ড. মাহরুফ চৌধুরী


একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রভাণ্ডার, সুউচ্চ অবকাঠামো কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যে নিহিত নয়; বরং তার নাগরিকদের জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা ও দায়িত্ববোধের মধ্যে নিহিত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রাকৃতিক সম্পদে দরিদ্র হয়েও দুনিয়ার বহু দেশ শিক্ষাকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অন্যদিকে বিপুল সম্পদের অধিকারী অনেক রাষ্ট্রও শিক্ষার অবহেলা, দুর্বল মানবসম্পদ এবং সুশাসনের সংকটে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম স্বীকৃত সত্য হলো রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার মানুষ, আর সেই মানুষকে সম্পদে রূপান্তরিত করার প্রধান হাতিয়ারটিই হলো শিক্ষা।

যে রাষ্ট্র শিক্ষায় বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করে, সে মূলত নিজের নাগরিকদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেই সংকুচিত করে। পক্ষান্তরে যে রাষ্ট্র শিক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখে, সে রাষ্ট্র কেবল নিজের প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মশক্তিই গড়ে তোলে না; বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, আইনের শাসন এবং সুশাসনের একটি টেকসই ভিত্তিও নির্মাণ করে। মার্কিন অর্থনীতিবিদ গ্যারি বেকারের (১৯৩০-২০১৪) ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল থিওরি’ অনুযায়ী, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের মাধ্যমে মানুষের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পরিমন্ডলে জাতীয় আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। একইভাবে মার্কিন শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক জন ডিউই (১৮৫৯–১৯৫২) শিক্ষা সম্পর্কে বলেছিলেন, শিক্ষা কেবল জীবনের প্রস্তুতি নয়; শিক্ষা নিজেই জীবন। অর্থাৎ শিক্ষা এমন একটি সামাজিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি জাতি তার মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সঞ্চারিত করে।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায়, বিশেষত জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্রসংস্কারের গণ-আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষাপটে, রাষ্ট্রীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি আর কেবল কোনো খাতভিত্তিক দাবি নয়; এটি একটি কৌশলগত জাতীয় প্রয়োজন। কারণ রাষ্ট্রসংস্কার কেবল আইন, প্রতিষ্ঠান বা প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর জন্য প্রয়োজন এমন এক সচেতন, যুক্তিবাদী, নৈতিক ও দায়িত্বশীল নাগরিকসমাজ, যারা রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শ ও সাংবিধানিক চেতনাকে ধারণ করবে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা করবে। একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ নাগরিক সম্প্রদায়ে রূপান্তরিত করার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যমটিও কিন্তু শিক্ষা। শিক্ষা মানুষকে শুধু কর্মসংস্থানের উপযোগী করে না; বরং তাকে স্বাধীনচেতা, মানবিক, সহনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে, যা একটি আধুনিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। অতএব শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পূর্বশর্ত। যে রাষ্ট্র তার শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে, সে মূলত তার ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করে। আর যে রাষ্ট্র শিক্ষায় যথার্থ বিনিয়োগ করতে অবহেলা করে, সে অনিবার্যভাবে তার আগামী প্রজন্মের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে এবং জাতীয় উন্নয়নের পথকে দীর্ঘ ও অনিশ্চিত করে তোলে।

শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে ইউনেস্কোসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং নেতৃস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রগুলোকে শিক্ষাখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছে। তাদের সুস্পষ্ট সুপারিশ হলো, প্রতিটি রাষ্ট্রকে তার নাগরিকদের কল্যাণে শিক্ষাখাতে মোট দেশজ উৎপাদনের (তথা জিডিপি-র) অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ এবং মোট সরকারি ব্যয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বরাদ্দ করতে হবে। এই সুপারিশ কোনো আদর্শবাদী আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক গবেষণা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পর্কিত দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রণীত একটি বাস্তবসম্মত নীতিমালা। কারণ শিক্ষা এমন একটি খাত, যার সুফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে এবং জাতীয় উন্নয়নে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।

আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-চিন্তায় শিক্ষাকে কখনোই নিছক সরকারি ব্যয় হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক সংহতি এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গঠনের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন শিক্ষিত নাগরিক কেবল নিজের আয় বৃদ্ধির সুযোগই সৃষ্টি করেন না; তিনি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি গ্রহণ, উদ্ভাবন, সামাজিক সচেতনতা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মাধ্যমেও জাতীয় উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখেন। ফলে শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র বিভিন্নভাবে সকল স্তরে বহুগুণে প্রতিফলিত হয়। অর্থনীতির ভাষায় শিক্ষায় বিনিয়োগের একটি শক্তিশালী ‘বহুমাত্রিক প্রভাব’ (মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট) রয়েছে। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করে, স্বাস্থ্যসচেতনতা উন্নত করে, অপরাধপ্রবণতা হ্রাস করে, সামাজিক বৈষম্য কমায় এবং রাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ ব্যয়ের চাপ কমিয়ে আনে। একইসঙ্গে শিক্ষা মানুষকে কুসংস্কার, গুজব, সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদ ও রাজনৈতিক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী করে তোলে। ফলে একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তিই নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতারও অন্যতম প্রধান উৎস।

বিশ্বের যেসব দেশ শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছে, তাদের উন্নয়ন-ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা এবং সুশাসনের পেছনে শিক্ষায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে। এ কারণেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শিক্ষাকে টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং রাষ্ট্রগুলোকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; বরং এটি একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ। জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে রাষ্ট্রসংস্কার নিয়ে যে ব্যাপক জনআকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল লক্ষ্য হলো একটি জবাবদিহিমূলক, দক্ষ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, দলীয়করণ, প্রশাসনিক অদক্ষতা, বৈষম্য এবং জবাবদিহির সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জনগণ আজ রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার প্রত্যাশা করছে। কিন্তু রাষ্ট্রসংস্কারকে যদি কেবল আইন পরিবর্তন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস কিংবা সাংবিধানিক সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তবে তার কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা কঠিন হবে। কারণ রাষ্ট্র কোনো বিমূর্ত ধারণা বা কাঠামো নয়; রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, নীতি ও ব্যবস্থাকে পরিচালনা করে মানুষ, আর সেই মানুষকে গড়ে তোলে শিক্ষা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো প্রতিষ্ঠান যতই উন্নত হোক, সেগুলো পরিচালনাকারী ব্যক্তিদের নৈতিকতা, দক্ষতা ও দায়িত্ববোধ দুর্বল হলে প্রতিষ্ঠানও কার্যকর থাকে না। বিশ্বের বহু দেশে দেখা গেছে, একই ধরনের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও কোথাও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আবার কোথাও দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে। এর প্রধান কারণ মানুষের মানসিকতা, মূল্যবোধ এবং নাগরিক চেতনার পার্থক্য। অর্থাৎ রাষ্ট্রের গুণগত পরিবর্তনের পূর্বশর্ত হলো মানুষের গুণগত পরিবর্তন, আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম শিক্ষা। গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রীস্টপূর্ব) বহু আগে সতর্ক করেছিলেন যে, রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারিত হয় তার নাগরিকদের চরিত্র দ্বারা। একইভাবে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রতাত্ত্বিকরাও দেখিয়েছেন যে গণতন্ত্র, আইনের শাসন কিংবা জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে নাগরিকদের রাজনৈতিক সচেতনতা, নৈতিক বোধ, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি এবং রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক প্রক্রিয়ায় দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের ওপর। যে সমাজে শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রস্তুত করে, কিন্তু ন্যায়-অন্যায় বিচার, নাগরিক দায়িত্ববোধ কিংবা মানবিক মূল্যবোধের চর্চা শেখায় না, সেখানে রাষ্ট্রসংস্কারের উদ্যোগ বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি, যা একইসঙ্গে দক্ষ জনশক্তি, সচেতন নাগরিক এবং নৈতিক নেতৃত্ব তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। ফলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে দক্ষতার ঘাটতি, নৈতিক অবক্ষয়, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দায়িত্বহীনতার যে সংস্কৃতি দৃশ্যমান, তার শেকড় অনেকাংশেই শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বাস্তবতায় শিক্ষাসংস্কারকে রাষ্ট্রসংস্কারের পরিপূরক নয়, বরং তার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অতএব একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে শিক্ষাকে জাতীয় সংস্কার কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিতে হবে। কারণ যে শিক্ষা মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, দায়িত্ব নিতে শেখায়, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায় এবং দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলে, সেই শিক্ষাই রাষ্ট্রসংস্কারের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। শিক্ষাসংস্কার ছাড়া রাষ্ট্রসংস্কারের স্বপ্ন তাই শেষ পর্যন্ত অপূর্ণই থেকে যাবে।

একটি উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা কেবল জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি নাগরিক চরিত্র গঠন, সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার অন্যতম প্রধান উপায়। শিক্ষা মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা, মানবিকতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তোলে। একটি রাষ্ট্রের নাগরিকরা যখন তাদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হয়, ভিন্নমতকে সম্মান করতে শেখে এবং আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তখন সেই সমাজে স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের ভিত্তি শক্তিশালী হয়। তাই শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির পথ নয়; এটি একটি সুসংহত ও শান্তিপূর্ণ সমাজ নির্মাণেরও প্রধান হাতিয়ার। সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সামাজিকীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন। পরিবার যেখানে শিশুর প্রাথমিক মূল্যবোধের ভিত্তি তৈরি করে, সেখানে বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সেই মূল্যবোধকে বিস্তৃত সামাজিক ও জাতীয় পরিসরে বিকশিত করে। শিক্ষার মাধ্যমেই একজন ব্যক্তি উপলব্ধি করতে শেখে যে রাষ্ট্র, সমাজ এবং জাতির কল্যাণ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। ফলে শিক্ষা নাগরিকদের মধ্যে এমন এক সামাজিক চেতনা সৃষ্টি করে, যা ব্যক্তি-স্বার্থের সংকীর্ণতা অতিক্রম করে বৃহত্তর জনকল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতা গড়ে তোলে।

বর্তমান বিশ্বে বিভাজন, গুজব, অপরায়ন ও ঘৃণার রাজনীতি, ধর্মীয় ও সামাজিক উগ্রবাদ, সহিংসতা এবং অসহিষ্ণুতা বহু দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের ফলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল তথ্য ও অপপ্রচার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতায় সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা এবং যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য মানসম্মত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। যে জনগোষ্ঠী শিক্ষিত, সচেতন এবং তথ্য-সাক্ষর, তারা সহজে গুজব, উসকানি বা বিভ্রান্তির শিকার হয় না; বরং সত্য-মিথ্যা যাচাই করে দায়িত্বশীল আচরণ করতে সক্ষম হয়। এ কারণেই মানসম্মত শিক্ষা বিভাজন, গুজব, সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধক হিসেবে বিবেচিত হয়। একই সঙ্গে শিক্ষা জাতীয় পরিচয় ও ঐক্যের বোধও শক্তিশালী করে। ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, অঞ্চল কিংবা মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একটি জাতির সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান এবং অভিন্ন নাগরিক পরিচয়ের চেতনা গড়ে তুলতে শিক্ষার ভূমিকা অপরিসীম। একটি দায়িত্বশীল শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে শেখায় যে বৈচিত্র্য কোনো দুর্বলতা নয়; বরং এটি একটি জাতির শক্তি। ফলে শিক্ষা সমাজে বিভেদ নয়, বরং সংহতি ও সহযোগিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি একতাবদ্ধ, সচেতন, মানবিক ও দক্ষ নাগরিকসমাজ গঠন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান প্রয়োজন। রাষ্ট্রসংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতিটি লক্ষ্য অর্জনের পূর্বশর্ত হলো এমন নাগরিক তৈরি করা, যারা জ্ঞান, দক্ষতা ও নৈতিকতার সমন্বয়ে দেশ পরিচালনা ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি কোনো ঐচ্ছিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার অপরিহার্য শর্ত। পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রসংস্কারের প্রকৃত অর্থ কেবল নতুন আইন, নতুন প্রতিষ্ঠান কিংবা নতুন প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণ নয়; বরং এমন এক নাগরিকসমাজ গড়ে তোলা, যারা জ্ঞান, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ। আর সেই নাগরিকসমাজ গঠনের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো শিক্ষা। তাই জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের গণআকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষাকে রাষ্ট্রসংস্কারের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং জাতীয় বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো সময়ের দাবি।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।