ডা. মু. মাহতাব হোসাইন মাজেদ


খাদ্য মানুষের জীবনের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। সুস্থ, কর্মক্ষম ও নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য নিরাপদ খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সেই খাদ্যই অনেক সময় মানুষের অসুস্থতা, দুর্ভোগ ও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনিরাপদ খাদ্য আজ বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৮৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হচ্ছেন এবং অন্তত ১৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। ৭ জুন বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এই তথ্য বিশ্ববাসীর জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

ডব্লিউএইচও’র সাম্প্রতিক উদ্বেগজনক তথ্য

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, অনিরাপদ খাদ্য এখনো বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি। সংস্থাটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খাদ্যবাহিত ঝুঁকি ও রোগ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ দূষিত খাদ্যের কারণে অসুস্থ হচ্ছেন এবং লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। খাবারে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি এখনো বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের প্রধান কারণ। বিশেষ করে খাদ্যে আর্সেনিকসহ বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিকের দূষণ দীর্ঘমেয়াদে মানুষের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

ডব্লিউএইচও আরও জানিয়েছে, শিশুদের মধ্যে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে দূষিত খাদ্যের প্রভাব শিশুদের শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে খাদ্যবাহিত রোগ ও মৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অনিরাপদ খাদ্য কেন ভয়ংকর

অনিরাপদ খাদ্য শুধু তাৎক্ষণিক অসুস্থতার কারণ নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদে নানা জটিল রোগ সৃষ্টি করতে পারে। দূষিত খাদ্য মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে বিষক্রিয়া তৈরি করে। অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারেন না যে প্রতিদিনের খাবারের মাধ্যমেই শরীরে ক্ষতিকর রাসায়নিক জমছে।

অনিরাপদ খাদ্যের কারণে যেসব সমস্যা দেখা দেয়—

* ডায়রিয়া ও বমি * টাইফয়েড ও কলেরা * ফুড পয়জনিং * লিভার ও কিডনি জটিলতা * হেপাটাইটিস * অন্ত্রের সংক্রমণ * ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে অতিরিক্ত রাসায়নিক ও বিষাক্ত উপাদান দীর্ঘদিন শরীরে প্রবেশ করলে কিডনি বিকল হওয়া, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি এবং হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ে।

মানসিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব

অনিরাপদ খাদ্যের ক্ষতি শুধু শারীরিক নয়; এটি পরিবার ও রাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলে।

* দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
* কর্মক্ষমতা কমে যায়।
* দরিদ্র পরিবারগুলো আরও অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।
* শিশুদের শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়।
* স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হয়।

শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি

শিশুরাই খাদ্য দূষণের সবচেয়ে বড় শিকার। দূষিত দুধ, অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং অনিরাপদ পানি শিশুদের দ্রুত অসুস্থ করে তোলে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ঝুঁকি আরও বেশি। খাদ্যবাহিত রোগের কারণে অনেক শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

শিশুদের মধ্যে সাধারণত যেসব সমস্যা বেশি দেখা যায়—

* ডায়রিয়া * জ্বর ও বমি * অপুষ্টি * লিভার ও কিডনি সমস্যা * দুর্বল শারীরিক বৃদ্ধি।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশু মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ এখনো খাদ্যবাহিত রোগ।

অনিরাপদ খাদ্যের প্রধান কারণ

বর্তমানে খাদ্য দূষণের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ কাজ করছে।

১. খাদ্যে ভেজাল: অতিরিক্ত মুনাফার আশায় অনেক অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে থাকেন। এটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

২. অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার

* ফল পাকাতে কৃত্রিম রাসায়নিক
* সবজিতে অতিরিক্ত কীটনাশক
* মাছ ও মাংসে ফরমালিন
* মসলায় ক্ষতিকর রং

এসব রাসায়নিক দীর্ঘমেয়াদে শরীরে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে।

৩. অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ: খোলা ও নোংরা পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করলে সহজেই জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে।

৪. বিশুদ্ধ পানির অভাব: দূষিত পানি খাদ্যবাহিত রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। বিশুদ্ধ পানি ছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

৫. দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা: বাজার মনিটরিং ও আইন প্রয়োগ দুর্বল হলে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার বাস্তবতা

বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। প্রায়ই দেখা যায়—

* ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার
* মাছে ফরমালিন প্রয়োগ
* দুধে ডিটারজেন্ট বা স্টার্চ মেশানো
* মসলায় কৃত্রিম রং
* মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য বিক্রি

রাস্তার পাশের অস্বাস্থ্যকর খাবারও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি। উৎসব মৌসুমে খাদ্যে ভেজালের প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। এসব কারণে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ অসুস্থ হচ্ছেন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কেন বেশি ঝুঁকিতে

ডব্লিউএইচও’র তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর বাসিন্দা। এর কারণ—

* অতিরিক্ত জনসংখ্যা * দারিদ্র্য
* স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব
* অস্বাস্থ্যকর বাজার ব্যবস্থা
* নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা
* দুর্বল প্রশাসনিক তদারকি

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রযুক্তি ও খাদ্য নিরাপত্তা

বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যবহার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

* আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার স্থাপন
* ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু
* অনলাইনে খাদ্যের মান যাচাই
* নিরাপদ কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার
* মোবাইল কোর্ট ও তাৎক্ষণিক মনিটরিং।এসব উদ্যোগ খাদ্যে ভেজাল কমাতে কার্যকর হতে পারে।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে করণীয়

সরকারের দায়িত্ব

* খাদ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করা
* কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা
* খাদ্য পরীক্ষাগার বৃদ্ধি করা
* নিরাপদ কৃষি ব্যবস্থা চালু করা
* বাজার মনিটরিং বাড়ানো
* ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা

উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব

* ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার বন্ধ করা
* স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাদ্য সংরক্ষণ করা
* মানসম্মত উৎপাদন নিশ্চিত করা
* মেয়াদ ও গুণগত মান সঠিকভাবে উল্লেখ করা

সাধারণ মানুষের করণীয়

* খোলা ও অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলা
* ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া
* মেয়াদ যাচাই করে খাদ্য কেনা
* বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা
* শিশুদের খাদ্যের বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকা
* অতিরিক্ত রঙিন ও অস্বাভাবিক খাবার পরিহার করা

পরিবারে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের উপায়

* রান্নার আগে ও পরে হাত ধোয়া
* কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা
* খাবার ঢেকে রাখা
* সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা
* বাসি খাবার এড়িয়ে চলা
* নিরাপদ পানি ব্যবহার করা

জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্য নিরাপত্তা

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় খাদ্যে জীবাণু দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বন্যা ও জলাবদ্ধতায় খাবার দূষিত হয়। পরিবেশ দূষণের কারণে কৃষিপণ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার বিকল্প নেই।

বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবসের গুরুত্ব

বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবসের মূল লক্ষ্য হলো—

* খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি
* খাদ্যবাহিত রোগ প্রতিরোধে উদ্যোগ গ্রহণ
* নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া
* আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা
* নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনায় গবেষণা বাড়ানো। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে নিরাপদ খাদ্য শুধু স্বাস্থ্য নয়, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

পরিশেষে বলা যায়, নিরাপদ খাদ্য সুস্থ জীবনের পূর্বশর্ত। অথচ আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন অনিরাপদ খাদ্যের ঝুঁকিতে বসবাস করছে। খাদ্যে ভেজাল, রাসায়নিক দূষণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ মানবস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার, উৎপাদক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ— সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস হোক নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার নতুন অঙ্গীকার এবং সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়ার প্রেরণা।

লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক।