ফরিদপুরে সরকারি জমি দখল; পর্ব : ১
সড়ক বিভাগের জায়গা ভরাট করে মার্কেট নির্মাণ
রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : ফরিদপুর পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক সংলগ্ন সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধিগ্রহণকৃত সরকারি জমি দখল করে একাধিক ভবন নির্মাণ করেছে স্থানীয় একটি সংঘবদ্ধ দূর্বৃত্তচক্র। এ কাজে স্থানীয় কানাইপুর ইউনিয়ন পরিষদ এক মেম্বারের সরাসরি সম্পৃক্ততা ও কয়েকজন স্থানীয় বিএনপি নেতার নাম ভাঙিয়ে এমন কাজ করেছেন জনৈক হামজা শেখ এন্ড গং।
শনিবার (৬ জুন) ফরিদপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মাজহারুল ইসলাম এ বিষয়ে জানিয়েছেন, 'সরকার বিভিন্ন প্রয়োজনে বিভিন্ন দপ্তরের জন্য ভুমি অধিগ্রহণ করে থাকেন। সেসব জমি অবৈধভাবে দখল করে কারও মার্কেট নির্মাণের সুযোগ নাই। এমনটি হয়ে থাকলে তদন্তে সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে'।
তবে এর আগে, এ দুর্বৃত্ত চক্র সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর নিষেধাজ্ঞা ও ফরিদপুর পুলিশ সুপারের পুলিশ পাঠিয়ে বাধাকেও উপেক্ষা করেছেন।
দখলদার এ দুর্বৃত্তরা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও কিছু আওয়ামী লীগ নেতার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে একই কায়দায় তাদের নাম ভাঙিয়ে এমন দুর্বৃত্তায়ন করে গেছেন, আর এখনও বিএনপির প্রভাবশালী স্থানীয় এক কৃষক দল নেতার নাম ভাঙিয়ে তাদের দখলবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। যদিও কৃষকদলের ওই নেতার ঘনিষ্ঠ আরেক নেতা হামজা শেখ ও গংদের দুধের মাছি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
প্রসঙ্গত, অবৈধ দখলের মাধ্যমে সদ্য নির্মিত এ ভবন দু'টি নির্মাণের শুরুতে খবর পেয়ে ফরিদপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর নেতৃত্বে একটি দল ঘটনসস্থলে এসে নির্মাণ কাজ বদ্ধ করে দিয়েছিলেন এবং সে সময় সওজ বিভাগ জনসম্মুখে ঘোষণা দিয়েছিলেন পরবর্তীতে একই স্থানে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের চেষ্টা করা হলে মামলা করবেন তারা।
গত ২০ এপ্রিল দুপুর ১টা ২৫ মিনিটের দিকে ফরিদপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদারের নেতৃত্বে ওই সার্ভেয়ার টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের অধিগ্রহণকৃত সরকারি জমির সীমানা মৌখিকভাবে নির্ণয় করেন এবং সড়ক বিভাগের জমির মধ্যে থাকা ইমারত কেনো তৈরি করছেন তা জানতে চান। কিন্তু কেউ কোনো সঠিক জবাব না দিলে ভবনটি নির্মাণের দায়িত্বে থাকা লোকজনকে সড়ক বিভাগের জায়গায় নির্মাণাধীন ভবনের দেয়াল ভেঙ্গে ফেলতে বলেন নির্বাহী প্রকৌশলী। তবে তারা শুধুমাত্র ওই সময় তোলা দেয়ালটুকুই ভেঙ্গে ফেলেন। সেদিন সড়কের সরকারি জায়গায় আর কাজ না করার অনুরোধ করে আসেন নির্বাহী প্রকৌশলী। অন্যথায় রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষায় এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে ফিরে আসে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারা।
শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়ক বিভাগের ওই জায়গায় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা সরকার থেকে কোনো প্রকার অনুমতি না নিয়ে দখলদারেরা তাদের পুর্বের পরিকল্পনা ও টার্গেট অনুযায়ী ইমারত তৈরি করে মার্কেট নির্মাণের কাজ শেষ করে ফেলেছেন।
অবজ্ঞা করেছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর নেতৃত্বে পরিচালিত সার্ভেয়ার টিমের নিষেধাজ্ঞাও।
এর নেপথ্যে মদদদাতা হিসেবে স্থানীয় কানাইপুর ইউনিয়ন পরিযদের এক মেম্বার ও স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার নামও এসেছে।
এর আগে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে থাকা এ নীচু ঢালু জমি (পুকুর বা খাল বিশিষ্ট) সড়কের ওই জায়গাটি একটু একটু করে বালি ও মাটি ফেলে সম্পূর্ণভাবে ভরাট করে ফেলে ওই সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা।
পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের তেঁতুল তলা নামক স্থানে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে এ সরকারি জায়গায় সদ্য নির্মিত ওই ভবন দু'টির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা যায়, পার্শ্ববর্তী শোলাকুণ্ডু গ্রামের নতুন অর্থশালী বনে যাওয়া জনৈক সালাম শেখের প্রবাসি পুত্র হামজা শেখ (৩২) এর অর্থায়নে সড়ক বিভাগের জায়গায় ভবন নির্মাণের শেষ পর্যায়ের কাজ করেছেন সালামের আরেক ছেলে উজ্জল শেখ (৪২)। উজ্জল শেখ নিজেকে ফরিদপুরে ক্রসফায়ার খাওয়া কিছু চিহৃিত শীর্ষ সন্ত্রাসীর সহযোগী ছিলেন বলে পরিচয় বহন করে এলাকায় চলাচল করেন, যিনি একই পরিচয়ে হুমকি দিয়েছেন এ প্রতিবেদককেও। তার সাথে আছে ওই এলাকার চিহৃিত ভুমিদস্যূ লিটন সাহা, যিনি হামজা শেখদের থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে ওই মহাসড়ক ঘেষা সরকারি অধিগ্রহণকৃত দুই শতক জমি নিজের বাবার দাবি করে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করে হস্তান্তর করেছেন হামজা শেখকে। যদিও ওই জায়গাটুকুও সরকারের অধিগ্রহণকৃত জমি বলে দাবি ফরিদপুর সওজের, যা লিটন সাহা নিজের পৈতৃক জমি দাবি করে সরকারের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মামলাও করেছেন। ওই মামলা চলমান থাকতেই লিটন সাহা স্ট্যাম্পের মাধ্যমে তার দাবিকৃত জমি হামজা শেখদের লিখে দিয়েছেন। হামজা শেখের ভাই উজ্জ্বল শেখ লিটন সাহার থেকে সরকারের সাথে মামলা চলাকালীন সময়েই স্টাম্পের মাধ্যমে ওই জমি কেনার কথা স্বীকার করে বলেন, এই শর্তেই জমিটি কিনেছি যে, আদালতের রায় যদি লিটন সাহার পক্ষে যায়, তবে আমাদের তিনি লিখে দিবেন অন্যথায় টাকাগুলো ফেরত দিবেন'।
এদিকে, সরকারের সড়ক বিভাগের অধিগ্রহণকৃত জমি'র কয়েক শতাংশ নিজের দাবি করে আলালতে মামলা চলাকালীন আপনি স্ট্যাম্পের মাধ্যমে বিক্রি করতে পারেন কিনা, এমন প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি এলাকায় সব সময় সরকারি দলের লোক খ্যাত সুবিধাবাদী রাজনৈতিক কর্মী লিটন সাহা। যিনি নিজ বাবার দান করা একটি বারোয়ারি দূর্গা মন্দিরের জায়গাসহ মন্দিরটি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের এলাকাবাসীর থেকে কেড়ে নিয়েছেন বাবা রঞ্জিত সাহার মৃত্যুর পর। তা নিয়েও স্থানীয় দীগনগর সাহা পাড়ায় হাঙ্গামা- মামলা-হামলা- বিরোধ লেগেই আছে।
এদিকে, ফরিদপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় তাদের অধিগ্রহণকৃত জমি দখলমুক্ত করতে ও দখলকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দিলেও ওই বিষয়ে এখনও দৃশ্যমান তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি ফরিদপুর সওজ। দখলদার দূর্বৃত্তরা এরই মধ্যে সড়ক বিভাগ তথা সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে তাদের টার্গেট সফল করে ফেলেছেন। ফরিদপুর সওজ এর নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ সাইফুল্লাহ সরদার এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত ফরিদপুর কোতয়ালি থানায় কোনো মামলা করেননি জানিয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান জানান, এ বিষয়ে আমার সাথে এখনও কোনো যোগাযোগ করেননি ফরিদপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগ। তবে, আমরা অভিযোগ পেলেই রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষায় এ ব্যাপারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
ফরিদপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের সার্ভেয়ার শিপনের দায়িত্ব সড়ক বিভাগের অধিগ্রহণকৃত জমি দেখে রাখা। কিন্তু তিনি ঠিকমতো বলতেই পারেন না তেঁতুল তলায় সড়কের জমির সীমানা কতটুকু। এমনকি এ জমি একটি নীচু খাঁদ বা পুকুর ছিলো। দুর্বৃত্তরা এটি দখল করতে বেশ কয়েক বছর যাবত মরিয়া ছিলেন। তারা শেখ হাসিনা সরকারের আমল থেকে এখন পর্যন্ত একটু একটু করে দখল করেছেন, ওই জমি ভরাট করেছেন এবং এখন সেখানে দু'টি ভবন নির্মাণ সম্পূর্ণ করলেন। এক্ষেত্রে সওজের সার্ভেয়ার শিপন সব সময় বিতর্কিত ভুমিকায় নিজের চেহারা প্রদর্শন করেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ওই ভূমি খেকোরা ফরিদপুরের সড়ক ও জনপথ বিভাগ বলতে শুধু এ সার্ভেয়ার শিপনকেই চিনেন এবং তার সাথেই সখ্যতা গড়ে তুলেছেন। সওজের এ সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে অনেক অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে পুরো জেলা জুড়েই। সেসব তদন্তের দাবি রাখে বলে মনে করেন শিপনের বিরুদ্ধে নালিশ শুনতে শুনতে ক্লান্ত খোদ সড়ক বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তাবৃন্দ ও ভুক্তভোগী জনগণ। তবে, সার্ভেয়ার শিপন এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এর আগে, আওয়ামী লীগ থেকে হঠাৎ করে জামায়াতের সমর্থক বনে গিয়ে বিএনপি'র বিরুদ্ধে নির্বাচন করা হামজা শেখদের কথায় বিএনপি'র বর্তমান কোনো নেতাকর্মী রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধী এমন গর্হিত কাজে তাদের সহযোগিতা করার কথা নয়- 'দৈনিক বাংলা ৭১'কে এমনটিই জানিয়েছেন ফরিদপুর জেলা বিএনপি'র সদস্য সচিব এ. কে. কিবরিয়া স্বপন। তাঁর সাথে এ বিষয়ে খোলামেলা আলাপকালে প্রাথমিকভাবে তিনি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে, বিষয়টি তিনি জানেন না এবং এটি খতিয়ে দেখে পরে মন্তব্য করবেন জানিয়ে বিএনপি নেতা কিবরিয়া স্বপন আরও বলেন, 'যদি তার দলের কেউ সত্যিই এ কাজে জড়িত থাকেন, তবে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সাংগঠনিকভাবেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে'।
এর আগে হামজা শেখের তেঁতুল তলার সরকারি জায়গা দখল করে ভবন নির্মাণের দায়িত্বে থাকা জনৈক জসিম ব্যাপারি (২৯) জানান, সড়ক বিভাগের যায়গায় নয়, হামজা শেখ এ জমি, ভূমি অফিস থেকে ডিসিআর কেটে নিয়েছেন, সেখানে এ ভবন দু'টি নির্মাণ করেছেন। আমাদের কাছে সব কাগজপত্র আছে বললেও এ বিষয়ে কোনো প্রকার কাগজপত্র দেখাতে পারেননি জসিম। পরে হামজা শেখের ভাই উজ্জল শেখ ও হামজার শ্বশুর এ প্রতিবেদকের সাথে দেখা করে তাদের সহযোগিতা করার জন্য অনৈতিক প্রস্তাব দেন। এ চেষ্টাটি তারা একাধিক মাধ্যমে করেও ব্যর্থ হয়ে ভয় ভীতি প্রদর্শনেরও চেষ্টা করেন।
জসিম ব্যাপারি'র তথ্য যাচাই করতে ওই ভুমি'র ডিসিআর কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে, ফরিদপুর সদর উপজেলার সহকারি কমিশনার ভূমি (এসিল্যান্ড) মো. শফিকুল ইসলাম 'দৈনিক বাংলা ৭১'কে জানান, সড়ক বিভাগের জমি আমাদের লিজ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সড়ক বিভাগ মাঝে মাঝে হয়তো কিছু জমি ডিসিআরের মাধ্যমে লিজ দেন বটে, কিন্তু এ জমিটি দিয়েছেন কিনা তা আমি সঠিক জানি না, জেনে পরে আপনাকে জানাতে পারবো বলেও জানান এসিল্যান্ড শফিকুল'।
এ বিষয়ে ফরিদপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার জসিমের এমন দাবিকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে সরাসরি অগ্রাহ্য করে জানান, ওইখান থেকে আমরা কাউকে কোনো জমি লিজ দেয়নি এবং দেওয়ার পরিকল্পনাও আপাতত সড়ক বিভাগের নেই। শীঘ্রই তেঁতুল তলায় বেদখল হওয়া সরকারি জমি দখলমুক্ত করা হবে। পাশাপাশি অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে'।
তারও আগে, সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সরকারি জায়গায় ভবন নির্মাণ কাজ কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় কাজ চালু করেছেন দুর্বৃত্তরা জানালে ফরিদপুর জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. নজরুল ইসলাম, পিপিএম জানান, 'সড়ক ও জনপথ বিভাগের জায়গা যেহেতু, তাদেরকে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জনস্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় আমরা সড়ক ও জনপথ বিভাগকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবো'। অবৈধভাগে রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখলের কোন সুযোগ নেই জানিয়ে এসপি নজরুল আরও জানান,'এখনি আমি পুলিশ পাঠিয়ে খোঁজ নিচ্ছি। কিন্তু পরবর্তী পদক্ষেপ সড়ক ও জনপথ বিভাগকেই নিতে হবে। আমরা এ কাজে তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবো'।
এর একটু পরেই পুলিশ সুপারের পাঠানো টহল পুলিশ ঘটনাস্থলে আসলে দুর্বৃত্তরা পুলিশ দেখে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে সবাই ওইদিন পালিয়ে যায়।
এদিকে, ফরিদপুর পুলিশ সুপারের উপরোক্ত বক্তব্য সম্পর্কে অবগত করলে সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার বলেন, 'আমি অলরেডি আমার বিভাগের সার্ভেয়ার টিমকে মামলা রেডি করতে বলে দিয়েছি এবং লিটন সাহার দাবিকৃত ওই দুই শতাংশ জমির আইনগতভাবে সমাধানের কাজ করার নির্দেশনা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, আমরা যেহেতু অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের তাদেরকে নিষেধ করেছি, নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে বলেছি, হয়তো তারা এটা করবে না। আর করলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় অবশ্যই আমরা কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবো'।
কিন্তু সওজের নির্বাহী প্রকৌশলীর বিশ্বাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এর এক সপ্তাহ পরই রাজবাড়ী রাস্তার মোড়ের এক কৃষকদল নেতার সাথে পরিচিত হয়ে তাঁর নাম ভাঙিয়ে পুনরায় কাজ শুরু করেন অতি চতুর হামজা শেখ ও উজ্জল শেখ গংরা। গত ঈদুল আযহার আগে সড়ক বিভাগকে অবগত করলে ফরিদপুর সওজ-এর কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, 'আমাদের নির্বাহী প্রকৌশলী স্যার দেশের বাইরে আছেন, তিনি আসলে এ বিষয়ে তাঁকে জানানো হবে'।
গরীব পরিবার থেকে সবাইকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ বড়লোক বনে যাওয়া হামজা শেখ বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এসে নিজেকে ভিন্ন পরিচয়ে উপস্থাপন করেন। সাবেক আওয়ামী লীগ কর্মী হামজা শেখ গংরা গত নির্বাচনে জামায়াতের কর্মী হয়ে নির্বাচন করেন। আর, এবার দেশে ফিরেই নিজেকে বিএনপি'র কর্মী দাবি করেন স্থানীয়দের নিকট। এরপর তিনি রাজবাড়ী রাস্তার মোড়ে এক প্রভাবশালী বিএনপি নেতার বাড়িতে গিয়ে দেখা করে ভুলভাল বুঝিয়ে তার সাথে পরিচিত হয়ে আসেন। পরে হামজার স্বশুরের আত্মীয় স্থানীয় কানাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের এক মেম্বারকে সামনে রেখে দখলদার হামজা গং তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হন। এবং অবৈধ দখলকৃত সরকারি জায়গায় ভবণ নির্মাণের কাজ শেষ করে আগামী নির্বানে কানাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের ঘোষণা দেন তিনি। সবাইকে ঘোল খাইয়ে 'মুই কি হনুরে' টাইপ মানুসিকতায় খোশমেজাজে ঈদুল আযহা উৎযাপন করেন।
এদিকে, এসবের মধ্যখানের সময়টুকুতে সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর অনুপস্থিতির মধ্যে এ জায়গাটির তদারকির দায়িত্বে ছিলেন সড়ক বিভাগের সার্ভেয়ার শিপন। সওজের এ সার্ভেয়ার সবকিছু অবগত থাকা সত্ত্বেও দখলদার বাহিনীর এ ভবন দু'টি নির্মাণে কোনো প্রকার বাধা প্রদান করেননি।
বর্তমানে সরকারি জায়গা দখল করে সদ্য নির্মিত ওই ভবন দু'টিতে দোকান বরাদ্দের কাজ চালাচ্ছেন হামজা শেখ গং খ্যাত ওই দখলদার বাহিনী।
আরও উল্লেখ্য যে, সড়ক বিভাগের অধিগ্রহণকৃত ওই জমির সীমানা পার হয়ে ভিতরের সাইডে আওয়ামী সরকারের আমলে কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাকে বাসায় দাওয়াত করে খাইয়ে ফরিদপুর জেলা পরিষদ থেকে কিছু জমি লিজ নিয়েছিলেন হামজা শেখ। যদিও আশেপাশের জমির মালিকদের মধ্যে ওখানকার সরকারি জমি ভরাট নিয়ে বেশ কয়েকবার মারামারি পর্যন্তও হয়েছে। ওই সময় স্থানীয় এক ওয়ার্ড বিএনপি নেতাকে আত্মীয় বানিয়ে ওই গোল্ডগোল মিটান তিনি। যদিও গত নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হামজাদের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেন ওই ওয়ার্ড বিএনপি নেতা। আওয়ামী লীগ আমলে গড়ে উঠা এ অধৈব দখলদার সিন্ডিকেট বেশ কৌশলী এবং শক্তিশালীও বলে ধারণা স্থানীয়দের। তারা ওই সময়েও যেমন দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ভূমি দস্যূতা করে বেড়াতেন, এখনও একই কায়দায় একই কাজ তারা করে যাচ্ছেন অবলীলায়।
এমতাবস্থায়, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধিগ্রহণকৃত এ জায়গাটুকু অবৈধ দখলদার বাহিনী থেকে উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনগণ। অন্যথায় ওইখানের সরকারি সব জায়গা দখল হয়ে গড়ে উঠতে পারে অবৈধ আরও কয়েকটি মার্কেট, এমনটি মনে করছেন সাধারণ জনগণ ও সড়ক বিভাগের অধিকাংশ কর্মকর্তাবৃন্দ। যেহেতু মাটি ভরাট করা রয়েছে, এ সিন্ডিকেটের কাছে এটি ব্যাপার না বলেই আশংকা প্রকাশ করছেন স্থানীয় জনতা।
চলবে...
(আরআর/এএস/জুন ০৬, ২০২৬)
