মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু

সুদিন যখন দুয়ারে ছিল,
হাসির আলো চারিধারে,
কত আপন মুখ যে তখন
এসেছিল ফিরে কাছে।

স্বার্থের মধু লুটতে সবাই
ভিড় জমাত ঘরে,
সুখের রঙে ভেজা দিনে
শূন্যতা ছিল না অন্তরে।

সুবাসপিপাসু সেই মানুষগুলো
হাসিমুখে থাকত পাশে,
সুবাস পেলেই ভিড় করত
স্বার্থেরই আশেপাশে।

ক্ষমতার নেশায় মত্ত তারা
আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নে,
দম্ভের ডানায় ভর করে যেন
উড়ত অহংকারের গগনে।

সময়ের হঠাৎ নির্মম মোড়ে
সব আলো নিভে গেল,
চেনা পৃথিবীর আপন মানুষ
ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল।

মিথ্যা অপবাদের ভার বুকে নিয়ে
দাঁড়িয়ে রইল এক নিঃসঙ্গ প্রাণ,
চেয়ে দেখে—চেনা মুখগুলো কেমন করে
হারিয়ে যায় অচেনা অন্ধকারে।

দুঃসময়ের কালো মেঘ নামতেই
সবাই সরে যায় নীরবে,
কেউ কেউ আবার সূক্ষ্ম ছলে
ষড়যন্ত্র বোনে গোপনে।

একদিন যারা
বিশ্বাসের ভাষা বলত উচ্চস্বরে,
তাদের নীরবতা আজ
আরও গভীর করে নিঃসঙ্গতাকে।

চারদিকের বন্ধ দরজাগুলো
ধীরে ধীরে স্পষ্ট করে দেয়—
মানুষের ভিড়ে থেকেও
কত সহজে একা হয়ে যেতে হয়।

নিভে যাওয়া সময়ের ভেতর
শিকলঘেরা ছায়া নেমে আসে জীবনে,
স্বাধীনতার নীল জানালাগুলো
হারিয়ে যায় স্তব্ধ প্রহরে।

দীর্ঘ সেই নিঃশব্দ প্রাচীর
কতটা নির্মম হতে পারে—
তা শুধু অবরুদ্ধ হৃদয়ই জানে।

বন্ধ জানালার ওপাশে
পড়ে থাকে এক বিষণ্ন পৃথিবী।
এখানে সকাল আসে নিঃশব্দে,
রাত নামে দীর্ঘশ্বাস হয়ে।

স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের ভেতর
সময়ও যেন ক্লান্ত হয়ে বসে থাকে,
মানুষ ধীরে ধীরে
নিজের ছায়াকেও ভয় পেতে শেখে।

আপন যারা ছিল,
আজ তারা বহুদূরের মানুষ।
স্বার্থ ফুরোলেই সম্পর্কগুলো
কী সহজে রঙ বদলায়!

সুসময় ফিরবে বুঝলেই আবার
সাধু সেজে আসে কাছে,
মায়াভরা কথার আড়ালে
স্বার্থ লুকিয়ে হাসে।

সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে
এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে—
সবাই পাশে থাকে না
দুঃসময়ের অন্ধ পথে।

অনেক মুখ আসলে
মরুভূমির মরীচিকার মতো—
দূর থেকে জলের মতো লাগে,
কাছে গেলে থাকে শুধু শূন্যতা।

এই নিঃসঙ্গ বন্দিজীবনে
ধৈর্যই এখন একমাত্র সঙ্গী।
অন্ধকার যত গভীর হোক,
তবু বিশ্বাস এখনো বেঁচে আছে—
প্রতিটি রাতের শেষে
ভোর ঠিকই ফিরে আসে।

কখনো কখনো
জানালার সরু ফাঁক গলে
একটুকরো আলো এসে পড়ে মেঝেতে।
সেই আলো দেখে মনে হয়,
স্বাধীনতা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

হয়তো সময়ের নিষ্ঠুরতা
আজ থামিয়ে রেখেছে পথচলা,
তবু সত্যের পথ
একদিন খুলবেই।

মিথ্যার দেয়াল যত উঁচুই হোক,
তা কখনো চিরস্থায়ী নয়।
অন্যায়ের শিকল
একসময় মরিচা পড়ে ভেঙে যায়।

সত্য নদীর মতো ধৈর্যশীল,
ধীরে ধীরে নিজের পথ
নিজেই তৈরি করে নেয়।

একদিন এই অন্ধকার প্রহর
শেষ হবে ভোরের আলোয়,
দীর্ঘ বন্দিত্বের সব নিঃশ্বাস
মিশে যাবে মুক্ত বাতাসে।

চোখের কোণে জমে থাকা
সব আক্ষেপ ধুয়ে যাবে তখন,
মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে
জীবন শিখবে নতুন করে বাঁচতে।

সেদিন হয়তো পৃথিবী বুঝবে—
একজন মানুষকে থামিয়ে রাখা যায়,
কিন্তু সত্যকে নয়।

সত্য কখনো
দেয়ালের ভেতর আটকে থাকে না;
সে একদিন ঠিকই
আকাশ ছুঁয়ে ফিরে আসে আলোর মতো।


কবি আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু — প্রতিবাদের সাহসী কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার নির্মোহ ভাষ্যকার এবং মানবিক চেতনার এক অনন্য কবি। তাঁর লেখনী অন্যায়ের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলে বিবেকের উচ্চারণ, আর পাঠকের মনে সৃষ্টি করে গভীর ভাবনার আলোড়ন। কবিতা, কলাম ও সাংগঠনিক নেতৃত্বে তিনি নির্মাণ করে চলেছেন নিজস্ব সুপ্রতিষ্ঠিত মর্যাদা। তাছাড়াও প্রতিবাদের সাহসী কণ্ঠ, বাস্তবতার নির্মোহ ভাষ্যকার ও মানবিক চেতনার সুপ্রতিষ্ঠিত কবি।