সাতক্ষীরা সীমান্তে দুই যুবক গুলিবিদ্ধ
ঘটনার নেপথ্য জানতে শামীমকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি স্বজনদের
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : গত ৩ জুন অবৈধপথে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসার সময় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর গুলিতে জখম দুই বাংলাদেশীর মধ্যে মহিউদ্দিনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আজ রবিবার সকালে ঢাকার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। অপর আহত শাহীনুরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর কথা বলা হলেও অর্থাভাবে পরিবারের লোকজন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
এদিকে কোন সীমান্তে বিএসএফ মহিউদ্দন ও শাহীনের উপর গুলি চালিয়েছিল তা আজো নিশ্চিত হতে পারেনি তাদের পরিবারের সদস্যরা। তবে সীমান্ত অতিক্রমকালে একই সাথে থাকা একই গ্রাম কালিগঞ্জের শীতলপুর গ্রামের মুজিবর রহমানের ছেলে শামীম বৃহস্পতিবার বাড়ি ফিরে প্রকাশ্যে চলাফেরা করলেও তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি আইনপ্রয়োগকারি সংস্থার লোকজন।
শনিবার দুপুরে সরেজমিনে কালিগঞ্জ উপজেলার শীতলপুর গ্রামে গেলে বৃদ্ধা শাহীনা খাতুন বলেন, তিন ছেলে ও এক মেয়ে তার। কোন রকমে এক টুকরা জমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই বানিয়ে তাদের বসবাস। বড় ছেলে মহিউদ্দিনের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে রাকিব শীতলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। মেয়ে আয়েশার বয়স প্রায় এক বছর। অভাবের তাড়নায় ৬/৭ বছর অঅগে থেকে মহিউদ্দিন ভারতীয় টুরিষ্ট ভিসায় তামিলনাড়–তে যেয়ে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতো। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর টুরিষ্ট ভিসা বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে পাঁচ মাস আগে অবৈধপথে তামিলনাড়ুতে যেয়ে কাজ করতে থাকে সে। মেয়ের জন্য মন খারাপ হওয়ায় ঈদের আগেই বাড়িতে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করে স্ত্রী রেবেকাকে মুঠোফোনে জানায় সে। ৩ জুন সকালে খবর পান যে, কে বা কাহারা মহিউদ্দিন ও প্রতিবেশি শাহীনকে মাইক্রোবাসে করে নলতা হাসপাতালের পাশে ফেলে রেখে গেছে।
ইশারত আলী জানান, বড় ভাই মহিউদ্দিনের ডান হাত ও ডান চোখ গুলিবিদ্ধ হয়। তার চোখের উন্নত চিকিৎসার জন্য শনিবার রাত ১০টার দিকে তাকে ঢাকায় রেফার করা হয়। রবিবার সকালে তাকে ঢাকার শ্যামলীর জাতীয় চক্ষু ও বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। বিকেল চারটায় ভাই এর অপারেশনের ব্যাপারে মেডিকেল বোর্ড গঠণ করার কথা রয়েছে। বড় ভাই কিভাবে বিএসএফ এর হাতে গুলিবিদ্ধ হলো জানতে চাইলে ইশারত জানান, ২ জুন মঙ্গলবার ভাই মহিউদ্দিন(৪২), প্রতিবেশী শাহীন ও শামীমসহ পাঁচজন একসাথে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে হাবড়া স্টেশনে নামে। সেখান থেকে টোটো ভাড়া করে রাতে বাংলাদেশ সীমান্তে আসে তারা। বাংলাদেশে আসার জন্য শামীম দালাল ঠিক করে। সেখানে এক দালাল টাকা নিয়ে গভীর রাতে একটি পাট খেতের মধ্য দিয়ে তাদেরকে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ঠেলে দিলে দুজন গুলিবিদ্ধ হলো। তিনজন চলে গেল। তিনজনের মধ্যে শামীম সুস্থ শরীরে পরদিন বৃহষ্পতিবার বাড়ি ফিরে এলো। অথচ তার কাছ থেকে আইনপ্রয়োগকারি সংস্থার লোকজন জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে গুলির নেপথ্য কারণ ও কোন সীমান্তে ঘটনা ঘটেছে তা জানতে পারলো না সেটা দূঃখজনক। অর্থাভাবে তিনি তার ভাইকে ভাল মানের চিকিৎসা দিতে পারছেন না বলে দাবি করেন তিনি।
শনিবার দুপুরে শাহীনের(২৮) বাড়িতে গেলে কাউকে পাওয়া যায়নি। মেয়ে সাদিয়া (৬) ও সিন্থিয়াকে (৪) নিয়ে শাহীনের স্ত্রী বাপের বাড়ি শ্যামনগরের ট্যাংরাখালিতে গেছে। তবে মুঠোফোনে তার ভাই ফারুক হোসেন এ প্রতিবেদকে জানান, টুরিষ্ট ভিসা চালু থাকায় অভাবের তাড়নায় ৫/৬ বছর আগে থেকে শাহীন পাসপোর্টে তামিলনাড়– যেয়ে নির্মাণ শ্রামক হিসেবে কাজ করতো। টুরিষ্ট ভিসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দোচালা যুক্ত ঘরটুকুই সম্বল থাকা শাহীন অভাবের তাড়নায় এক বছর আগে অবৈধপথে তামিলনাড়–তে কাজ করতে যায়। মহিউদ্দিন, শাহীন ও শামীম একসাথে দেশে ফেরার সময় দুইজন গুলিবিদ্ধ হলো আর শামীম নিরাপদে অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরে এলো। অথচ আইনপ্রয়োগকারি সংস্থা চিকিৎসাধীন ভাই শাহীন, মহিউদ্দিন এবং শামীমের কাছ থেকে কোন সীমান্তে বিএসএফ গুলি চালালো তা জানতে পারছে না।
শামীম বর্তমানে একই গ্রামে তার শ্বশুর বাড়ি থাকে উল্লেখ করে ফারুক হোসেন বলেন, ভাড়ায় মটর সাইকেল চালক শ্বশুর কামরুল বিজিবি’র সোর্স ও বিজিবি সদস্যদের বিভিন্ন স্থানে বহন করে থাকে। সে কারণে শামীমকে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। যে কারণে গুলির ঘটনা অন্ধকারে রয়ে গেছে। তিনি তার ভাইকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা কামনা করেন।
শামীমের শ্বশুর বাড়িতে গেলে তার শাশুড়ি ঝর্ণা খাতুন বলেন, শামীম বিয়ের পর থেকেই তাদের কাছে থাকে। শামীম বিএসএফ দেখে উল্টো দৌড় দিয়ে রক্ষা পেলেও পাট খেতে পড়ে যেয়ে তার দুই হা্টুঁ জখম হয়েছে। তাই শনিবার সকালে সাতক্ষীরায় ডাক্তারের কাছে গেছে। তবে তার ফোন নাম্বার দিতে অপারগতা প্রকাশ করেনর তিনি। তবে শামীমের শ্বশুর কামরুল ইসলাম বলেন, তিনি ভাড়ায় মটর সাইকেল চালান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিজিবি সদস্যদের বহন করে থাকেন। সেকারণে তিনি জানতে পেরেছেন যে, সদর উপজেলার কুশখালির নিকটবর্তী কালিয়ানি-ছয়ঘরিয়ার বিপরীতে কৈজুড়ি- বাঁকড়া সীমান্ত দিয়ে তার জামাতারা দেশে ফিরতে চেয়েছিল। সেখানেই বিএসএফ এর গুলিতে মহিউদ্দিন ও শাহীন গুলিবিদ্ধ হতে পারে।
এ ব্যাপারে গত বুধবার সাতক্ষীরা নীলডুমুর -১৭ বিজিবি’র অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল রাজীব শাহারিয়ার ও সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবি’র অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল আশিকুর রহমান চৌধুরী বিএসএফ এর গুলিতে দুইজনের জখম হওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করলেও কোন সীমান্তে ঘটনা ঘটেছে তা তারা নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে রবিবার তাদের সঙ্গে নতুন করে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
(আরকে/এসপি/জুন ০৭, ২০২৬)
