রিয়াজুল রিয়াজ, বিশেষ প্রতিনিধি : ফরিদপুর-মাগুরা মহাসড়কের পাশে  তেঁতুলতলা নামক স্থানে দুর্বৃত্তদের দখল করে ভরাট করা জমি, একাধিক দপ্তরের হলেও সরকারের কোনো দপ্তর থেকে লিজ বা ইজারা নেন নাই। একাধিক দপ্তরের লিজের নামে যা বলেছেন সবই ছিলো তাদের পরিকল্পিত ভেল্কিবাজি, সময়ক্ষেপণ বা নির্লজ্জ মিথ্যাচার। কোনো প্রকার কাগজপত্র না দেখিয়ে সড়ক বিভাগ, জেলা পরিষদ সহ সরকারের একাধিক দপ্তরের জায়গা 'লিজ' নেওয়ার গালগল্প শুনিয়ে এসেছেন, শুধুমাত্র তাদের অবৈধভাবে দখল করা সরকারি জমি হজম বা হালাল করার অপচেষ্টা করেন তারা। এ দূর্বৃত্ত চক্রের বড় গলায় বলা 'লিজ' তত্ত্বের আসল তথ্য বের করতে গিয়ে উপরোক্ত বিষয়টি স্পট হয়ে যায়। ভূমি খেকোদের এসব মিথ্যাচার প্রথম ধরা পড়ে লিজের কাগজপত্র দেখাতে বারবার অনিহা প্রকাশ, লুকোচুরি ও সময় ক্ষেপনের মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, তাদের কথার সূত্র ধরে প্রথমে সড়ক বিভাগ পরিস্কার করে জানায়, এ অবৈধ দখলবাজদের নিকট সওজ এক ইঞ্চি জমিও লিজ দেয়নি। বরং সওজে জমিতে তারা অনুমতি ছাড়া অবৈধভাবে মাটি ফেলে ভরাট করেছেন, বাধা ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে একাধিক ইমারত তৈরির মাধ্যমে মার্কেট দুইটি নির্মাণ করা হয়েছে। যার কিছু জায়গা নিজেদের দাবি করেন, বাকী জায়গা সরকারের থেকে লিজ না নিয়ে করেছেন বলে দাবি করেছেন। এ বিষয়ে অনুসন্ধান প্রতিবেদনের ১ম পর্বে যার কয়েকটির বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় মিথ্যাচারটি দূর্বৃত্তরা করেন জেলা পরিষদের কিছু জায়গা ৯৯ বছরের জন্য 'লিজ' নিয়েছেন-এমন কথা বলে। করণ, জেলা পরিষদের জায়গা বা সম্পত্তি ইজারা বা লিজ নেওয়ার প্রধান শর্ত হচ্ছে- সম্পত্তিটি স্থায়ীভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া যাবে না, সর্বোচ্চ ১ বছরের জন্য নবায়নযোগ্য চুক্তিতে লিজ দেওয়া হয়ে থাকে। এছাড়া লিজ নেওয়া জমিতে কোনো প্রকার পাকা বা স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা সম্পূর্ণ নিষেধ। পাকা মার্কেট করার তে প্রশ্নই উঠে না। আর, জেলা পরিষদের জায়গার লিজের শর্ত ভঙ্গ করলে ইজারা বা লিজ অটোমেটিকালি বাতিল হয়ে যায়, জমিতে থাকা অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হতে পারে এবং জামানতের টাকা সরকারি কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করা হয়, এছাড়া শর্ত লঙ্ঘনের কারণে ক্ষতিপূরণ আদায়সহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণেরও বিধানও রয়েছে। যা, জেলা পরিষদের সম্পত্তি (অর্জন, ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ ও হস্তান্তর) সরকারি বিধিমালা, ২০১৭' এবং 'জেলা পরিষদ আইন, ২০০০' তে স্পষ্ট বর্ণনা করা আছে।

এদিকে, যে জায়গাকে তারা জেলা পরিষদের জায়গা বলে লিজ নেওয়ার কথা বলেছেন- ওই জায়গাটি জেলা পরিষদের কিনা তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. আফজাল হোসেন খান পলাশ।

এর আগে, এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা (সিনিয়র সহকারী সচিব) বেগম সানজিদা সুলতানা এ বিষয়টি তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশনা দিয়ে দূর্বৃত্তদের দাবিকৃত ইজারা বা লিজের তথ্য যাচাইয়ে জেলা পরিষদের জায়গা ও ইজারা লিস্টের নথিপত্র যাচাই করেন। কিন্তু হামজা শেখ গংদের কারোর নামে 'লিজ'-এর কোনো তথ্য খুঁজে পায়নি জেলা পরিষদ প্রশাসন। এমনকি তেঁতুলতলায় যে জায়গাটি ইজারা নিয়েছেন বলে দাবি করেন জেলা পরিষদের জায়গার লিস্টেও ওই জায়গার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় নাই।

এমন পরিস্থিতিতে ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. আফজাল হোসেন পলাশ উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, 'যারা দাবি করেছেন ইজারা/লিজ নিয়েছেন তারা হয়তো মিথ্যাচার করেছেন। আমরা ওইখানে আমাদের কোনো জমির অস্তিত্ব খুঁজে পাই নাই। দাবিকৃত লোকদের থেকে জেলা পরিষদের 'লিজ' দেওয়ার যে কোনো একটি কাগজ সংগ্রহের পরামর্শ দেন প্রশাসক। কাগজ সংগ্রহ করতে পারলে আইনিভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেও জানান জেলা পরিষদ প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশ।

মজার বিষয় হলো এ দূর্বৃত্তরা যখন সড়কের জায়গা দখল করে মাটি ভরাট করে বিল্ডিং করছিলেন, তখনও সওজ থেকে লিজ নেওয়ার দাবি জানালে জেলা পরিষদ প্রশাসক আফজাল হোসেন খান পলাশের ন্যায় একই কথা বলেছিলেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার। তিনিও একটি কাগজ দাবি করছিলেন। কিন্তু দূর্বৃত্তরা সেটাও দিতে পারেনি।

এ জায়গাটি মাটি ভরাটের পূর্বে মূলত মানুষের চলাচলের জন্য সরকারি ছোটরাস্তা বা হালট বিশিষ্ট ছিলো; যা হামজা শেখ গংরা দখলে নিয়ে তাদের লিজকৃত জমি হিসেবে মানুষের মধ্যে মিথ্যা প্রচারণা চালান শুধু দখলের সুবিধার্থে।

এখানে এক দাগে সড়ক বিভাগের ৩১ শতাংশ অধিগ্রহণকৃত জমি রয়েছে। যার সবটুকুও ভরাট করে দখল করে ফেলেছেন হামজা শেখ গংরা। নীচু পুকুর বা খাল বিশিষ্ট জায়গায় মাটি দিয়ে ভরাট নিজেদের করে নিয়েছেন হামজা শেখ-উজ্জল শেখ-লিটন সাহা-জসিম ব্যাপারি এন্ড গং নামক এ সংঘবদ্ধ দূর্বৃত্ত চক্রটি। সওজের জায়গার মতো এ সরকারি হালটের জায়গা (তেঁতুলতলা-শমেসপুর সরকারি রাস্তার হওয়ার পরের বাকী অংশ) ভরাটের ক্ষেত্রেও যথারীতি নেওয়া হয়নি সংশ্লিষ্ট দপ্তর তথা সরকারি অনুমতি।

এ অবৈধ দখলদার দূর্বৃত্ত চক্রটি রাষ্ট্রের কমপক্ষে চারটি স্থানীয় দপ্তরকে ঘোল খাইয়ে, একের পর এক নির্লজ্জ মিথ্যাচার করে সরকারি জমিগুলো অবৈধ দখল করে ভোগ করে চলেছেন। আশ্বাস দিলেও এদের শায়েস্তা করতে ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করছে স্থানীয় দপ্তর ও জেলা প্রশাসন।

আজ বুধবার সকালে এ রিপোর্ট লেখা সময় পুর্বের হালটটি কিছু অংশ জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) বা এসিল্যান্ড থেকে অধিগ্রহণের কথা জানান তারা। তবে, যথারীতি কাগজ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন এবারও।

সব দপ্তর যেহেতু যাচাই করা হয়ে গেছে, এ বিষয়টিও যাচাই করতে ফরিদপুর জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (ভূমি অধিগ্রহণ শাখা, জেনারেল সার্টিফিকেট শাখা) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিট্রেট মো. আতিকুর রহমানকে ফোন করলে তিনি উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, 'ওইখানে শুধু সড়ক বিভাগের বেশকিছু অধিগ্রহণ করা আছে বলে জানি, আর ওই জমির সাথে কিছু সরকারি খাস জমি থাকলেও সেটি কাউকে লিজ দেওয়া হয়েছে কিনা জানিনা। এসিল্যান্ড হয়তো জানতে পারেন'।

এ বিষয়ে ফরিদপুর সদর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. শফিকুল ইসলাম উত্তরাধিকার ৭১ নিউজকে জানান, সড়ক বিভাগের জমি বাদে ওইখানে কিছু খাস জমি থাকতে পারে, তবে সেটি লিজ দেওয়া হয়নি। তারপরও আমি স্থানীয় তসিলদারকে পাঠাচ্ছি, খোঁজ নিয়ে জানাচ্ছি'।

দূর্বৃত্তরা প্রত্যেকটা দাবি যাচাই বাছাই করে দেখা গেছে, তারা শুধুই 'লিজ' এর মিথ্যাচার করেছেন এবং নিজে সামান্য জায়গা কিনে আশেপাশের সব সরকারি জায়গা তিনি নিজের মনে করে নিয়ে ভরাট করে দখলে নিয়েছেন।

স্থানীয়দের আশা, সড়ক বিভাগের জায়গা সহ দুর্বৃত্তদের দখল করা সব সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করুক সরকার এবং তাদের তৈরি অবৈধ ইমারত ও মার্কেট ভেঙে দেওয়া হোক। এছাড়া, প্রশাসনে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের বারবার বাধা ও নিষেধাজ্ঞা অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল কারার দায়ে হামজা শেখ, উজ্জল শেখ, লিটন সাহা, জসিম ব্যাপারি ও হামজার শ্বশুর সহ দখলবাজ এ বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

প্রশাসন এটির প্রতি দৃষ্টি না দিলে শুধুমাত্র ওই অঞ্চলে সড়ক বিভাগের জন্য জেলা প্রশাসনের অধিগ্রহণকৃত ১৭/ ১৯৮৮-১৯৮৯ এলএ কেসের মোট ১৬টি দাগে সর্বমোট ৩.১৫ একর অধিগ্রহণকৃত জমির পতিত পড়ে থাকা জমি সহ সকল দপ্তরের সরকারি খাস জমি এভাবেই আস্তে আস্তে চলে যেতে পারে এই সংঘবদ্ধ দূর্বৃত্তদের পেটে।

এছাড়া, ওই অঞ্চলের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা উপরোক্ত ব্যক্তিদের দখলকৃত জমি, নির্মাণ করা ভবন ও সম্পদের তদন্ত করলে নতুন নতুন রহস্য উন্মোচন পেতে পারেন স্থানীয় প্রশাসন ও দূদক এ কথা জোর গলায় দাবি করেছেন ভুক্তভোগী স্থানীয়রা।

কিন্তু এ বিষয়ে উত্তরাধিকার ৭১ নিউজে ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রকাশ এবং বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সাংবাদিকদের লেখালেখির পরেও রাষ্ট্র স্বার্থ রক্ষায় এখনো কোনো দৃশ্যমান প্রদক্ষেপ গ্রহণ স্থানীয় প্রশাসন। তবে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মাজহারুল ইসলাম, সড়ক বিভাগ ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদার, ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম সহ সবাই এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন। এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নজরদারিতে রেখে ছায়া তদন্তে নেমেছেন জেলায় কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাও।

(আরআর/এসপি/জুন ১৭, ২০২৬)