আবদুল হামিদ মাহবুব


রাজনীতিতে ক্ষমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু ক্ষমতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তার ব্যবহার। একজন জনপ্রতিনিধি কতটা ক্ষমতাবান, সেটি বড় কথা নয়। তিনি সেই ক্ষমতা কীভাবে কাজে লাগাচ্ছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে মূল্যায়নের বিষয় হয়ে ওঠে।

এক সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম একজন “পাওয়ারফুল” প্রতিমন্ত্রী। তখন অনেকেই হয়তো মন্তব্যটির গভীরতা বুঝতে পারেননি। সাধারণ ধারণা হলো, একজন প্রতিমন্ত্রী পূর্ণ মন্ত্রীর চেয়ে কম ক্ষমতাসম্পন্ন হবেন। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে অনেক সময় পদ নয়, ব্যক্তিগত প্রভাবই বড় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কোনো কোনো প্রতিমন্ত্রীও অনেক মন্ত্রীর চেয়ে বেশি আলোচিত ও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারেন।

সম্প্রতি মীর শাহে আলমকে ঘিরে নানা আলোচনা সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। তার দুই সন্তানের নামে দুটি ইউনিয়নের নামকরণের অভিযোগ সংসদ পর্যন্ত গড়িয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনও করেছেন। তিনি বলেছেন, কাকতালীয়ভাবে তার সন্তানদের নামের সঙ্গে ইউনিয়নগুলোর নাম মিলে গেছে। কিন্তু তিনি স্পষ্টভাবে বলেননি যে নামগুলো পরিবর্তন করা হবে।

পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমে খবর আসে, প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেছেন। জেলা প্রশাসককে নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানা যায়। যদি সত্যিই নাম পরিবর্তন হয়, তাহলে প্রশাসনিকভাবে একটি সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ ভাবমূর্তি একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনরুদ্ধার করা সহজ নয়।

রাজনীতিবিদদের জন্য জনমত একটি বড় সম্পদ। মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু সেই বিশ্বাস হারাতে সময় লাগে খুব কম। তাই জনপ্রতিনিধিদের এমন সব কাজ থেকে দূরে থাকা উচিত, যা অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের জন্ম দেয়।

অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, মীর শাহে আলমের এলাকায় তার নামে একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তার নামে প্রায় দশটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। এখানে দুটি সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমত, তিনি এলাকায় জনপ্রিয়। মানুষ তার অবদানকে স্বীকৃতি দিতে চেয়েছে। দ্বিতীয়ত, তিনি শিক্ষা বিস্তারে আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা দিয়েছেন। তাই তার ও তার পরিবারের অন্যদের নাম প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশে দানশীল মানুষের অভাব নেই। সিলেটের রাগীব আলীর নাম এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন। দীর্ঘদিন ধরে সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত আছেন। সিলেট অঞ্চলে তাকে অনেকেই “দানবীর রাগীব আলী” নামে চেনেন।

যদি মীর শাহে আলম সত্যিই শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন, তাহলে ভবিষ্যতে তার অবদানও বড় পরিসরে মূল্যায়িত হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ইতিবাচক কাজগুলো অনেক সময় বিতর্কের আড়ালে চাপা পড়ে যায়। একটি ভুল সিদ্ধান্ত বহু ভালো কাজকে ম্লান করে দিতে পারে।

রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সহনশীলতা। সমালোচনা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। সংবাদমাধ্যম প্রশ্ন করবে। সাংবাদিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন। জনগণ মতামত দেবে। এসবকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা না থাকলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মীর শাহে আলমকে নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের জেরে একজন সাংবাদিক গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। মামলার পেছনের আইনি বিষয় আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিচার্য বিষয়। তবে সাধারণ মানুষের কাছে এমন ঘটনা সবসময়ই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। কারণ সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেটি হলো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মীর শাহে আলমের ব্যক্তিগত সম্পর্ক। রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন গুঞ্জন রয়েছে যে তারা দীর্ঘদিনের বন্ধু। এই তথ্য সত্য হোক বা না হোক, জনমনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছের মানুষ। এখানেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। বন্ধুত্ব ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। দুই ক্ষেত্রের সীমারেখা যত স্পষ্ট থাকে, ততই ভালো।

ইতিহাস বলে, অনেক নেতা নিজের কাজের চেয়ে আশপাশের মানুষের কারণে বেশি সমালোচিত হয়েছেন। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এমন উদাহরণ রয়েছে। কোনো নেতার বন্ধু, আত্মীয় বা ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কর্মকাণ্ড অনেক সময় সেই নেতার ভাবমূর্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই ক্ষমতার কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের আরও বেশি সতর্ক হওয়া উচিত। তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি বক্তব্য এবং প্রতিটি কর্মকাণ্ড জনসমক্ষে বিশ্লেষিত হয়। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও তাদের কাছে বেশি থাকে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সরকারের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখা। জনগণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চায়। তারা উন্নয়ন চায়। তারা এমন প্রশাসন চায় যেখানে বিতর্কের চেয়ে কাজের খবর বেশি শোনা যাবে।

বন্ধুত্ব অবশ্যই মূল্যবান। মানুষের জীবনে বন্ধুদের ভূমিকা অনেক বড়। সুখে-দুঃখে বন্ধুরাই পাশে থাকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পথেও বন্ধুরা গুরুত্বপূর্ণ সহযাত্রী হন। সেই সম্পর্ককে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন নেতা যদি বন্ধুদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন, তাহলে সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ জনগণ শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি নয়, সরকারের সামগ্রিক কর্মক্ষমতাকেই মূল্যায়ন করে। আমরা চাই বাংলাদেশ এগিয়ে যাক। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকুক। সরকার ও প্রশাসনের ভাবমূর্তি অযথা বিতর্কে ক্ষতিগ্রস্ত না হোক।

ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। পদও চিরস্থায়ী নয়। কিন্তু মানুষের মনে তৈরি হওয়া ভাবমূর্তি অনেক দীর্ঘস্থায়ী। একজন রাজনীতিবিদের জন্য সেটিই সবচেয়ে বড় সম্পদ। আর সেই সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তার নিজেরই।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও শিশু সাহিত্যিক।