যেখানে রাজনীতি স্বার্থের দাস, সেখানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু
একটি রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা নির্ভর করে তার রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততা, দূরদর্শিতা ও জনকল্যাণমুখী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। রাজনীতি যখন জনগণের সেবা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে পরিচালিত হয়, তখন রাষ্ট্র এগিয়ে যায় স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও মানবিক অগ্রগতির পথে। কিন্তু রাজনীতি যখন ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং গোষ্ঠীগত আধিপত্যের উপকরণে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্রীয় কাঠামো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের বিস্তার ঘটে।
বর্তমান বিশ্বে এমন বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। বহু দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও অনিয়মের বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর ফলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হয়, আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আস্থা হারাতে শুরু করে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই পরিবেশে সৎ, দক্ষ ও নীতিবান ব্যক্তিরা রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান। ফলে রাজনৈতিক পরিসরে সৃষ্টি হয় এক ধরনের শূন্যতা, যা পূরণ করে ক্ষমতালোভী ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী।
ইতিহাস ও সমসাময়িক বিশ্ব এ ধরনের বাস্তবতার বহু উদাহরণ বহন করে। সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও নাইজেরিয়া ও ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি ও দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। হাইতির মতো দেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্থিতিশীল উন্নয়ন আজও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—স্বার্থনির্ভর রাজনীতি রাষ্ট্রের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে এবং উন্নয়নের সম্ভাবনাকে ক্ষয় করে।
অন্যদিকে, বিশ্বে এমন রাষ্ট্রও রয়েছে, যারা প্রমাণ করেছে যে নৈতিক, দক্ষ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব একটি জাতির ভাগ্য বদলে দিতে পারে। সিঙ্গাপুরে লি কুয়ান ইউ-এর নেতৃত্বে কঠোর জবাবদিহিতা, সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের মাধ্যমে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রুয়ান্ডা ভয়াবহ গণহত্যার ক্ষত বয়ে নিয়েও রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া শিক্ষা, প্রযুক্তি ও পরিকল্পিত রাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে উন্নত অর্থনীতির কাতারে উঠে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে নেলসন ম্যান্ডেলার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২৭ বছরের দীর্ঘ কারাবাস শেষে তিনি প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বরং পুনর্মিলন, সহনশীলতা ও জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি বেছে নিয়েছিলেন। তার দূরদর্শী নেতৃত্ব দক্ষিণ আফ্রিকাকে সম্ভাব্য গৃহসংঘাত থেকে রক্ষা করে গণতন্ত্র ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথে এগিয়ে নেয়। ম্যান্ডেলার জীবন আমাদের শেখায়, প্রকৃত নেতৃত্ব ক্ষমতার প্রদর্শনে নয়, বরং জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার সক্ষমতায় নিহিত।
বিশ্বের এই বিপরীত অভিজ্ঞতাগুলো একটি মৌলিক সত্য প্রতিষ্ঠা করে—রাষ্ট্রের উত্থান কিংবা পতন অনেকাংশেই নির্ভর করে তার রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরিত্র ও দর্শনের ওপর। যখন রাজনীতি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ব্যক্তিস্বার্থের দাসে পরিণত হয়, তখন আইনশৃঙ্খলা দুর্বল হয়, প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকারিতা হারায় এবং জনগণের মধ্যে হতাশা ও অনাস্থা জন্ম নেয়। বিপরীতে, যখন রাজনীতি নৈতিকতা, জবাবদিহিতা ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তখন রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়, অর্থনীতি বিকশিত হয় এবং নাগরিকদের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য এ শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে অর্জিত হয় না; এর জন্য প্রয়োজন সুশাসন, নৈতিক নেতৃত্ব এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। রাজনীতিকে যদি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের ঊর্ধ্বে তুলে জাতীয় স্বার্থের ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা না যায়, তবে উন্নয়নের অর্জনও দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
অতএব, সময়ের দাবি হলো রাজনীতিকে তার মূল আদর্শে ফিরিয়ে আনা। এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নেতৃত্ব হবে সেবার প্রতীক, ক্ষমতার নয়; যেখানে রাষ্ট্র হবে জনগণের আস্থার আশ্রয়স্থল, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন ক্ষেত্র নয়। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় নৈতিক নেতৃত্বের ভিত্তির ওপর, আর ধ্বংস ডেকে আনে স্বার্থনির্ভর রাজনীতি।
লেখক : একজন কবি।
