ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে মেসি, যেখানে রাজনীতি ও ফুটবল মিশে একাকার
স্পোর্টস ডেস্ক : ৪৮টি দল ১০৪টি ম্যাচ। সবশেষে বিজয়ী একটি দল। ম্যারাথন এই ফুটবল বিশ্বকাপে কি থাকছে না? বিশ্বের সকলের মনোযোগ এখন এই বিশ্বকাপে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ঘোষণা করেছেন, ‘এটি হবে এ যাবতকালের সবচেয়ে বড়, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ফিফা বিশ্বকাপ।’
এছাড়া, তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ‘৭০ লক্ষ দর্শক স্টেডিয়ামগুলো ভরিয়ে তুলবে এবং আরও ৬০০ কোটি দর্শক দূর থেকে খেলা দেখবেন। ফিফা হলো মানবজাতির জন্য প্রসন্নতার আনুষ্ঠানিক যোগানদাতা।’
তবে দেখার বিষয় ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি, ইরানের যুদ্ধ এবং অভিবাসন সংক্রান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই টুর্নামেন্ট শুরু হচ্ছে, যেখানে টুর্নামেন্টের বেশিরভাগ খেলাই অনুষ্ঠিত হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকায় বিশ্বকাপ আয়োজনের একজন বড় সমর্থক যিনি ইনফান্তিনোকে হোয়াইটহাউজ বারবার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং টুর্নামেন্ট সম্পর্কে উৎসাহপূর্ণ প্রশংসা করেছেন।
ইনফান্তিনো এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে অনেক চেষ্টা করেছেন। নোবেল পুরস্কারের জন্য উপেক্ষিত হওয়ার পর গত বছর তিনি ট্রাম্পকে সর্বপ্রথম ফিফা শান্তি পুরস্কার প্রদান করেন। এছাড়াও ছিল টিফানির তৈরি ‘গোল্ডেন ক্লাব’ বিশ্বকাপ ট্রফি, যা গত বছর আমেরিকা টুর্নামেন্ট আয়োজন করার পর ওভাল অফিসে রাখা হয়েছিল।
DAZN-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি ফিফাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কখন তারা ট্রফিটি ফিরিয়ে নেবেন। তাকে বলা হয়েছিল, ‘আপনি এটা চিরকালের জন্য ওভাল অফিসে রাখতে পারেন। আমরা নতুন আরও একটি তৈরি করছি।’
ছয় মাস আগে জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের একজন কর্মকর্তা বলেছিলেন ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের কারণে বিশ্বকাপ বয়কটের কথা ভাবার সময় এসেছে, যার মধ্যে গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকিও ছিল। এর আগেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালায়, যার ফলে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। এটি বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল। দলটি তাদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অ্যারিজোনার টাস্কন থেকে মেক্সিকোর টিহুয়ানায় সরিয়ে নেয়। খেলা শুরুর মাত্র এক সপ্তাহ আগে তারা ভিসার ঝামেলার কথা জানায় এবং যুদ্ধের শুরুতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতদের স্মরণে ল্যাপেল পিন পরে আসে।
এই বিশ্বকাপের জন্য টিকিটের মূল্য নির্ধারণের কৌশল নিয়ে ফিফা তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে, যা এমনিতেই একটি ব্যয়বহুল আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। জানুয়ারিতে যখন টিকিট বিক্রি সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়, তখন সেগুলোর দাম ছিল ১৪০ ডলার থেকে ৮,৬৮০ ডলার পর্যন্ত। যদিও এরপর কিছু টিকিট কম দামে পাওয়া গেলেও, অন্যগুলোর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফাইনালের জন্য যা ৩২,৯৭০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে।
ভক্তরা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এক ‘বিশাল বিশ্বাসঘাতকতার’ জন্য অভিযুক্ত করেছেন। সেকেন্ডারি মার্কেটে পুনঃবিক্রয়ের দাম আরও বেশি, যেখানে এপ্রিলে ফিফার নিজস্ব পুনঃবিক্রয় মার্কেটপ্লেসে ফাইনালের চারটি টিকিট প্রতিটি প্রায় ২.৩ মিলিয়ন ডলারে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। যদিও ফিফা সাইটটিতে দাম নিয়ন্ত্রণ করে না তথাপি, প্রতিটি পুনঃবিক্রয় থেকে তারা ৩০% কমিশন নেয়।
খেলার জন্য পার্কিং বাবদ ১৭৫ ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে এবং ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধিতেও ভক্তরা হতবাক হয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, নিউ জার্সিতে যা ১২.৯০ ডলার থেকে বেড়ে ৯৮ ডলার হয়েছে।
ইনফান্তিনো টিকিটের দামের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন যে, ‘চাহিদা একসঙ্গে ১০০০ বছরের বিশ্বকাপের সমান’ এবং তিনি আরও বলেন যে, ১০৪টি ম্যাচের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাবে। তবে, সাম্প্রতিক একটি আইপিএসওএস (IPSOS) জরিপে দেখা গেছে যে মাত্র ২৬ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন তারা বিশ্বকাপ নিয়ে ‘কিছুটা উত্তেজিত’ এবং ৭% ‘অতিশয় বা অত্যন্ত উত্তেজিত।’
এদিকে, আমেরিকান হোটেল অ্যান্ড লজিং অ্যাসোসিয়েশনের এপ্রিল মাসের একটি সমীক্ষা অনুসারে, যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি আয়োজক শহরের বেশিরভাগেই রুম বুকিং প্রত্যাশার চেয়ে কম হয়েছে। তিনটি দেশ জুড়ে এই বিশাল আকারের টুর্নামেন্টটি ফিফা বিশ্বকাপের সর্বশেষ অভিক্রিয়া এবং এটি সফল হবে কিনা তা কেবল সময়ই বলতে পারবে।
অনেকের মতে, ৩২টি দল থেকে বাড়িয়ে ৪৮টি দল করা এবং ক্ষুদ্র কুরাসাও ও কেপ ভার্দের মতো নবাগতদের সুযোগ করে দেওয়ায় এই আয়োজনের মান কিছুটা কমে গেছে বলে মনে হতে পারে। শীর্ষস্থানীয় দলগুলো মূলত আলাদা হয়ে যাওয়ায় গ্রুপ পর্বের উত্তেজনা অনেকটাই কমে গেছে। এর মানে হলো, আসল নাটকীয়তা হয়তো শেষ ষোলো পর্ব পর্যন্ত কিছুটা শিথিল থাকবে।
‘দ্য পাওয়ার অ্যান্ড দ্য গ্লোরি: আ নিউ হিস্ট্রি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ’ গ্রন্থের লেখক জোনাথন উইলসন বলেন: ‘বিশ্বকাপকে সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বমূলক করার জন্য ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে তবে এটি এমন একটি ফুটবল টুর্নামেন্টও হতে হবে যা নির্ধারণ করবে বিশ্বের সেরা দল কে?’
একটি বিষয়ে ফিফাকে দোষ দেওয়া যায় না, তা হলো, খেলা চলাকালীন ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং তীব্র তাপ খেলোয়াড়, দর্শক, কর্মী এবং কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করতে পারে। কিছু ভেন্যুতে যেমন: টেক্সাসের ডালাস ও হিউস্টন শহরে অনুভূত তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস)-এর উপরে উঠতে পারে। যদিও কানসাস সিটি ও আটলান্টাও এর ব্যতিক্রম নয়। খেলোয়াড়দের জন্য জলপানের বিরতির মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে এবং ফিফা উত্তর আমেরিকা জুড়ে টুর্নামেন্টের ১৬টি স্টেডিয়ামের জন্য পানির বোতল সংক্রান্ত নীতিমালা পরিবর্তন করেছে, যার মধ্যে কিছু স্টেডিয়ামে রোদ থেকে বাঁচার জন্য সীমিত ছায়া রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত যখন বিশ্বকাপের কথা আসে তখন একমাত্র ফুটবলই সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় এবং সামনে অনেক সম্ভাবনাময় গল্প থাকে। ৩৮ বছর বয়সে, এই মঞ্চে যা নিশ্চিতভাবেই তার শেষ বিদায়, তাতে লিওনেল মেসি কি পারবেন বিশ্বকাপে তাঁর শেষ কীর্তি গড়তে? ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কি তার রেকর্ড-গড়া ক্যারিয়ারে অধরা সেই একটি বড় ট্রফি জিততে পারবেন? রেকর্ড পাঁচবারের বিজয়ী ব্রাজিল ২০ বছরেরও বেশি সময় পর তাদের প্রথম শিরোপার খোঁজে নেমেছে এবং এই খরা কাটাতে তারা কিংবদন্তি ইতালীয় কোচ কার্লো আনচেলোত্তির শরণাপন্ন হয়েছেন। ৬০ বছরের আক্ষেপের অবসান ঘটাতে জার্মান থমাস টুখেলের উপর আস্থা রেখেছে ইংল্যান্ড। আর আর্জেন্টাইন কোচ মাউরিসিও পোচেত্তিনোর নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের কী খবর? তারা কি নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপের সর্বকালের সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটাতে পারবে?
যুক্তরাষ্ট্রের অধিনায়ক টিম রিম এপি.কে. বলেন, যদি আপনি কোনো টুর্নামেন্টে এই ভেবে খেলতে নামেন যে, ‘ওহ হ্যাঁ, আমাদের জেতার কোনো সম্ভাবনাই নেই, তাহলে সেখানে যাওয়ারই বা কী মানে? খেলারই বা কী দরকার? আমরা যখন একসাথে থাকি, তখন তিনি (পচেত্তিনো) এ বিষয়ে কথা বলতে দ্বিধা করেন না... আমরা কেন পারব না? আমরা কেন এটা করতে পারি না?’
(ওএস/এএস/জুন ১১, ২০২৬)
