ফাত্তাহ তানভীর রানা


বহুবার নাম শুনেছিলাম তবুও কখনো যাওয়া হয়নি। কক্সবাজারের শেষ ভূমি সীমানায় অবস্থান। চ্যানেলের ওপারেই সোনাদিয়া দ্বীপ। দূর থেকে মহেশখালীও দেখা যায়। মহেশেখালি চ্যানেলকে অনেককে নাজিরারটেক নদীও বলতে শোনা গেছে। বালির মাঠ আর জেলেদের কলরব! এক অনিবার্য সত্যি আর প্রাকৃতিক মায়ায় ঘেরা নাজিরারটেক শুঁটকি পল্লী। যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাথে নিয়ে, সাহস আর পরিশ্রম করে সাধারণ মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।

গুগল ম্যাপস এ কক্সবাজার জিরো পয়েন্ট নাম দেখেই একটা শিহরণ জেগেছিল! নাজিরারটেক শুঁটকি পল্লীর ধূ ধূ বালির মাঠই হলো কক্সবাজার জিরো পয়েন্ট।

সুগন্ধা পয়েন্টের আল ফাত্তাহ হোটেল থেকে একটা অটো রিকশা রিজার্ভ করে রওনা হয়ে যাই। শহর পেরিয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দরের পেছন দিয়ে গ্রাম্য রাস্তায় এগিয়ে যাই। এক সময় নাজিরারটেক পেয়েও যাই। বালির মাঠের এক পাশ সমুদ্র, অন্যদিকে মহেশখালী চ্যানেল। নাজিরারটেক শুঁটকি পল্লীতে পর্যটকদের আনাগোনা নেই। যারা জেলেদের জীবন ও শুঁটকি উৎপাদনের প্রক্রিয়া জানতে চান, তারা আসেন। নাজিরারটেক সমুদ্র সৈকত এখনো তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। এটা এখনো একটা পল্লী, একটা গ্রাম আর শুটকি প্রক্রিয়ায় জন্য সুপরিচিত নাম৷

নাজিরারটেক বাংলাদেশের কক্সবাজারের একটি গ্রাম। এই গ্রাম কক্সবাজার জেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে। এখানে শুটকি মাছ প্রক্রিয়াকরণের একটি ইউনিট আছে। প্রক্রিয়াকরণ ইউনিটটি উপকূলীয় এলাকায় ১০০ একর জমির ওপর নির্মিত। বাংলাদেশের বৃহত্তম এই শুটকি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় নিয়মিত ২০০ টন শুটকি উৎপাদিত হয়। নাজিরারটেকের শুটকি মাছ উৎপাদন শিল্পে ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। কক্সবাজার জেলার ৩০ হাজার জেলে এখানে মাছ সরবরাহে নিয়োজিত রয়েছেন। শুটকি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প থেকে উৎপাদিত শুঁটকি দেশে বিক্রির পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হয়।

নাজিরারটেক শুটকি পল্লীতে শীত-বর্ষা সব ঋতুতেই মাছ ধরা চলমান থাকলেও বর্ষাকালে শুটকি উৎপাদন বন্ধ থাকে। জেলেদের কর্মব্যস্ততা সৈকতের সৌন্দর্যকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। নীল জলরাশির ওপর সূর্যের আলো, জেলেদের মাছ ধরার ট্রলার, বিভিন্ন পাখির উড়ে যাওয়া সব মিলিয়ে এক অনিন্দ্য পর্যবেক্ষণ! গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া ট্রলারকে ৮-১০ দিন পর্যন্ত সমুদ্রে থাকতে হয়। মহেশখালী চ্যানেল ও সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে প্রচুর বৈচিত্র্যময় সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়িসহ ইলিশ, রূপচাঁদা, ছুরি মাছ, লইট্যা, পোপা, ভেটকি, কোরাল, সুরমা, ম্যাকেরেল, দাতিনা, লাল কোরাল, লবস্টার উল্লেখযোগ্য।

নাজিরারটেক শুটকি পল্লীতে প্রাকৃতিক দূর্যোগ নিত্য সাথি। নৌকাডুবি, নৌকা থেকে মাঝি হারিয়ে যাওয়া বা নৌকায় দস্যুতা নতুন কিছু নয়। প্রতিদিন ভোর হয় জেলেরা ঘাটে নৌকা ভেড়ায়। মাছ শিকারে কেউ চলে যায় সৈকতে কেউবা মহেশখালী চ্যানেলে। কেউবা মাছ খালাসের কাজ করে। হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই শুরু হয় নতুন সকালের প্রস্তুতি। এভাবেই নাজিরারটেক শুটকি পল্লীর জেলে ও তাদের পরিবার শুটকি তৈরিতে অবদান রেখে চলছে যুগের পর যুগ ধরে।

দেশের সমুদ্রসীমা বর্তমানে সুনির্দিষ্ট। বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ বেশ সম্বৃদ্ধ। সমুদ্র এলাকার বিপুল সম্পদ কাজে লাগাতে পারলে আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবো। মাছ সমুদ্রের এক ধরণের পণ্য। এই পণ্যের কারখানা হলো সাগর। কারখানা যদি ঠিক না থাকে, তাহলে পণ্য উৎপাদিত হবে না। আমরা সুনীল অর্থনীতির কথা বলছি, সঠিক সমুদ্র ব্যবস্থাপনার কথা বলছি না। সমুদ্র ব্যবস্থাপনা হয়ে
উঠুক পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জেলে বান্ধব। পর্যটকদের নজর কাড়ুক নাজিরারটেক শুঁটকি পল্লী।

লেখক: গল্পকার ও সংগঠক।