শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে ইতনা গণগ্রন্থাগারের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত শিক্ষক ফিরোজ আহম্মদের উদ্যোগে ইতনা গ্রামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে গণহত্যায় নিহতদের নামের তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়। সেই থেকে প্রতি বছর ২৩ মে ইতনা গণগ্রন্থাগারের উদ্যোগে ইতনা গণহত্যা দিবস পালিত হয়ে আসছে।

এ বছরও ৭১-এর ২৩ মে গণহত্যায় নিহতদের স্মরণে লোহাগড়ার সাংবাদিক সমাজের উদ্যোগে শনিবার দুপুর ১টায় প্রেসক্লাবের হলরুমে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

(আরএম/এসপি/মে ২৩, ২০২৬)