মানিক লাল ঘোষ


বাঙালি জাতি চির দুর্বার, চির দুর্দম। যুগে যুগে তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছে। শক্তিবলে অসম হলেও তারা ব্রিটিশদের সামনেও কভু মাথা নত করেনি। পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠীর দুঃশাসন, অত্যাচারে জর্জরিত বাঙালি দৃঢ়কন্ঠে অন্যায়ের প্রতিবাদ জানিয়েছে। ৫২’র হার না মানা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছে নিজেদের মাতৃভাষার অধিকার। ধীরে ধীরে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে গেছে স্বাধিকার আন্দোলনের দিকে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দ্বি-জাতির ভিত্তিতে জন্ম নেওয়া পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়ে বাঙালি জাতির ওপর প্রথম আঘাত আসে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে।

এই শোষণের প্রতিবাদে ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লাহোরে ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। এটি ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ, যা পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর ভেতরেই বাঙালির স্বাধিকার নিশ্চিত করার রূপরেখা ছিল। কিন্তু তৎকালীন শাসকরা একে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে। বঙ্গবন্ধু ছয় দফাকে জনগণের দাবিতে পরিণত করতে মাঠ পর্যায়ে নেমে পড়েন এবং ১৯৬৬ সালের ৮ মে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এই গ্রেফতারের প্রতিবাদে এবং বঙ্গবন্ধু ও মুক্তি সংগ্রামের দাবিতে রাজপথে নেমে আসে ছাত্র-জনতা।

১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছয় দফার পক্ষে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে টঙ্গী, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ ১১ জন বাঙালি শহীদ হন। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এটিই বাঙালির প্রথম রক্তদান, যা পাকিস্তান শাসকের ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এই আন্দোলনের পথ ধরেই ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন এবং অবশেষে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই ছয় দফা ছিল নিম্নরূপ:

প্রথম দফা: শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি: দেশের শাসনতন্ত্রে পাকিস্তানকে একটি ফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করতে হবে এবং সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে। সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

দ্বিতীয় দফা: কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা কেবল দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি—এই দুটি বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে।

তৃতীয় দফা: মুদ্রা বা অর্থ বিষয়ক নীতি: পুরো দেশের জন্য দুটি পৃথক অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা থাকবে অথবা দুই অঞ্চলের জন্য একই মুদ্রা থাকলেও এমন শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকবে যাতে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে মূলধন পাচার হতে না পারে। এক্ষেত্রে দুই অঞ্চলের জন্য আলাদা ব্যাংকিং নীতি ও রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে।

চতুর্থ দফা: রাজস্ব, কর ও শুল্ক বিষয়ক ক্ষমতা: কর বা খাজনা ধার্য ও আদায় করার ক্ষমতা থাকবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো কর আদায়ের ক্ষমতা থাকবে না। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য আদায়কৃত করের একটি নির্দিষ্ট অংশ কেন্দ্রকে দেওয়া হবে।

পঞ্চম দফা: বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা: অঙ্গরাজ্যগুলো তাদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার অধিকারী হবে এবং কেন্দ্রের সাথে অঙ্গরাজ্যগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনে একটি নির্দিষ্ট অনুপাত নির্ধারিত থাকবে। অঙ্গরাজ্যগুলো বিদেশে নিজ নিজ বাণিজ্যিক প্রতিনিধি পাঠানোর ও বাণিজ্য চুক্তি করার ক্ষমতা রাখবে।

ষষ্ঠ দফা: আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা: আঞ্চলিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অঙ্গরাজ্যগুলো নিজস্ব আধা-সামরিক বাহিনী বা সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা রাখবে।

বঙ্গবন্ধুর এই ছয় দফাকে অনেকেই 'ম্যাগনাকার্টা' হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান সময়ে একটি গভীর উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একটি বিশেষ মহলের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা চলছে। স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকে অস্বীকার করা এবং ইতিহাস থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলার এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র দৃশ্যমান।

অথচ এটি ঐতিহাসিক অমোঘ সত্য যে, ছয় দফা ছিল আমাদের স্বাধীনতার মাইলফলক। যারা আজ ৭ জুন তথা ছয় দফার ইতিহাসকে অস্বীকার করতে চায়, তারা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তরুণ প্রজন্মের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করার জন্য ইতিহাসকে নতুন মোড়কে উপস্থাপন করার যে অপচেষ্টা চলছে, তা আমাদের জাতীয় সত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।

ইতিহাসের পাতায় বঙ্গবন্ধু ও ছয় দফা অবিচ্ছেদ্য। কোনো ষড়যন্ত্রই বাঙালির চেতনার মূলে থাকা এই ইতিহাসকে মুছে ফেলতে পারবে না। ইতিহাস তার আপন গতিতে চলে। যে বা যারা আজ ইতিহাসকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে, ইতিহাসের বিচারেই তারা একদিন আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে—এটি কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। আজকের এই দিনে, যখন ইতিহাস নিয়ে টানাপোড়েন চলছে, তখন নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব হলো ছয় দফার প্রকৃত মর্মার্থ বোঝা। এই ইতিহাসকে ধারণ করাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দেশপ্রেম।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি।