ষ্টেডিয়ামে বসে বিশ্বকাপ খেলা দেখার মজাই আলাদা
শিতাংশু গুহ
‘খেলা শেষ, পয়সা উসুল’। বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬। ব্রাজিল-মরক্কো খেলা, শনিবার ১৩ই জুন ২০২৬, নিউজার্সির মেটলাইফ ষ্টেডিয়ামে। আমাদের আসন সেকশন ৩২৪, গেট ১/২, রো ৬, সিট্ ৯/১০, সাংবাদিক মোহাম্মদ কাশেম ও আমি। কাসেম গতবছর নভেম্বরে টিকিট কিনেছে, আমি সঙ্গী। আমাদের বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখা এই প্রথম, মেটলাইফ ষ্টেডিয়ামেও প্রথমবার খেলা দেখা। ব্রাজিল ৫ বার বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ান, সমর্থকে ঠাসা স্টেডিয়াম। পুরো মাঠ হলুদ, মাঝেমধ্যে লাল, হলুদ ব্রাজিল, মরক্কো লাল। মরক্কো গত বিশ্বকাপে ভাল খেলেছে, সেমী-ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে বাদ পড়েছে। এদিন খেলায় প্রথম দিকে মরক্কো ভালই শুরু করে, ২৪ মিনিটে প্রথম গোল। ৩১ মিনিটে ব্রাজিল চমৎকার একটি গোল দেয়. খেলা ১-১।
দ্বিতয়ার্ধে ব্রাজিল প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে, গোল দিতে ব্যর্থ হয়। খেলা পরিচ্ছন্ন ছিলো, তবে শ্লো, আমার কাছে মনে হয়েছে প্র্যাকটিস ম্যাচ। নেইমার মাঠে নামেনি। খেলার বিশ্লেষণ ইন্টারনেটে আছে, সেদিকে যাচ্ছিনা, শুধু বলে রাখি, এভাবে খেললে ব্রাজিল ‘সুপার এইটে’ পৌঁছতে পারবে না? আমি ব্রাজিল বা মরক্কোর ফ্যান নই, আমি মাঠে যাই বিশ্বকাপের অংশীদার হতে! কথায় বলে, ‘ওয়ান্স ইন এ লাইফ টাইম’ ইভেন্ট? কাশেম মাঝারি সাইজের একটি বাংলাদেশের পতাকা সাথে নিয়েছিলো, ড্রোন-ক্যামেরা আমাদের দিকে আসলেই কাশেম দাঁড়িয়ে পতাকা ওড়াতে সচেষ্ট হয়, ক’বার আমরা দু’জেনে ধরে দাঁড়িয়েছি, যদি ‘লাইগ্যা’ যায়? সিলেটের সঞ্জয় দেব বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে তুলে ধরেছে, আমরাও চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশি চোখে পড়েনি, এক দম্পত্তি ও বিক্ষিপ্ত ২/১ জন। মাঠ কানায় কানায় হাউসফুল ছিলো, স্ক্রিনে দেখলাম মোট ৮০,৬৬৩ জন।
এতবড় একটি আয়োজন কোন অঘটন ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। আমাদের সিট্ বেশ ওপরে ছিলো, অনেকে দূরবীন নেয়ার পরামর্শ দেয়, আসলে সবকিছু স্পষ্ট ছিলো, সম্ভবত: ষ্টেডিয়াম এমনভাবে তৈরী হয়েছে যেন সবাই যে যার আসন থেকে স্পষ্ট দেখতে পায়? আমরা যেখানে বসেছি সেখানে প্রায় সবাই ব্রাজিল, কিছু লাল ছিলো। এ এক মজার ব্যাপার পাশাপাশি বসে লাল-হলুদ খেলা দেখছে, যার দল এগিয়ে যাচ্ছে তারা চিল্লাচ্ছে, কেউ কাউকে মারতে উদ্যত হচ্ছেনা। সব হলুদ দেখে কাশেম ব্রাজিল হয়ে যায়, দু’একবার হৈহৈ করে ওঠে। এদেখে আমাদের ওপরের সিটের এক মহিলা কাশেমকে একটি ব্রাজিলীয় হলুদ স্কার্ফ দেয়, কাশেম তখন পুরোপুরি ব্রাজিলীয়। পরে কাশেম স্কার্ফ ফেরত দিতে চাইলে মহিলা বলেন, ফেরত দিতে হবেনা, ওটা তোমার। যদিও খেলা শেষে কাশেম সেটি জোর করে ফেরত দেয়।
আমরা মেয়রের দেয়া শাটলে যাই। সে এক এলাহী ব্যাপার। গাড়ী ম্যানহাটনের এক গ্যারেজে রেখে আমরা মাইল খানেক লম্বা লাইনের পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ি। লাইন দ্রুত এগুচ্ছিলো, আমরা ৪০মিনিটে বাসে উঠে পড়ি, চমৎকার সার্ভিস। স্কুলবাস। কিছুটা ট্রাফিক থাকা সত্বেও ৪৫মিনিটে আমরা মেটলাইফ ষ্টেডিয়ামে পৌঁছে যাই, নেমে পড়ি, সময় তখন সাড়ে ৪টা। সর্বত্র লোকে-লোকারণ্য। সবাই হাটছে, কেউ কেউ বিভিন্ন ষ্টলে দাঁড়াচ্ছে। অনেকটা হাটতে হবে, সবাই হাটছে, খেলা ৬টায়। প্রচন্ড ভীড় , তবে সুশৃঙ্খল, ভীড় ঠেলে সীটে পৌঁছে যাই, এরমধ্যে ১ঘন্টা পেরিয়ে যায়। আবার বেরিয়ে যাই, খাওয়ার ষ্টলগুলোতে প্রচন্ড ভীড় ও লাইন। অপেক্ষাকৃত কম লাইনে দাঁড়িয়ে ২টি জলের বোতল, ১টি বিয়ার, একটি সল্টেড বাদাম কিনি, প্রতিটি ১০ডলার, প্লাস ট্যাক্স ও টিপস।
সেদিন তাপমাত্রা ছিলো ৯০’ ফারেনহাইট্সের কাছাকাছি। শাটলে ওঠার লাইন থেকে শুরু করে খোলা আকাশের নীচে রোষ্ট হয়ে খেলা দেখা একেবারে মন্দ নয়! আদ্রতা কম থাকায় কিছুটা রক্ষা, পড়ন্ত বিকালে মৃদুমন্দ হাওয়ায় মাথার ঘাম পায়ে পড়েনি। এ অবস্থায় হাইড্রেটেড থাকতে হয়, বেশি করে জল বা অন্য পানীয় পান করতে হয়। সমস্যা আরো আছে, বেশি জল খেলে ঘনঘন প্রস্রাব চাপলে বাথরুমে যেতে হয়। যথেষ্ট টয়লেট ছিলো, তবু বলা তো যায়না, এদেশে যত্রতত্র দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করা অপরাধ। খেলা শেষ হয় ৮:০৫ মিনিটে। ঝামেলা শুরু এরপর। স্টেডিয়ামশুদ্ধ মানুষ একসাথে নামতে শুরু করে, চারিদিকে হলুদের সমারোহ, মাঝেমধ্যে লাল, জনতার কাফেলা বেশ উপভোগ্য ছিলো। বেরিয়ে খোলা আকাশে আসতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। এবার ফেরার পালা, বাস অনেকটা দূর, হাঁটা শুরু।
বাসে উঠতে বিশাল লাইন, উপায় নাই গোলাম হোসেন, লাইন ছাড়া চলেনা বাসগাড়ি। বাসে উঠলাম ১০:১৫মিনিট। স্বস্তি, এবার ঘরে ফেরা। বাস ছাড়লো, ভালোই চলছিলো। টানেলে এসে জ্যামে পড়লো বাস। তখনো কেউ কিছু বুঝিনি। ধীরলয়ে বাস টানেল পার হলো, এরপর ১০ এভ্যুনিউ, কোনমতে ৯ এভ্যুনিউ পর্যন্ত বাস এসে থমকে গেলো, সামনে যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ। রাত তখন ১১:৩০ মিনিট। কি ব্যাপার? নিক্স এনবিএ চ্যাম্পিয়ান হয়েছে, নিক্স সমর্থকরা উল্লাস করছে, পুরো নিউইয়র্ক সিটি ম্যানহাটনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বাস থেকে নেমে আমরা হাটতে শুরু করলাম। ৪২ ষ্ট্রীট ধরে ৯ থেকে ৩ এভ্যুনিউ পর্যন্ত লম্বা হাঁটা। অসম্ভব ভীড়, গায়ে গায়ে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে যেতে হলো, লেকক্সিটন এসে হালকা হলাম। আমাদের গাড়ী ছিলো ৩য় এভ্যুনিউতে।
আমরা তখন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, ক্ষুধার্ত। রাত ১২:৪০ মিনিট। একটি খাবার দোকান খোলা পেলাম। ঢুকলাম। ভেজিটেবল স্যান্ডুইচ ও জিনযারেল খেলাম, হাত-মুখ ধুয়ে পরিচ্ছন্ন হয়ে ফ্রেস হলাম। গ্যারেজ সামনেই, এতরাতে লোক পেতে সামান্য সময় নিলো, গাড়ীতে উঠলাম, ঘড়িতে ১টা পার হয়ে গেছে। গাড়ীর ঠান্ডায় বসে দু’জনে আলোচনা করছিলাম, এই বয়সে খেলা দেখতে যাওয়াটা বেশ রিস্কের, আর যাবোনা। সত্যিই তো, খেলার মাঠে দর্শক প্রায় সবাই তো ইয়ং, সিনিয়র সিটিজেন তেমন একটা চোঁখে পড়েনি, কশ্চিৎ দু’একজন। ভাবলাম, ‘এখন যৌবন যার, বিশ্বকাপ খেলা দেখার সময় তাঁর’। এতকিছুর পরও বলা যায়, ষ্টেডিয়ামে বসে বিশ্বকাপ খেলা দেখার আনন্দই আলাদা, টিকিট পেলে হয়তো আবারো যাবো।
লেখক : আমেরিকা প্রবাসী।
