মীর আব্দুল আলীম


রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তম্ভের একটি নিজস্ব শক্তি থাকে। প্রশাসন রাষ্ট্রকে চালায় নীতিতে, পুলিশ রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে শৃঙ্খলায়। একদিকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ক্যাডারে সচিব, সিনিয়র সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এমন বহু উচ্চপদে পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে; অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ চূড়া কার্যত আইজিপির একটিমাত্র পদেই থেমে যায়। ফলে বহু দক্ষ, মেধাবী ও অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর আর এগোতে পারেন না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, সুশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার প্রশ্নে এই বৈষম্য আজ নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে।

রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্যাডার গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হওয়া আর সমান কাঠামোগত সুযোগ পাওয়া দুটি এক বিষয় নয়। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে পুলিশ প্রশাসনের বহু কর্মকর্তা তাঁদের সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতার সময়েই অবসরের মুখোমুখি হন। প্রশ্ন উঠছে এই মেধা কি রাষ্ট্র যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারছে? রাষ্ট্রের কিছু নীরব সংকট থাকে, যেগুলো নানা কারনে আমাদের সামনে উঠে আসে না। কিন্তু সেই সংকট ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের ভেতরের শক্তিকে ক্ষয় করে। বাংলাদেশে পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদসংকট ঠিক তেমনই এক বাস্তবতা।

একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাঁর কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে সচিব, সিনিয়র সচিব কিংবা মন্ত্রিপরিষদ সচিব হওয়ার সুযোগ পান। রাষ্ট্র তাঁকে দীর্ঘদিন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ধরে রাখে। অথচ একজন পুলিশ কর্মকর্তা যিনি জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলো মাঠে কাটান, জীবনের ঝুকি নিয়ে সন্ত্রাস, সহিংসতা, অপরাধ ও সংকটের মুখোমুখি দাঁড়ান তিনি অনেক ক্ষেত্রেই একটি সীমিত কাঠামোর ভেতর আটকে যান। আইজিপি পদে পৌঁছানোর আগেই থেমে যায় অসংখ্য মেধা, থেমে যায় বহু বছরের অভিজ্ঞতার পথচলা।

প্রশ্ন হলো রাষ্ট্র কি তার সবচেয়ে অভিজ্ঞ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারছে? নাকি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে একের পর এক দক্ষ কর্মকর্তা নীরবে হারিয়ে যাচ্ছেন প্রশাসনিক অন্ধকারে?

বাংলাদেশ পুলিশে সুপার নিউমারি' (Supernumerary) পদ অর্থাৎ সংখ্যার অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি জরুরী। নির্দিষ্ট কোনো সংস্থায় (এক্ষেত্রে পুলিশে) অনুমোদিত স্থায়ী পদের বাইরে বিশেষ প্রয়োজনে সাময়িকভাবে যে পদ তৈরি করা প্রয়োজন। ধরুন, পুলিশে 'অতিরিক্ত ডিআইজি' পদের সংখ্যা ১০০টি। কিন্তু পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য কর্মকর্তা আছেন ১২০ জন। তখন সরকার ২০টি 'সুপার নিউমারি' পদ সৃষ্টি করে ওই ১২০ জনকেই প্রমোশন দিতে পারে। এর ফলে ওই অতিরিক্ত ২০ জন পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধি পেলেও পুলিশের স্থায়ী কাঠামোতে পদের সংখ্যা ১০০-ই থাকে। এটি যোগ্য কর্মকর্তাদের সময়মতো পদোন্নতি দেওয়ার একটি প্রশাসনিক কৌশল, যাতে পদের অভাবে কারো ক্যারিয়ার আটকে না থাকে। এতে দক্ষ কর্মকর্তাদের কাজের উৎসাহ বজায় থাকবে। সুপার নিউমারি পদে পদোন্নতি পেলেও অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা আগের কর্মস্থলেই কাজ চালিয়ে যাবেন অথবা সমমর্যাদার অন্য কোনো দায়িত্ব পালন করবেন। এটি মূলত একটি আর্থিক ও পদমর্যাদাগত সুবিধা, যা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পদোন্নতি আটকে থাকা দূর করতে ব্যবহৃত হতে পারে।

বাংলাদেশ যখন উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখছে, তখন শুধু সেতু, মেট্রোরেল কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোকেও সমানভাবে আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ করা জরুরি। কারণ একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যানে টিকে থাকে না, টিকে থাকে তার অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তির ওপর। পুলিশ প্রশাসনের পদকাঠামো, উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নিয়ে এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি তখনই হয়, যখন তার মেধাবীরা অবসরে যান, কিন্তু তাঁদের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের কাজে আর লাগে না। তাই আইজিপির আগে পরে সুপার কিছু পদ সৃষ্টি করে মেধার মূল্যায়ন সেই সঙ্গে মেধাকে কাজে লাগিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়া যায়।

প্রশাসন বনাম পুলিশ কাঠামোগত পার্থক্যের মূল বাস্তবতা কি? বাংলাদেশের প্রশাসন ক্যাডারে পদোন্নতির ধাপ দীর্ঘ এবং বহুমাত্রিক। একজন কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (AC) থেকে শুরু করে ইউএনও, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার, সচিব, সিনিয়র সচিব হয়ে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন। অর্থাৎ উচ্চপর্যায়ে একাধিক সুপার গ্রেড ও নীতিনির্ধারণী পদ রয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের ক্ষেত্রে কনস্টেবল থেকে শুরু করে এসআই, ইন্সপেক্টর, এএসপি, অতিরিক্ত এসপি, এসপি, ডিআইজি, অতিরিক্ত আইজিপি হয়ে শেষ গন্তব্য আইজিপি। কিন্তু বাস্তবতা হলো আইজিপির পদ মাত্র একটি। ফলে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ে বহু কর্মকর্তা আটকে যান। এখানেই মূল বৈষম্য। প্রশাসন ক্যাডারে উচ্চপদ সংখ্যা বেশি হওয়ায় কর্মকর্তা ধরে রাখা যায় দীর্ঘ সময়। কিন্তু পুলিশে কাঠামো সরু হওয়ায় অভিজ্ঞতার স্তর তৈরি হওয়ার আগেই অনেকে অবসরে চলে যান। রাষ্ট্র একটি বড় নিরাপত্তা অভিজ্ঞতা হারায়, যার আর্থিক মূল্য না থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য অনেক বড়।

মেধাবী পুলিশ কর্মকর্তাদের আগাম অবসরের ঝুঁকি রাস্ট্রেরই ক্ষতি হচ্ছে বেশি! একজন পুলিশ কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ে কাজ করতে করতে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তা কেবল বই পড়ে শেখা যায় না। সন্ত্রাস দমন, রাজনৈতিক সংকট, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ, গোয়েন্দা কার্যক্রম, সীমান্ত নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ প্রতিটি ক্ষেত্রেই বছরের পর বছর কাজ করে তৈরি হয় বাস্তব দক্ষতা। কিন্তু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কর্মকর্তা তাঁদের সবচেয়ে কার্যকর সময়েই পদোন্নতির সুযোগ হারান। ফলে কেউ কেউ হতাশ হন, কেউ আগ্রহ হারান, কেউ আবার নিরবে অবসরে চলে যান। রাষ্ট্রের জন্য এটি একটি নীরব ক্ষতি। কারণ একটি দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তার বিকল্প রাতারাতি তৈরি হয় না। একজন দক্ষ কর্মকর্তা তৈরি হতে ২৫ থেকে ৩০ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা লাগে। অথচ সেই অভিজ্ঞতাকে ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত নীতিনির্ধারণী বা উচ্চ প্রশাসনিক পদ নেই। এই বাস্তবতা দীর্ঘমেয়াদে পুলিশ বাহিনীর মনোবলেও প্রভাব ফেলে। তরুণ কর্মকর্তারা ভবিষ্যৎ কাঠামো দেখে আগ্রহ হারাতে পারেন। ফলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক ধরনের অদৃশ্য হতাশা জন্ম নিতে পারে।

পুলিশ প্রশাসনে পদোন্নতি বা পদ সৃষ্টি কিংবা সুপার নিউমারি পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রায়ই রাষ্ট্রীয় ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাত তোলা হয়। তবে বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। পুলিশের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পদের অভাবে দীর্ঘদিন একই পদে আসীন থাকলেও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং গ্রেড উন্নয়নের ফলে বর্তমানে তারা উচ্চতর গ্রেডেই বেতন ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। অর্থাৎ, পদের বিপরীতে যে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা, তা রাষ্ট্রকে এখনই বহন করতে হচ্ছে। এখন প্রয়োজন কেবল তাদের যোগ্যতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা পদের ‘আপগ্রেডেশন’। পদোন্নতি হলে তাদের বেতনের বড় কোনো পরিবর্তন হবে না, কিন্তু পদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের কর্মস্পৃহা এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বহুগুণ বেড়ে যাবে। সুতরাং, নতুন আর্থিক বোঝা তৈরি না করেই কেবল কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এই মেধাবী কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্র ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থে কাজে লাগানো সম্ভব। এটি কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং মেধার সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের একটি সাশ্রয়ী ও কার্যকর কৌশল হতে পারে।

কেন সুপার নিউমারি পোস্ট বাড়ানোর আলোচনা জরুরি? প্রশাসন ক্যাডারে যেমন সিনিয়র সচিব বা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মতো সুপার পোস্ট রয়েছে, তেমনি পুলিশ প্রশাসনেও অতিরিক্ত উচ্চপদ সৃষ্টি করা সময়ের দাবি হতে পারে। বর্তমান বিশ্বে পুলিশের কাজ শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা নয়। সাইবার নিরাপত্তা, জঙ্গিবাদ দমন, আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র, আর্থিক অপরাধ, কূটনৈতিক নিরাপত্তা এসব ক্ষেত্র এখন বিশেষায়িত দক্ষতা দাবি করে। ফলে পুলিশ বাহিনীতেও নীতিনির্ধারণী, গবেষণামূলক ও কৌশলগত উচ্চপদ থাকা প্রয়োজন। যেমন, জাতীয় নিরাপত্তা সমন্বয়ক, সাইবার সিকিউরিটি প্রধান, পুলিশ রিফর্ম কমিশনার, ইন্টেলিজেন্স কো-অর্ডিনেশন প্রধান এ ধরনের সুপার পদ ভবিষ্যতে তৈরি হতে পারে। এতে একদিকে অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা কাজে লাগবেন, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান সংরক্ষিত থাকবে। রাষ্ট্র যদি শুধু প্রশাসন নয়, নিরাপত্তা কাঠামোকেও আধুনিক করতে চায়, তাহলে পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদ পুনর্বিন্যাস এখন আর বিলাসিতা নয়; বরং প্রয়োজন।

পুলিশ প্রশাসনের কাজের ঝুঁকি কি কাঠামোয় প্রতিফলিত হয়? বাংলাদেশে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও একজন পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্বের প্রকৃতি ভিন্ন। প্রশাসন নীতিনির্ধারণ করে, মাঠ প্রশাসন চালায়; পুলিশ সরাসরি সংঘাত, অপরাধ, ঝুঁকি ও জননিরাপত্তার মুখোমুখি দাঁড়ায়। একজন পুলিশ কর্মকর্তা দিন-রাত, উৎসব-দুর্যোগ, রাজনৈতিক সংকট প্রতিটি পরিস্থিতিতে সক্রিয় থাকেন। মাঠে জীবনঝুঁকি নিয়েই তাঁদের কাজ করতে হয়। কিন্তু এই অতিরিক্ত ঝুঁকি ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন পদকাঠামোয় খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। বিশ্বের বহু দেশে নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য বিশেষ গ্রেড, কৌশলগত পদ ও দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার সুরক্ষা রয়েছে। কারণ রাষ্ট্র বোঝে নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হলে উন্নয়নও টেকসই হয় না। বাংলাদেশেও এখন সেই বাস্তবতা বিবেচনার সময় এসেছে। শুধু বেতন বা সুযোগ-সুবিধা নয়, মর্যাদাপূর্ণ ও বিস্তৃত পদকাঠামোও একটি বাহিনীর আত্মবিশ্বাস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রশাসনিক ভারসাম্য রক্ষায় সমন্বিত সংস্কার খুব দরকার। কোনো রাষ্ট্রে একটি ক্যাডারকে অন্যটির প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবলে সমস্যা বাড়ে। প্রশাসন ও পুলিশ দুটিই রাষ্ট্রযন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু যখন একটি কাঠামোতে পদোন্নতির পথ বিস্তৃত এবং অন্যটিতে সংকীর্ণ থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই অসন্তোষ জন্ম নেয়। এই অসন্তোষ প্রকাশ্যে না এলেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বৈষম্য একসময় কর্মোদ্যম কমিয়ে দিতে পারে। ফলে রাষ্ট্রের সার্বিক সেবা ব্যাহত হয়। সমাধান হতে পারে আন্তঃক্যাডার ভারসাম্যভিত্তিক সংস্কার। কোন ক্যাডারে কত পদ থাকবে, কীভাবে অভিজ্ঞতা ধরে রাখা হবে, কোথায় বিশেষায়িত উচ্চপদ তৈরি করা যায় এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি কমিশন গঠন করা যেতে পারে। রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি দক্ষ কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ সময় পর্যন্ত কাজে লাগানো। কারণ মেধা হারানো মানে শুধু একজন কর্মকর্তা হারানো নয়; বরং রাষ্ট্রের বহু বছরের বিনিয়োগ হারানো।

পুলিশের উচ্চপর্যায়ে গবেষণা ও নীতি নির্ধারণী ইউনিটের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশে পুলিশের মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা নিয়ে প্রশংসা থাকলেও গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। উন্নত বিশ্বে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে আলাদা থিংক-ট্যাংক, নিরাপত্তা বিশ্লেষণ সেল, অপরাধ গবেষণা ইউনিট এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল বিভাগ থাকে। বাংলাদেশেও অবসরোন্মুখ অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের ইউনিট গঠন করা যেতে পারে। এতে মাঠের অভিজ্ঞতা সরাসরি নীতিতে রূপ নেবে। বর্তমানে বহু কর্মকর্তা অবসরে যাওয়ার পর তাঁদের বিশাল অভিজ্ঞতা রাষ্ট্র আর ব্যবহার করতে পারে না। অথচ তাঁদের দিয়ে পুলিশ একাডেমি, সাইবার ইউনিট, কৌশলগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা গবেষণা সেলে কার্যকর অবদান রাখা সম্ভব। সুপার পোস্ট শুধু মর্যাদার বিষয় নয়; এটি জ্ঞান সংরক্ষণেরও বিষয়।

সরকার বদলায়, নীতি বদলায়; কিন্তু রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোকে স্থিতিশীল থাকতে হয়। সেই স্থিতিশীলতা আসে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততা থেকে। যখন উচ্চপর্যায়ে পর্যাপ্ত পদ থাকে না, তখন অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা দ্রুত বাদ পড়ে যান। এতে প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নতুন কর্মকর্তারা অভিজ্ঞতার পূর্ণ হস্তান্তর পান না। রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনার জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে সাইবার অপরাধ, আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্ক ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা একে অপরের পরিপূরক। অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী থাকে। বিনিয়োগ, শিল্প, প্রযুক্তি, পর্যটন সবকিছু নির্ভর করে নিরাপদ পরিবেশের ওপর। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের যে যাত্রায় রয়েছে, সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও দক্ষ করা জরুরি। আর সেই দক্ষতা আসবে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব ধরে রাখার মাধ্যমে। যদি রাষ্ট্র তার সবচেয়ে অভিজ্ঞ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সময়ের আগেই হারিয়ে ফেলে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সেটি উন্নয়নের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

অনেকে মনে করতে পারেন পুলিশ প্রশাসনের জন্য নতুন উচ্চপদ তৈরি মানে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্যাডারের আলাদা দায়িত্ব রয়েছে। তাই প্রতিটি ক্যাডারের জন্য যুগোপযোগী কাঠামো তৈরি করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। প্রশাসন শক্তিশালী হবে, পুলিশও শক্তিশালী হবে এই ভারসাম্যই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ভালো। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো একক প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট নয়; সমন্বয়ই সবচেয়ে বড় শক্তি।

এখনই সময় রাষ্ট্রের নতুন ভাবনার। বাংলাদেশ ২০৪১ সালের উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে শুধু অবকাঠামো নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও জরুরি। পুলিশ প্রশাসনের পদকাঠামো, উচ্চপদ সৃষ্টি, গবেষণা ইউনিট, বিশেষায়িত নেতৃত্ব এসব নিয়ে এখনই গভীর আলোচনা শুরু হওয়া উচিত। কারণ মেধা একদিনে তৈরি হয় না। অভিজ্ঞতা রাতারাতি জন্ম নেয় না। রাষ্ট্র যদি তার দক্ষ কর্মকর্তাদের যথাযথভাবে ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতে সেই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

দিনশেষে ফাইল আর লাঠি দুটিই রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা রক্ষার হাতিয়ার। একটির জেল্লা বাড়াতে গিয়ে অন্যটিকে মরচে ধরালে তাতে রাষ্ট্রেরই ক্ষতি। সচিবালয়ের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ আর রাজপথের তপ্ত রোদের মধ্যে যে মেধার লড়াই, তার মীমাংসা হওয়া প্রয়োজন। প্রশাসন ক্যাডারের জ্যামিতিক বিস্তার যদি প্রয়োজন হয়, তবে পুলিশের শীর্ষ পদের সংকোচন কেন? মেধাবীদের ঝরে পড়া রুখতে এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে আরও আধুনিক ও বুদ্ধিদীপ্ত করতে পুলিশের পদবিন্যাস পুনর্গঠন এখন কেবল দাবি নয়, অনিবার্য বাস্তবতা। আশা করা যায়, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কানে এই ‘নিঃশব্দ হাহাকার’ পৌঁছাবে এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিভিল সার্ভিস গড়ে উঠবে।

উপসংহার: একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অর্থনীতিতে নয়; তার প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতায়ও। বাংলাদেশ পুলিশ বহু সংকটে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রেখেছে। কিন্তু সেই বাহিনীর ভেতর যদি দীর্ঘদিন ধরে পদসংকট ও সীমিত উচ্চপদ বাস্তবতা হয়ে থাকে, তবে তা নিয়ে আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
আজ প্রয়োজন আবেগ নয়, বাস্তবভিত্তিক সংস্কার চিন্তা। এমন একটি কাঠামো, যেখানে প্রশাসন ও পুলিশউভয় ক্যাডারই নিজেদের দক্ষতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ অবদান রাখার সুযোগ পাবে। কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ ভবন নয়, গাড়ি নয়, প্রযুক্তিও নয় রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার অভিজ্ঞ মানুষ। আর সেই মানুষগুলোকে সময়ের আগেই হারিয়ে ফেলা কোনো উন্নত রাষ্ট্রের লক্ষণ হতে পারে না।

লেখক :সাংবাদিক, কলামিস্ট।