মীর আব্দুল আলীম


বাংলাদেশে আবারও ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক কম্পন সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। অনেকের কাছে এগুলো সাময়িক ঘটনা মনে হলেও ভূতত্ত্ববিদদের মতে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মা টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের নিকটে অবস্থানের কারণে এ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বহন করে আসছে। সাম্প্রতিক ঘনঘন কম্পন তাই শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি বৃহত্তর ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতার অংশ।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল: ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে একটি। দেশটির পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব অংশ এমন এক ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে অবস্থিত যেখানে ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা মাইক্রোপ্লেটের পারস্পরিক চাপ ও সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। ভারতীয় প্লেট প্রতি বছর গড়ে ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং সেই চাপের একটি অংশ বাংলাদেশের ভূগর্ভে সঞ্চিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে ভূমিকম্প কয়েক সেকেন্ডের একটি ঘটনা হলেও ভূতত্ত্ববিদদের কাছে এটি কয়েক শতাব্দী ধরে জমে থাকা শক্তির আকস্মিক মুক্তি। বাংলাদেশের চারপাশে অবস্থিত ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট, চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা ফল্ট এবং আরাকান সাবডাকশন জোন দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। এ কারণেই আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকম্প অঞ্চলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করে থাকে। উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশের জনসংখ্যা ও অবকাঠামো যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণও তত বহুগুণ বাড়ছে।

১৭৬২ সালের মহাভূমিকম্প কেন আজও প্রাসঙ্গিক?

বাংলাদেশের ভূমিকম্প ইতিহাসে ১৭৬২ সালের আরাকান বা চট্টগ্রাম মহাভূমিকম্প একটি যুগান্তকারী ঘটনা। আধুনিক গবেষণায় এর মাত্রা প্রায় ৮.৫ বলে অনুমান করা হয়, যা বিশ্বের ইতিহাসে সংঘটিত শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই ভূমিকম্পের ফলে চট্টগ্রাম উপকূলের কিছু এলাকা কয়েক মিটার উঁচু হয়ে যায়, আবার কিছু অঞ্চল স্থায়ীভাবে নিচে নেমে যায়। নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয় এবং উপকূলীয় ভূপ্রকৃতিতে স্থায়ী পরিবর্তন দেখা দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে আরাকান সাবডাকশন জোন থেকে এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছিল, সেই অঞ্চল এখনও সক্রিয়। অর্থাৎ যে ভূতাত্ত্বিক শক্তি আড়াই শতাব্দী আগে একটি মহাভূমিকম্প সৃষ্টি করেছিল, সেই ব্যবস্থাটি আজও বিদ্যমান। ফলে ১৭৬২ সালের ঘটনা কেবল ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্পের শিক্ষা: ১২ জুন ১৮৯৭ সালে সংঘটিত গ্রেট আসাম ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল প্রায় ৮.১। এটি সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারত ও তৎকালীন পূর্ববঙ্গকে প্রবলভাবে কাঁপিয়ে দেয়। সিলেট অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে এবং অসংখ্য স্থাপনা ধ্বংস হয়। ঢাকায় বহু সরকারি ভবন, আদালত ভবন, চার্চ ও ইটের তৈরি দালানে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়। তৎকালীন সংবাদপত্র ও প্রশাসনিক নথিতে উল্লেখ রয়েছে যে বহু মানুষ আতঙ্কে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছিল। এই ভূমিকম্প দেখিয়ে দিয়েছিল যে উপকেন্দ্র শত শত কিলোমিটার দূরে হলেও বাংলাদেশে তার প্রভাব মারাত্মক হতে পারে। বর্তমানের বহুতল ভবনঘেরা ঢাকা যদি একই মাত্রার কম্পনের মুখোমুখি হয়, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অতীতের তুলনায় বহুগুণ বেশি হতে পারে।

গত ১২ বছরে বাংলাদেশের ভূমিকম্পের পরিসংখ্যান: গত এক দশকে বাংলাদেশে শত শত ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। অনেক কম্পনের মাত্রা কম হওয়ায় সেগুলো জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলেনি, কিন্তু ভূতত্ত্ববিদরা সংখ্যার চেয়ে প্রবণতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। কারণ ঘন ঘন ছোট কম্পন সব সময় বড় বিপদ কমিয়ে দেয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা বৃহৎ ফল্টলাইনের আশপাশে চলমান ভূতাত্ত্বিক অস্থিরতার ইঙ্গিত বহন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিলেট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বারবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়া প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের আশপাশের ফল্ট সিস্টেমগুলো সক্রিয় রয়েছে। ফলে মূল প্রশ্ন ভূমিকম্প কতবার হচ্ছে তা নয়; বরং ভূগর্ভে কত পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে এবং তা কখন মুক্তি পেতে পারে।

ডাউকি ফল্ট বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভূতাত্ত্বিক উদ্বেগ: সিলেটের উত্তর সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত ডাউকি ফল্টকে বাংলাদেশের অন্যতম বিপজ্জনক ভূতাত্ত্বিক গঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ফল্টে দীর্ঘ সময় ধরে উল্লেখযোগ্য শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। অতীতে এই ফল্ট থেকেই একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে ডাউকি ফল্ট সক্রিয় হলে ৭.৫ থেকে ৮ মাত্রার কাছাকাছি ভূমিকম্প সৃষ্টি করার সক্ষমতা রয়েছে। সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকা এমনকি দেশের বৃহৎ অংশ এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প ঝুঁকি এই ফল্টকে কেন্দ্র করেই।

ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মেগাসিটিগুলোর একটি: ঢাকা আজ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ মহানগর। দুই কোটিরও বেশি মানুষের এই শহরে হাজার হাজার ভবন নির্মিত হয়েছে এমন সময়ে যখন ভূমিকম্প সহনশীল নকশার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অনেক ভবন অনুমোদিত নকশা ছাড়াই নির্মিত, আবার অনেক পুরোনো ভবনের কাঠামোগত শক্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরু রাস্তা, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও উন্মুক্ত স্থানের সংকট। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজ পরিচালনা করাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় বড় ভূমিকম্প হলে শুধু ভবন ধস নয়, বরং উদ্ধার ব্যর্থতার কারণেও প্রাণহানি বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।

যদি ৭.৫ বা ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়? বাংলাদেশে ৭.৫ বা ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হবে না; এটি জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। কয়েক সেকেন্ডের কম্পনে হাজার হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। গ্যাস লাইন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষতির কারণে অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়তে পারে। হাসপাতালগুলো নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হলে আহতদের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হলে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনঘনত্ব পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে একই মাত্রার ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অর্থনৈতিক ক্ষতি কত হতে পারে? বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে শিল্প, গার্মেন্টস, অবকাঠামো ও সেবাখাতনির্ভর। একটি বড় ভূমিকম্প মুহূর্তের মধ্যে এসব খাতকে অচল করে দিতে পারে। শিল্প কারখানা ধ্বংস, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ, বন্দর কার্যক্রম ব্যাহত এবং পরিবহন নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতীয় অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে ঢাকাকেন্দ্রিক একটি বড় ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কয়েক দশ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। উন্নয়নের জন্য কয়েক দশকে গড়ে তোলা অবকাঠামো কয়েক মিনিটেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ফলে ভূমিকম্প কেবল মানবিক নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও একটি বড় হুমকি।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাইরে বাংলাদেশের আরেক নীরব সংকট: বাংলাদেশে দুর্যোগ নিয়ে আলোচনা হলেই বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের কথা সামনে আসে। কিন্তু ভূমিকম্প এমন একটি দুর্যোগ যার কোনো মৌসুম নেই, পূর্বাভাস নেই এবং প্রস্তুতির সময়ও নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়, কিন্তু ভূমিকম্প কয়েক মিনিটের মধ্যে কয়েক দশকের উন্নয়ন ধ্বংস করে দিতে পারে। এ কারণে ভূমিকম্পকে শুধু একটি ভূতাত্ত্বিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচনা করা জরুরি।

রাষ্ট্র কি প্রস্তুত? গত কয়েক বছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলেও ভূমিকম্প মোকাবিলার ক্ষেত্রে এখনও বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। নগর পর্যায়ে নিয়মিত মহড়ার অভাব, উদ্ধার সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীর স্বল্পতা এবং বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের দুর্বলতা উদ্বেগজনক। অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেরই কার্যকর জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা নেই। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটলে বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
জাপান বনাম বাংলাদেশ: জাপান ও বাংলাদেশ উভয়ই ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ, কিন্তু প্রস্তুতির ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। জাপানে ভবন নির্মাণের প্রতিটি ধাপে কঠোর ভূমিকম্প সহনশীল মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। স্কুল থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত নিয়মিত মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। আধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ও প্রশিক্ষিত উদ্ধার অবকাঠামো দেশটিকে বড় ভূমিকম্পের পরও দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দিয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশে এখনও বিপুলসংখ্যক ভবন ঝুঁকিপূর্ণ এবং নাগরিক সচেতনতার ঘাটতি স্পষ্ট। ফলে যে ভূমিকম্প জাপানে সীমিত ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে, সেটিই বাংলাদেশে জাতীয় বিপর্যয়ে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রাখে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন; আমরা কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির অপেক্ষায়? ১৭৬২ সালের আরাকান মহাভূমিকম্প, ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প এবং ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প—ইতিহাসের এই ঘটনাগুলো আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। বাংলাদেশ ও তার আশপাশের ভূখণ্ড অতীতে বহুবার বড় ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রকৃতি কখনও ইতিহাস ভুলে যায় না; ভুলে যায় মানুষ। আজকের বাংলাদেশ অতীতের তুলনায় অনেক বেশি জনবহুল, নগরায়িত ও অবকাঠামোনির্ভর। তাই ভবিষ্যতের একটি বড় ভূমিকম্পের ক্ষতি অতীতের যেকোনো ঘটনার চেয়ে বেশি হতে পারে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি ইতিহাসের সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছি, নাকি পরবর্তী বিপর্যয়ের পর আবারও আফসোস করার জন্য অপেক্ষা করছি?

ইতিহাসের ভয়াবহতা: ১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল। বঙ্গোপসাগর ও আরাকান উপকূলজুড়ে আঘাত হানে প্রায় ৮.৫ মাত্রার এক মহাভূমিকম্প। চট্টগ্রাম উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা কয়েক মিটার উঁচু হয়ে যায়, কোথাও কোথাও ভূমি স্থায়ীভাবে নিচে নেমে যায়। নদীর গতিপথ বদলে যায়, অসংখ্য জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়। সে সময়ের সীমিত নথিপত্রও ইঙ্গিত দেয় যে এটি ছিল সমগ্র বঙ্গ অঞ্চলের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পগুলোর একটি। প্রকৃতি তখন যেন ঘোষণা দিয়েছিল বাংলার ভূখণ্ড শান্ত হলেও এর নিচের পৃথিবী মোটেও শান্ত নয়।

এরপর ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প (৮.১ মাত্রা), ১৯১৮ সালের শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প (৭.৬ মাত্রা), ১৯৩০ সালের ধুবড়ি ভূমিকম্প, ১৯৫০ সালের আসাম-তিব্বত ভূমিকম্প (৮.৬ মাত্রা) প্রতিটি কম্পন বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাঁপিয়েছে। ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশের চারপাশে গত আড়াই শতাব্দীতে ৭ মাত্রার বেশি অন্তত এক ডজন বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, আমাদের প্রধান ফল্টগুলোর কয়েকটিতে দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের শক্তি নির্গত হয়নি।
বর্তমান বাস্তবতা: এমন এক সময়েই ২০২৬ সালে আবার ঘন ঘন ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে। ১১ জুন ৪.৫ মাত্রার ভূমিকম্প, তার আগে আরও কয়েকটি মাঝারি কম্পন এসব হয়তো এককভাবে বিপজ্জনক নয়, কিন্তু এগুলো একটি বড় প্রশ্ন উত্থাপন করছে: বাংলাদেশের ভূগর্ভে কি নতুন করে চাপ সঞ্চিত হচ্ছে? আর যদি হয়, তাহলে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশটি কি প্রস্তুত?

গত ১২ বছরে বাংলাদেশের ভূমিকম্পের পরিসংখ্যান: গত এক দশকে বাংলাদেশে শত শত ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। অনেক কম্পনের মাত্রা কম হওয়ায় সেগুলো জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলেনি, কিন্তু ভূতত্ত্ববিদরা সংখ্যার চেয়ে প্রবণতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। কারণ ঘন ঘন ছোট কম্পন সব সময় বড় বিপদ কমিয়ে দেয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা বৃহৎ ফল্টলাইনের আশপাশে চলমান ভূতাত্ত্বিক অস্থিরতার ইঙ্গিত বহন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিলেট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বারবার ভূমিকম্প অনুভূত হওয়া প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের আশপাশের ফল্ট সিস্টেমগুলো সক্রিয় রয়েছে। ফলে মূল প্রশ্ন ভূমিকম্প কতবার হচ্ছে তা নয়; বরং ভূগর্ভে কত পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে এবং তা কখন মুক্তি পেতে পারে।

যদি ৭.৫ বা ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়? বাংলাদেশে ৭.৫ বা ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হবে না; এটি জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। কয়েক সেকেন্ডের কম্পনে হাজার হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। গ্যাস লাইন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষতির কারণে অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়তে পারে।হাসপাতালগুলো নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হলে আহতদের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হলে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হবে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনঘনত্ব পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে একই মাত্রার ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

অর্থনৈতিক ক্ষতি কত হতে পারে? বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে শিল্প, গার্মেন্টস, অবকাঠামো ও সেবাখাতনির্ভর। একটি বড় ভূমিকম্প মুহূর্তের মধ্যে এসব খাতকে অচল করে দিতে পারে। শিল্প কারখানা ধ্বংস, বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ, বন্দর কার্যক্রম ব্যাহত এবং পরিবহন নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাতীয় অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে ঢাকাকেন্দ্রিক একটি বড় ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কয়েক দশ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। উন্নয়নের জন্য কয়েক দশকে গড়ে তোলা অবকাঠামো কয়েক মিনিটেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ফলে ভূমিকম্প কেবল মানবিক নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও একটি বড় হুমকি।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাইরে বাংলাদেশের আরেক নীরব সংকট: বাংলাদেশে দুর্যোগ নিয়ে আলোচনা হলেই বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের কথা সামনে আসে। কিন্তু ভূমিকম্প এমন একটি দুর্যোগ যার কোনো মৌসুম নেই, পূর্বাভাস নেই এবং প্রস্তুতির সময়ও নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়, কিন্তু ভূমিকম্প কয়েক মিনিটের মধ্যে কয়েক দশকের উন্নয়ন ধ্বংস করে দিতে পারে। এ কারণে ভূমিকম্পকে শুধু একটি ভূতাত্ত্বিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচনা করা জরুরি।

উপসংহার: শবাংলাদেশের জন্য ভূমিকম্প কোনো ভবিষ্যৎ আশঙ্কা নয়; এটি একটি চলমান বাস্তবতা। ১৭৬২ সালের আরাকান মহাভূমিকম্প থেকে ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প পর্যন্ত ইতিহাসের প্রতিটি বড় কম্পন আমাদের একটি সত্য শিখিয়েছে প্রকৃতি কখনো পূর্বঘোষণা দিয়ে আসে না। আজকের ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেট সেই অতীতের তুলনায় বহুগুণ বেশি জনবহুল, বহুগুণ বেশি কংক্রিটনির্ভর এবং বহুগুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই প্রশ্নটি ভূমিকম্প হবে কি না, সেটি নয়; প্রশ্ন হলো, যখন হবে তখন বাংলাদেশ কতটা টিকে থাকতে পারবে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বড় ভূমিকম্পের ক্ষত সময় মুছে দিলেও শিক্ষা মুছে দেয় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই শিক্ষাগুলোই আমরা সবচেয়ে বেশি ভুলে যাই।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।