মাদারীপুর প্রতিনিধি : সাইরেন বাজিয়ে এক এক করে চারটি লাশবাহী গাড়ি এসে থাকলো বাড়ির উঠোনো। পুরো এলাকা যেন শোকের ছায়ায় আবদ্ধ। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশির আহাজারিতে পুরো এলাকা স্তব্ধ। এক সাথে এমন মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেনা কেউ। মরদেহ একনজর দেখার জন্য সবাই ভীর করেন নিহতদের বাড়িতে। ফরিদপুরে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মাদারীপুরের একই পরিবারের ৪ জনসহ ৫ জন মারা যান। অসুস্থ ভাইকে চিকিৎসা করে সুস্থ করার জন্য পরিবারের সদস্যরা সাথে গেলেও, সবাইকে ফিরতে হয়েছে লাশ হয়ে। এমন হৃদয় বিদারক ঘটনায় সবাই শোকে ভেঙ্গে পড়েছে।

আজ রবিবার বিকেল চারটার দিকে নিহতদের লাশ গ্রামেরবাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের নিজ বাড়িতে এসে পৌছায়। এদিকে দাফন করার জন্য বাড়ির সামনে মসজিদের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে চারটি কবর সারিবদ্ধভাবে করা হয়েছে। বাদ মাগরিক জানাজা শেষে দাফন করা হবে।

নিহতরা হলেন- মাদারীপুর সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের হাজী মোহাম্মদ অহেদ মোল্লার বড় ছেলে বিএডিসি এর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা (৬৫) ও তার স্ত্রী বেলী বেগম (৪০), মেঝ ছেলে ব্যবসায়ি আলমগীর হোসেন মোল্যা (৪০) ও তার স্ত্রী খুরশিদা বেগম খুশি (৩৬)।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মেঝভাই আলমগীর হোসেন মোল্লা প্রায় দুইমাস আগে স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হয়ে যায়। দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে ফরিদপুর থেকে মাদারীপুরে আসেন। পরে রবিবার সকালে আবার আলমগীর অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত তাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য প্রথমে মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে অ্যাম্বুলেন্সযোগে ফরিদপুর ডায়াবেটিস হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন পরিবারের ৪ সদস্য।

পথিমধ্যে ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কের নগরকান্দা উপজেলার শংকরপাশা এলাকায় পৌঁছালে ঢাকাগামী বিআরটিসি পরিবহণের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান আলমগীর হোসেন মোল্লা ও তার স্ত্রী খুরশিদা বেগম খুশি, বড়ভাই জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্লা ও তার স্ত্রী বেলী বেগম। এই ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্স চালক মাদারীপুর শহরের হাসপাতাল রোড এলাকার বাসিন্দা কাওসার মাতুব্বর (২২) মারা যান।

খোজ নিয়ে আরো জানা যায়, নিহত জাহাঙ্গীর হোসেন মোল্যা বিএডিসি এর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন। তার এক ছেলে সিফাত হোসেন মোল্যা রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। মেয়ে সুইটি আক্তার মাদারীপুর সরকারী কলেজে অর্নাস পড়েন। অপর নিহত আলমগীর হোসেন মোল্যা সারের ব্যবসা করতেন। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে সুরভী আক্তার পড়াশুনা শেষ করে বিয়ে দিয়েছেন। আরেক মেয়ে স্বর্ণালী আক্তার দশম শ্রেণীতে পড়েন। ছেলে ছোট সিয়াম মোল্যা স্থানীয় একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়েন।

নিহতদের চাচা আ. হামিদ মাস্টার বলেন, এই মৃত্যু আমরা কিভাবে মেনে নিবো। একসাথে একই পরিবারের চারজন মারা যাওয়ায় পুরো গ্রাম যেন শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে। আমার বড় ভাই নিহতের বাবা হাজী মোহাম্মদ অহেদ মোল্লার অসুস্থ। অসুস্থার জন্য তার এক পা কেটে ফেলা হয়েছে। হুইল চেয়ারে চলাফেলা করেন। বয়স প্রায় একশ বছর। একা একা কিছুই করতে পারেন না। সবাই তার দেখা শুনা করলেও তার মেঝ ছেলে নিহত আলমগীর হোসেন মোল্লার স্ত্রী খুরশিদা তার শশুরের যতœ বেশি নিতেন। কিন্তু এখন এই বৃদ্ধ বাবার দেখা শোনা কে করবেন। তার তিন ছেলের মধ্যেই দুই ছেলে ও ছেলের বউ মারা গেছেন। এতে করে পুরো পরিবারটাই যেন শেষ হয়ে গেলো। এমন মৃত্যুর ঘটনা যেন কোন পরিবারের না আসে।

নিহতের পরিবেশি কামাল হোসেন বলেন, নিহত আলমগীর হোসেন মোল্যা ও তার স্ত্রী খুরশিদা বেগম খুশি অনেক শখ করে পছন্দমতো ডিজাইনে একটি একতলা বিল্ডিং করেছেন। ইতিমধ্যে ঘরের সমস্ত কাজ শেষ হয়েছে। ধবধবে সাদা রং করেছে বিল্ডিংয়ে। ঈদের আগেই নতুন ঘরে উঠার কথা ছিলো। কিন্তু তা আর হলো না। নতুন ঘরে যাবার আগেই চিরতরে দুনিয়া থেকে চলে গেলেন। তার দুই মেয়ে এক ছেলে। ছেলে সিয়াম ছোট, তার ৯ কি ১০ বছর বয়স। শারিরীকভাবে একটু সমস্যাও আছে ছেলেটার। এই ছোট ছেলেটা এখন মা-বাবা দুইজনকে হারালো।

নিহতদের এক আত্মীয় ফায়েক মুন্সি বলেন, এমন দুর্ঘটনা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। বিআরটিসি বাসের চালকের বিচার হওয়া উচিত। আর ফরিদপুর-বরিশাল সড়কটি চার লেন বা ছয় লেনে উন্নীতকরণ করা হলে এই সড়কে দুর্ঘটনা কম যাবে। এই সড়কটি সরু হওয়ায় দুর্ঘটনা লেগেই থাকে।

মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, একসঙ্গে একই পরিবারসহ পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনা খুবই দুঃখজনক। উপজেলা প্রাশসন নিহতদের পরিবারের পাশে থাকবে এবং প্রয়োজন হলে যে কোন ধরণের সহযোগিতা করবে।

(এএসএ/এসপি/মে ২৪, ২০২৬)