আবদুল হামিদ মাহবুব


বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রথম ১০০ দিন সবসময়ই একটি প্রতীকী সময়। এই সময়কে ঘিরে জনগণের প্রত্যাশা যেমন থাকে, তেমনি বিরোধীদের সমালোচনাও থাকে তীব্র। তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ সংকট, রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণের চাপের মধ্য দিয়ে সরকার দায়িত্ব নেয়। ফলে প্রশ্ন এখন একটাই; এই ১০০ দিনে অর্থনীতির বাস্তব চিত্র কী দাঁড়িয়েছে?

সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ বলছেন, এখনো সাধারণ মানুষের জীবনে সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের ছাপ স্পষ্ট নয়। সত্যি বলতে, এই দুই অবস্থানের মাঝখানেই বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে।

রাজস্ব আদায়ের প্রসঙ্গে বলতে গেলেই সামনে আসে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দিক। সেটা হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরেই নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ডিজিটাল নজরদারি, কর ফাঁকি কমানো এবং আমদানি পর্যায়ে শুল্ক ব্যবস্থাপনা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়। সরকারের ঘনিষ্ঠ মহল দাবি করছে, প্রথম ১০০ দিনে রাজস্ব আদায়ে কিছুটা গতি ফিরেছে। তবে এখনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ না হওয়ায় সাফল্যের প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ কঠিন।

বাস্তবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুরোপুরি চাঙা হয়নি। শিল্প খাতে বিনিয়োগে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে, ব্যাংকঋণের সুদহার উচ্চ এবং ডলারের চাপ পুরোপুরি কাটেনি। ফলে রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত লাফ দেখা যায়নি বলেই ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ সরকার প্রশাসনিক শৃঙ্খলা আনতে চেষ্টা করেছে, কিন্তু অর্থনীতির ভিত দুর্বল থাকায় রাজস্বে নাটকীয় পরিবর্তন এখনো অনুপস্থিত।

তবে একটি বিষয় সরকার রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারছে, সেটা আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার আর্থিক বিশৃঙ্খলার দায় বর্তমান প্রশাসন নিজেদের ঘাড়ে নিতে চাইছে না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আগের ১৪ মাসে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ঋণের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছিল। ফলে নতুন সরকার কার্যত একটি উচ্চ ঋণনির্ভর অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে।

বৈদেশিক ঋণের প্রশ্নে সরকার দ্বৈত চাপে রয়েছে। একদিকে পুরনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প সচল রাখতে নতুন ঋণের দরজাও খোলা রাখতে হচ্ছে। সরকারের মুখপাত্রের ভাষ্যমতে, প্রথম ১০০ দিনে প্রায় ৯০.৬৬ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা নিয়েই বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ এখনো উদ্বেগজনক উচ্চতায় রয়েছে। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, জ্বালানি আমদানি, রিজার্ভ রক্ষা এবং বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে নতুন ঋণচুক্তির দিকেও তাকাতে হচ্ছে। অর্থাৎ ১০০ দিনে ঋণ কমে গেছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই; বরং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা চলছে বলা যেতে পারে।

অভ্যন্তরীণ ঋণের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি সহজ নয়। ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বেড়ে গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়—যাকে অর্থনীতির ভাষায় 'ক্রাউডিং আউট' বলা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার বাড়ানো হয়েছে, যাতে সরকার দ্রুত অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। ব্যাংকগুলো নিরাপদ সরকারি বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী হলে শিল্প ও উদ্যোক্তারা ঋণ পেতে সংকটে পড়েন।

এই ১০০ দিনে সরকার আগের সময়ের তুলনায় কত বেশি অভ্যন্তরীণ ঋণ নিয়েছে, সেই নির্ভুল হিসাব এখনো প্রকাশ হয়নি। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন ইঙ্গিত বলছে, বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে ব্যাংকনির্ভরতা এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর মানে অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি স্বস্তিতে ফিরতে পারেনি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো; মানুষের আয় কি বেড়েছে? এখানে সরকারের জন্য উত্তরটি সবচেয়ে কঠিন। কারণ ম্যাক্রো অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতির আভাস থাকলেও সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনযাত্রা এখনো চাপে। বাজারে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ-মাংস, বাসাভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয় উচ্চ পর্যায়েই আছে। মূল্যস্ফীতি আগের তুলনায় সামান্য কমলেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি।

আমি মফস্বলে থাকি। মেলামেশা আমার সাধারণ মানুষের সাথে। শহর ও গ্রামের অনেকের সাথে কথা বলে দেখেছি মানুষ এখনো চাপের মধ্যেই রয়েছে। যদি একজন মানুষের বেতন অপরিবর্তিত থাকে কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে কাগজে আয় অপরিবর্তিত থাকলেও বাস্তবে তার জীবনমান কমে যায়। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা অনেকটাই এমন। সরকারি তরফ থেকে যদিও বলা হচ্ছে পণঢ মূল্যের স্থিতিশীলতা আছে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা হচ্ছে গ্রামের শ্রমজীবী মানুষ, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার এবং শহরের ভাড়াটিয়া শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপ অনুভব করছে। মধ্যবিত্তের সঞ্চয় কমেছে, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে সরকারের 'স্থিতিশীলতার' কথা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে না।

তবে এটাও সত্য, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তত বাজারে আতঙ্ক কিছুটা কমেছে। ডলার সংকট আগের তুলনায় নিয়ন্ত্রিত, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা ইতিবাচক ধারা দেখাচ্ছে। এই বিষয়গুলো অর্থনীতিকে আরও বড় ধস থেকে রক্ষা করেছে।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শুধু স্থিতিশীলতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধি। এখনো বড় শিল্প বিনিয়োগের নতুন ঢেউ দেখা যায়নি। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত ধারাবাহিকতার দিকে তাকিয়ে আছেন। ফলে ১০০ দিনে অর্থনীতির মৌলিক রূপান্তর হয়নি; বরং সংকট ব্যবস্থাপনার একটি প্রাথমিক ধাপ পার হয়েছে সরকার।

রাজনৈতিক দিক থেকেও সরকার একটি সুবিধা পেয়েছে। তারা জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, দেশের অর্থনীতি রাতারাতি ঠিক করা সম্ভব নয়। ফলে প্রত্যাশার মাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। কিন্তু এই রাজনৈতিক সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে যদি বাজারদর, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি না আসে, তাহলে সরকারের ওপর জনচাপ বাড়বে।

সর্বোপরি বলা যায়, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১০০ দিন ছিল মূলত আগুন নেভানোর সময়। তারা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার বার্তা দিয়েছে এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানো, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো কিংবা ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার মতো বড় সাফল্য এখনো অর্জিত হয়নি।

অর্থনীতির ভাষায় এটি 'রিকভারি ইউদাউট রিলিফ' অর্থাৎ পুনরুদ্ধারের আভাস আছে, কিন্তু মানুষের জীবনে এখনো স্বস্তি ফিরে আসেনি। আগামী কয়েক মাস তাই হবে আসল পরীক্ষা। কারণ জনগণ শেষ পর্যন্ত পরিসংখ্যান নয়, নিজেদের বাজারের ব্যাগ, বিদ্যুতের বিল এবং সংসারের হিসাব দিয়েই সরকারের সাফল্য মাপে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।