নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে টেকসই উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য
ওয়াজেদুর রহমান কনক
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ কেবল একটি জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। ভৌগোলিক অবস্থান ও কৃষিপ্রধান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ খাদ্যের সহজলভ্যতা অর্জনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখালেও, খাদ্যের গুণগত মান ও নিরাপত্তা বজায় রাখা এখনো একটি জটিল ও বহুমুখী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ জনস্বাস্থ্যের ওপর এক নীরব মহামারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই সমস্যার মূলে রয়েছে উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত বিস্তৃত খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতি। স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো নির্দেশ করে যে, অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ ও তৎসংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি রোধে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি। মূলত, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে SDG ২ (ক্ষুধা মুক্তি) ও SDG ৩ (সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ) অর্জনের পথ সুগম করা সম্ভব, যা একটি আধুনিক, সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি বিনির্মাণের জন্য অপরিহার্য। এই প্রেক্ষিতে, নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে খামার থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীলতা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং কঠোর তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর করাই বর্তমান জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রচেষ্টার মূল উপজীব্য।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা একটি অবিচ্ছেদ্য এবং কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। জাতিসংঘের ২০৩০ এজেন্ডার অন্যতম প্রধান দুটি লক্ষ্য—SDG ২ এবং SDG ৩—সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার গুণগত মান ও এর বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। ক্ষুধা মুক্তির লক্ষে কেবল ক্যালরির প্রাপ্যতা বা খাদ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়, বরং খাদ্যের পুষ্টিমান এবং এর বিশুদ্ধতা বজায় রাখা সমানভাবে অপরিহার্য। অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ জনস্বাস্থ্যের ওপর যে বিরূপ প্রভাব ফেলে, তা ক্ষুধা ও দারিদ্র্য বিমোচনের পথে একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। খাদ্যের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই অপুষ্টির দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব, যা SDG ২-এর মূল দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একইভাবে, সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও খাদ্য নিরাপত্তা একটি কেন্দ্রীয় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। খাদ্যবাহিত রোগের প্রকোপ জনস্বাস্থ্যের ওপর যে বিপুল চাপ সৃষ্টি করে, তা SDG ৩-এর সফল বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা। খাদ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোগ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড প্রয়োগের মাধ্যমে সংক্রামক ব্যাধি ও খাদ্যবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব। যখন খাদ্য নিরাপদ থাকে, তখন তা রোগ প্রতিরোধের একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে এবং দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখে। সুতরাং, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার কাঠামোর মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য একে অপরের পরিপূরক এবং এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য সমন্বিত খাদ্য নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলা বিশ্বব্যাপী এক অপরিহার্য প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জগুলো অত্যন্ত গভীর, যেখানে অনিরাপদ খাদ্যের প্রভাব জাতীয় অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রায় ৩০ মিলিয়ন মানুষ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়, যার একটি বড় অংশ অনিরাপদ খাদ্যের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। এই পরিসংখ্যানটি দেশের প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর জন্য একটি বিশাল উদ্বেগের কারণ।
অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনিরাপদ খাদ্যের কারণে সৃষ্ট অসুস্থতায় কর্মক্ষম মানুষের বিশাল একটি অংশ কর্মদিবস হারায়, যা জাতীয় জিডিপি’র ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেবল খাদ্যবাহিত রোগের কারণে সৃষ্ট চিকিৎসা ব্যয় ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের সম্মিলিত আর্থিক ক্ষতি বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপি’র প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি লুকানো কর হিসেবে কাজ করে, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে।
খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও জটিল। স্থানীয় বাজারে শাক-সবজি, মাছ এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে রাসায়নিকের ব্যবহার ও সংরক্ষণের ত্রুটি নিয়ে করা সাম্প্রতিক মাঠ পর্যায়ের জরিপগুলো থেকে জানা যায়, অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় ফরমালিন বা অন্যান্য প্রিজারভেটিভের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক নীরব ঝুঁকি তৈরি করছে। এছাড়া, নীলফামারীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যেসকল খাদ্য নিরাপত্তা প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তা থেকে স্পষ্ট যে অনিরাপদ খাবার কেবল শহরের সমস্যা নয়, বরং গ্রাম পর্যায়েও এর বিস্তার সমানভাবে বিদ্যমান।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) ২ ও ৩ অর্জনের পথে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় খাদ্য নিরাপত্তা প্রতিবেদন ও জনস্বাস্থ্য তথ্যের ভিত্তিতে প্রতীয়মান হয় যে, সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কঠোর আইনি প্রয়োগের মাধ্যমেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব। খাদ্যের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার এই লড়াইটি কেবল সরকারি উদ্যোগ নয়, বরং খামার থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীল আচরণের প্রতিফলন ঘটানো একান্ত প্রয়োজন।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
