মীর আব্দুল আলীম


বাংলাদেশে এখন এমন একটি নীরব দুর্যোগ চলছে, যার কোনো সাইরেন বাজে না, কোনো ভূমিকম্পের মতো কম্পন অনুভূত হয় না, কোনো বন্যার মতো দৃশ্যমান ধ্বংসও দেখা যায় না। অথচ প্রতিদিন, প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি মানুষ এই দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। সেই দুর্যোগের নাম খাদ্যে ভেজাল ও বিষাক্ত রাসায়নিকের অবাধ ব্যবহার।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন বাজার থেকে মাছ, মাংস, ফল, সবজি, দুধ, মসলা কিংবা শিশুখাদ্য কিনে ঘরে ফেরার পরও নিশ্চিত হতে পারি না যে আমরা খাদ্য কিনেছি, নাকি ধীরে ধীরে মৃত্যুর উপাদান সংগ্রহ করেছি। দেশের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কিডনি বিকল হচ্ছে, ক্যানসার বাড়ছে, হৃদরোগ বাড়ছে, লিভার জটিলতা বাড়ছে, ফুসফুসের রোগ বাড়ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব রোগের পেছনে আমাদের খাদ্যাভ্যাস এবং খাদ্যের নিরাপত্তাহীনতা কতটা দায়ী?

আমার নিজের পরিবারের কথাই যদি বলি, তাহলে এই সংকটের নির্মম চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্যানসারে মারা গেছেন আমার চাচা, চাচি, মামা, শ্বশুর এবং ফুফাতো ভাই। কয়েক বছর আগে অজানা রোগে বাবাকে হারিয়েছি। আমার ভাইয়ের একটি কিডনি অপসারণ করতে হয়েছে; অন্য কিডনিতেও ক্যানসার ধরা পড়েছে। সম্প্রতি জানতে পারলাম, আমার বড় বোনের ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, হৃদযন্ত্র ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় এবং কিডনিও শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এটি কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়; বাংলাদেশের লাখো পরিবারের বাস্তবতা।

এই সংকট আসলে মানুষের তৈরি এক দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়, যার নাম ভেজাল খাদ্য ও রাসায়নিক দূষিত জীবনব্যবস্থা। আমরা যাকে প্রতিদিন “খাবার” বলে গ্রহণ করছি, তা আদৌ খাবার কি না, এই প্রশ্ন আজ আর কেবল নৈতিক বা দার্শনিক নয়, এটি এখন সরাসরি জীবনের টিকে থাকার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। একটি জাতি যদি তার প্রতিদিনের খাবার নিয়েই অনিশ্চয়তায় ভোগে, তবে সেই জাতির ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ এই প্রশ্ন আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।

আমি যখন বাজারে যাই, মাছ, মাংস, সবজি কিংবা ফল কিনি, তখন আর আগের মতো সহজভাবে কিছু কিনে ফিরে আসতে পারি না। প্রতিটি জিনিসের ভেতরেই যেন অদৃশ্য কোনো ভয় লুকিয়ে থাকে। বাইরে থেকে দেখতে যতটা সুন্দর, চকচকে ও আকর্ষণীয় মনে হয়, ভেতরের সত্য ততটাই অজানা ও সন্দেহপূর্ণ। কখনো মনে হয়, আমরা আসলে খাবার কিনছি না; বরং আমরা নিজের অজান্তেই শরীরের ভেতরে প্রবেশ করা এক দীর্ঘমেয়াদি বিষ কিনে আনছি। এই অনুভূতি কেবল ব্যক্তিগত আশঙ্কা নয়, এটি আজ বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা এক নীরব সামাজিক অভিজ্ঞতা, যা প্রায় প্রতিটি সচেতন পরিবারের মধ্যেই বিদ্যমান। এই বাস্তবতা আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আরও গভীরভাবে আঘাত করেছে।

প্রশ্ন জাগে-এত দ্রুত, এত ব্যাপকভাবে এসব রোগ কেন বাড়ছে? চিকিৎসাবিজ্ঞান আমাদের শেখায় যে ক্যানসার বা কিডনি রোগ হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যেখানে শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে ক্ষতিকর উপাদান জমে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। বছরের পর বছর ধরে গ্রহণ করা দূষিত খাদ্য, অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহার এবং পরিবেশগত বিষক্রিয়া এই রোগগুলোর প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে। তাহলে কি আমরা যে খাবার প্রতিদিন গ্রহণ করছি, সেটাই আমাদের শরীরের ভেতরে এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে?

আজকের বাজার ব্যবস্থার দিকে তাকালে এই প্রশ্ন আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আমরা যে মাছ কিনি, সেখানে অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক ও হরমোন ব্যবহারের অভিযোগ শোনা যায়, যা মাছকে দ্রুত বড় করতে ব্যবহার করা হয়। যে মুরগি বা গরুর মাংস আমরা খাই, তা অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিমভাবে দ্রুত বৃদ্ধির জন্য রাসায়নিক ফিডের ওপর নির্ভরশীল। যে ফল আমরা শিশুদের হাতে তুলে দিই, তা অনেক সময় কৃত্রিমভাবে পাকানো, যাতে বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয় দেখায় কিন্তু ভেতরের পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়। দুধ, মসলা, তেল এমনকি দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি খাদ্যপণ্যের ভেতরেই কোনো না কোনোভাবে ভেজাল বা রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো- এই ভেজাল এখন আর গোপন কোনো অপরাধ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক আচারে পরিণত হয়েছে। রাস্তার ফলের দোকানে চকচকে আম দেখে আমরা খুশি হই, কিন্তু জানি না সেই আম ক্যালসিয়াম কার্বাইডে পাকানো কি না। দোকানের মিষ্টির উজ্জ্বল রং আমাদের আকর্ষণ করে, অথচ আমরা জানি না সেই রঙ কতটা স্বাস্থ্যসম্মত। বিরিয়ানি, জুস বা ফাস্টফুডের স্বাদ আমাদের তৃপ্তি দেয়, কিন্তু সেই স্বাদের আড়ালে কী ধরনের কৃত্রিম রাসায়নিক বা অনিরাপদ উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, তা জানার চেষ্টা আমরা অনেক সময় করি না বা করতে পারি না।

এই বাস্তবতার আরেকটি দিক আরও উদ্বেগজনক। খাদ্যে ভেজাল রোধে আমাদের দেশে আইন আছে, শাস্তির বিধান আছে, এমনকি কারাদণ্ডের কঠোর কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই আইনের প্রয়োগ কতটা কার্যকর? এই প্রশ্ন বারবার উঠছে। মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালিত হয়, কিছু দোকান জরিমানা দেয়, কিছু সংবাদ তৈরি হয়, কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সব আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে ভেজালকারীরা এক ধরনের বার্তা পেয়ে যায় যে, এই ব্যবস্থায় ঝুঁকি থাকলেও তা নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

অন্যদিকে উন্নত দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের অন্যতম প্রধান অংশ। সেখানে কোনো খাদ্য অনিরাপদ প্রমাণিত হলে তা দ্রুত বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে নজরদারি অব্যাহত থাকে। আমাদের পাশের অনেক দেশেও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ও সক্রিয়। অথচ বাংলাদেশে আইন থাকা সত্ত্বেও তার বাস্তব প্রয়োগে দীর্ঘদিন ধরে শৈথিল্য ও অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এখানে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই বিষাক্ত খাদ্যের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ পায় না। মানুষ একদিনে অসুস্থ হয়ে পড়ে না। বরং বছরের পর বছর ধরে শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে বিষ জমতে থাকে, যা একসময় মারাত্মক রোগে রূপ নেয়। তখন দেখা যায় কিডনি বিকল, লিভার নষ্ট, হৃদরোগ বা ক্যানসারের মতো জটিল রোগ শরীরে বাসা বেঁধেছে। কিন্তু তখন আর নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হয় না- কোন নির্দিষ্ট খাবার বা কোন পর্যায়ের দূষণ এই রোগের মূল কারণ ছিল।

ফলমূলের ক্ষেত্রেও আমরা এক ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যে বাস করছি। বাজারে যে ফল আমরা দেখি, তার অনেকটাই কৃত্রিমভাবে পাকানো। ক্যালসিয়াম কার্বাইড বা অন্যান্য রাসায়নিক ব্যবহার করে ফলকে দ্রুত পাকিয়ে আকর্ষণীয় করা হয়। আবার দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রিজারভেটিভ ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা ফলের প্রাকৃতিক গুণাগুণ নষ্ট করে দেয়। ফলে আমরা বাহ্যিকভাবে সুন্দর ফল খাই, কিন্তু ভেতরে তা অনেকাংশেই পুষ্টিহীন হয়ে পড়ে।

শিশুদের খাদ্য এই সংকটের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশ। কারণ শিশুর শরীর এখনো বিকাশমান পর্যায়ে থাকে। ভেজাল দুধ, অনিরাপদ শিশুখাদ্য বা রাসায়নিকযুক্ত খাবার তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। অথচ এই বিষয়টি নিয়ে সমাজে যে পরিমাণ উদ্বেগ ও গুরুত্ব থাকা উচিত, বাস্তবে তা অনেক কম।

এই সংকট কেবল খাদ্যের নয়, এটি একটি গভীর নৈতিক ও সামাজিক সংকটও। একজন ব্যবসায়ী যখন জেনে-শুনে মানুষের খাবারে ভেজাল মেশান, তখন এটি আর শুধু ব্যবসায়িক অপরাধ থাকে না; এটি মানবতার বিরুদ্ধে এক ধরনের নীরব অপরাধে পরিণত হয়। কারণ তিনি জানেন, তার এই পণ্য কোনো শিশুর জীবন নষ্ট করতে পারে, কোনো মায়ের স্বাস্থ্য ভেঙে দিতে পারে, কোনো পরিবারের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করতে পারে, তবুও তিনি লাভের জন্য তা চালিয়ে যান।

এই অবস্থায় রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা। শুধুমাত্র অভিযান বা তাৎক্ষণিক জরিমানা নয়, বরং উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং বিক্রয় প্রতিটি ধাপে বৈজ্ঞানিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি ও মৎস্য খাতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, ফল পাকানোর নিরাপদ প্রযুক্তির বাধ্যতামূলক ব্যবহার, জেলা পর্যায়ে আধুনিক পরীক্ষাগার স্থাপন এবং দ্রুত বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম গড়ে তোলা না গেলে এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে।

রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায়িত্ব এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু রাষ্ট্রের ওপর দায় চাপিয়ে দিলেই সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা যেখানে উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি থাকবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন আধুনিক ল্যাবরেটরি, দ্রুত বিচার ব্যবস্থা এবং ধারাবাহিক মনিটরিং।

তবে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সাধারণ মানুষের সচেতনতা। আমরা যদি সচেতন না হই, তাহলে কোনো আইন বা অভিযানই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। কম দামে আকর্ষণীয় পণ্যের প্রতি অন্ধ আকর্ষণই অনেক সময় এই ভেজাল চক্রকে টিকিয়ে রাখে। তাই ভোক্তার সচেতনতা এখানে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।

আজ সময় এসেছে আমরা বিষয়টিকে শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনা করি। কারণ একটি জাতি তখনই সুস্থভাবে দাঁড়াতে পারে, যখন তার প্রতিটি নাগরিক নিরাপদ খাদ্য পায়।

আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে বাজার থেকে কেনা খাবার নিয়ে আর সন্দেহ থাকবে না, যেখানে শিশুদের দুধ হবে নিরাপদ, ফল হবে প্রাকৃতিক, মাছ-মাংস হবে বিষমুক্ত, এবং প্রতিটি পরিবার নিশ্চিন্তে বলতে পারবে আমরা যা খাচ্ছি, তা সত্যিই খাবার।

একটি সুস্থ জাতি গঠনের প্রথম শর্ত হলো নিরাপদ খাদ্য। আর নিরাপদ খাদ্যের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত সচেতনতা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নৈতিকতার পুনর্জাগরণ। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি জাতিকে বাঁচাতে হলে আগে তার খাদ্যকে বাঁচাতে হয়।

লেখক :সাংবাদিক, সমাজ বিশ্লেষক।