আবদুল হামিদ মাহবুব


একটি দেশের অর্থনীতি তখনই সুস্থভাবে এগিয়ে যায়, যখন উন্নয়নের সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে এবং নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায়, অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার জন্য নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর।

সম্প্রতি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকার হয়তো বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ কমাতে এবং আর্থিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতায় রাজস্ব বৃদ্ধি ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বোঝা কে বহন করবে?

যাদের অবৈধ আয় আছে, যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে অঢেল অর্থ আসে, কিংবা যাদের আয়ের উৎস বহুমুখী, তাদের কাছে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি বা সেবার ফি বৃদ্ধি বড় কোনো সমস্যা নয়। একইভাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে কিংবা বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুবিধা পেলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পাবে। ফলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও তারা তুলনামূলকভাবে তা সামাল দিতে পারবেন। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ তো এই শ্রেণির নন।

বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন কৃষক, দিনমজুর, রিকশাচালক, মজুর, কারখানার শ্রমিক, গৃহকর্মী, জেলে, তাঁতি, বর্গাচাষি, পাহাড়ের জুমচাষের শ্রমিক, চা-বাগানের শ্রমিক, বন্দর শ্রমিক, রেলস্টেশনের কুলি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বিধবা, স্বামী-পরিত্যক্তা নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং শহর ও গ্রামের অসংখ্য প্রান্তিক মানুষ। তাদের আয় সীমিত, অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মিতও। মাসের আয় যেমন থাকে, ব্যয়ও তেমন হিসাব করেই চালাতে হয়। একটি জিনিসের দাম বাড়লে অন্য একটি জিনিসের খরচ কমিয়ে সংসার চালাতে হয়। এই মানুষগুলোর জন্য বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি বিল বাড়ার ঘটনা নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক চাপ।

ধরা যাক, আগে কোনো পরিবারের মাসিক বিদ্যুৎ বিল ছিল ৫০০ টাকা। মূল্যবৃদ্ধির ফলে তা যদি ৫৮০ টাকায় পৌঁছায়, তাহলে অতিরিক্ত ৮০ টাকা ব্যয় করতে হবে। যার বিল ছিল ১,০০০ টাকা, তার ক্ষেত্রে তা বেড়ে ১,১৬০ টাকা হতে পারে।আপাতদৃষ্টিতে এই বৃদ্ধি সামান্য মনে হলেও সীমিত আয়ের পরিবারের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকৃত সমস্যা কেবল এখানেই শেষ নয়।

বিদ্যুৎ আধুনিক অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি উৎপাদন ও সেবা খাতের সঙ্গে জড়িত। শিল্পকারখানা, কৃষি সেচ, ক্ষুদ্র উদ্যোগ, দোকানপাট, পরিবহন ব্যবস্থা, ঠান্ডা সংরক্ষণাগার; সব ক্ষেত্রেই বিদ্যুতের ব্যবহার রয়েছে। ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, আর উৎপাদন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দামও বাড়ে। অর্থাৎ বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্যপণ্য, পোশাক, নির্মাণসামগ্রী, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য সেবার খরচও ধীরে ধীরে বেড়ে যায়।

যে পরিবার মাসে ১৫ হাজার টাকার বাজেটে কোনোমতে সংসার চালায়, তাদের ব্যয় কয়েক মাসের মধ্যেই ১৭ বা ১৮ হাজার টাকায় পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু তাদের আয় কি একই হারে বাড়ে? বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাড়ে না। ফলে পরিবারের পুষ্টি, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সঞ্চয়, সবকিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। বিদ্যুৎ খাতে যে ভর্তুকি দেওয়া হয়, তার প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা? একজন নিম্নআয়ের পরিবার হয়তো একটি বা দুটি পাখা, কয়েকটি বাতি এবং একটি টেলিভিশন ব্যবহার করে। অন্যদিকে উচ্চ আয়ের কোনো পরিবারে একাধিক এয়ার কন্ডিশনার, ফ্রিজ, ওয়াটার হিটার এবং নানা ধরনের বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয়। তাহলে মূল্যবৃদ্ধির বোঝা কি সবার জন্য একইভাবে চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত?

অনেক দেশেই ধাপে ধাপে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। যারা কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তারা তুলনামূলক কম দামে বিদ্যুৎ পায়; আর যারা বেশি ব্যবহার করে, তাদের বেশি মূল্য দিতে হয়। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার কিছুটা সুরক্ষা পায় এবং ভর্তুকির সুবিধা প্রকৃত প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছায়।

রাষ্ট্র পরিচালনায় কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া লাগতেই পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে এর সামাজিক ও মানবিক প্রভাব গভীরভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। উন্নয়নের লক্ষ্য যদি মানুষের জীবনমান উন্নত করা হয়, তাহলে এমন কোনো নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়, যা কোটি কোটি মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে।

একটি সুখী সমাজ গড়তে হলে মানুষের জীবনকে স্বস্তিদায়ক করতে হবে। সংসারে টানাপোড়েন, অনিশ্চয়তা ও ক্রমবর্ধমান ব্যয় মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। জনগণ ভালো না থাকলে রাষ্ট্রও দীর্ঘমেয়াদে ভালো থাকতে পারে না। এটি কোনো হুমকি নয়; বরং রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার একটি স্বীকৃত সত্য।

তাই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কার্যকরের আগে সরকারের উচিত বিষয়টি আরও ব্যাপকভাবে পর্যালোচনা করা, নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার অবকাঠামোতে নয়, তার মানুষের কল্যাণে নিহিত। সাধারণ নাগরিক হিসেবে এই প্রশ্ন ও উদ্বেগগুলো নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরা আমাদের অধিকার এবং দায়িত্ব; যেন উন্নয়নের পথ মানুষের জীবনকে আরও সহজ করে, কঠিন নয়।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।