আল আমিন


একটি ঘর সাধারণত নিরাপত্তার প্রতীক। কিন্তু সেই ঘরই যখন কারও জন্য নির্যাতনের জায়গায় পরিণত হয়, তখন প্রশ্ন শুধু একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—প্রশ্ন উঠে আমাদের মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ক্ষমতার ব্যবহারের ধরন নিয়ে।

খুলনার সোনাডাঙ্গায় এক কিশোরী গৃহকর্মীকে গরম কড়াই দিয়ে ছ্যাঁকা ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে পুলিশের দুই সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে—এটাই আইনের পথ। তবে ঘটনার বিবরণ যে কোনো বিবেকবান মানুষকে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো।

অভিযোগ রয়েছে, সামান্য একটি ভুল—হাত থেকে তরকারি পড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হয় নির্যাতন। গরম কড়াইয়ের ছ্যাঁকা, শারীরিক আঘাত, অপমান—এসব কেবল শাস্তি নয়, এগুলো মানুষকে মানুষ হিসেবে অস্বীকার করার ভয়ংকর প্রকাশ।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। আইন প্রয়োগের দায়িত্ব যাঁদের হাতে, তাঁদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের আস্থার জায়গায় আঘাত করে। কারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন শুধু ইউনিফর্মে সীমাবদ্ধ নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আচরণ, নৈতিকতা এবং মানবিকতা।

গৃহকর্মীরা আমাদের সমাজের সবচেয়ে অরক্ষিত শ্রমজীবী মানুষের একটি বড় অংশ। তাঁদের কাজের সময় নির্দিষ্ট থাকে না, অনেকের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত হয় না, আবার অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের ঘটনাও নীরবে থেকে যায়। কারণ অভিযোগ করার সাহস, সুযোগ কিংবা সামাজিক অবস্থান—সবকিছুই সীমিত।

এই ঘটনায় স্থানীয়দের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। প্রতিবেশীরা নীরব থাকেননি, খবর দিয়েছেন, উদ্ধার কার্যক্রমে ভূমিকা রেখেছেন। সমাজ তখনই সুস্থ থাকে, যখন অন্যায়ের সামনে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয় না।

তবে এখানেই শেষ নয়। একটি মামলা হয়েছে মানেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং এমন একটি বার্তা প্রতিষ্ঠা করা—যেখানে পরিচয়, পদমর্যাদা কিংবা পেশা নয়; আইনের কাছে সবার অবস্থান সমান।

আমরা প্রায়ই বলি, শিশু ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু নিরাপত্তা শুধু রাস্তায় নয়—ঘরের ভেতরেও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অনেক সময় সবচেয়ে বড় নির্যাতন ঘটে চার দেয়ালের আড়ালে।

একটি সভ্য সমাজের শক্তি বোঝা যায় দুর্বল মানুষের প্রতি তার আচরণে। খুলনার এই ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল—ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না, মানুষকে বড় করে তার মানবিকতা।

লেখক : প্রকাশক ও সম্পাদক-সে অলওয়েজ ট্রুথ।