পীযূষ সিকদার


গত ১৭ জুন জাতীয় নাট্যশালার এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হলো নাটক রঙমহাল। ঢাকা থিয়েটারের ৫৪তম প্রযোজনা রঙমহাল। নাটকটি রচনা করেছেন ড. রুবাইয়াৎ আহমেদ। এবং নির্দেশনায় ফারুক আহমেদ। নাটকটি দেখতে যেয়ে মাথার মধ্যে ভার অনুভব করছিলাম। ঢাকা থিয়েটার তো! নাটকের নানান বাঁকে বাঁকে তাদের গবেষণা। একটু ভয় ভয় করে। তাদের নাটক বুঝতে কষ্টসাধ্য মনে হয়। তারপর বেল বাজলো। শুরু হলো নাটক। যে ভয় কাজ করছিল সেটি কেটে গেলো এক নিমিষেই। আমি নির্ভার হলাম। একটানা নাটকটি দেখে ফেললাম। এতো সুন্দর নাটকটি আগেতো দেখিনি। হয়ত আমার সীমাবদ্ধতা। কত জনের কত রকমের সীমাবদ্ধতা থাকে। তাতে দোষের কী? 

নাটকের গল্পটি অসাধারণ। ধন্যবাদ অনুজ বন্ধু রুবাইয়াৎ আহমেদকে। শুধু রুবাইয়াৎকে ধন্যবাদ দিয়ে অন্যদের ছোট করবো এতো বড় স্পর্ধা আমার কখনোই ছিলো না। আজও নেই। ঘটনাচক্রে রজব আর খুশবুর বিয়ে হয়। দুজনেই অন্ধ। ভিক্ষা করে তাদের সংসার চলে। ভালোই চলছিল তাদের সংসার ধর্ম। রজব জানে যে তার স্ত্রী খুশবু অসাধারণ সুন্দর। খুশবুও জানে তার স্বামী রজবও অপূর্ব সুন্দর। হঠাৎ একদিন গ্রামে এক সাধু আসে। সে সব রোগ নিরাময় করতে পারে। তার কাছে যে যা চাইলো। তাদের আশা পূর্ণ হলো। রজব সেই সাধুর কাছে যেতে চাইলো খুশবু যেতে রাজি হলো না। তার কাছে অন্ধকারই সুন্দর। কী বাহারী রকমের অন্ধার। এই আন্ধার রেখে আলো আলো কে দিলো? কিন্তু রজবের চোখে মুখে আলোর নাচন। সে সাধু বাবার কাছে গেলো। তাঁর আরজি পেশ করলো। সংগে সংগে রজব চোখ ফিরে ফেলো। পৃথিবী দেখার আনন্দে রজব খুশবুর কাছে গেলো। আহা আমার বউ কী সুন্দর! সে মেয়েটি তার স্ত্রী নয়। চোখ ফিরে পেয়ে খুশবুর নিকট যায়। কুৎসিৎ কুৎসিৎ। খুশবু কষ্ট পায়। সে রজবকে এতোদিন আগলে রেখেছিলো ভালোবাসায় ভালোবাসায়। এখন চক্ষু ফিরে পেয়ে তার স্ত্রীকে প্রত্যাখ্যান করে। খুশবু কষ্ট পায়। রজব ব্যবসায় মনোনিবেশ করে। অনেক টাকার মালিক হয়। একদিন যাত্রাপালা দেখতে যেয়ে নায়িকা মৌসুমীর প্রেমে পড়ে। তার পেছনে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে। যাত্রা দল যে অঞ্চলেই যায় রজব তার পিছু পিছু। মৌসুমী পাগল ছেলেটাকে ভালো বেসে ফেলে।একদিন মৌসুমীকে নিয়ে বাড়ি আসতে চায়। মৌসুমী রাজী হয় না। এভাবেই এগিয়ে চলে নাট্যাখ্যান।

নাট্য নির্দেশক বলছেন, কখনো নাটক নির্দেশনা দেইনি। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেয়ে দু একটি নাটক নির্দেশনা দিয়েছিলাম। তারপর ঢাকা থিয়েটার। ঢাকা থিয়েটারের হাত ধরে মিডিয়ায় অভিনয় করে চলেছি। প্রথম বাচ্চু ভাই আমাকে প্রস্তাব দিলো একটি নাটক মঞ্চায়নের জন্য। আমি ভয় পেয়ে যাই। বাচ্চু ভাই বললেন, তুমি পারবে। তার আর্শীবাদ অথবা দোয়া মাথায় নিয়ে রবাইয়াৎ-এর লেখা নাটক মহড়ায় এগিয়ে যাই।

ফারুক ভইিয়ের বিনয় আমাকে মুগ্ধ করেছে। সুন্দরে সুন্দরে যখন মিল হয় তখনই কাজটি সুন্দর হয়। ড. রুবাইয়াৎ আহমেদের নাটকটি অসাধারণ সুন্দর। নির্দেশক সুন্দর হাতে মালাটি গেঁথেছেন। তাইতো সুন্দর হলো নাটক। রঙমহাল নাটকটির দর্শনে দর্শনে আমি নিরোগ হলাম। নাটক মানুষকে নিরোগ করতে পারে? আমি বলবো পারে। নিন্দুকেরা কে কি বললো তাতে আমার কিছু যায় আসে না। নির্দেশক ফারুক আহমেদকে আবারো ধন্যবাদ। যুদ্ধ আপনি ভুলেননি। এতো ভালো মালা গাঁথতে পারেন আপনি? নাটকের পরতে পরতে আপনি আইরনি বেষ্টনী করে সামনের দিকে এগিয়েছেন। নাট্য দৃশ্যকাব্য শ্রবণে শ্রবণে নিরোগ হলো অনেকেই। কেউ বুঝলো কেউ বুঝলো না। বোঝা না বোঝায় কিছু যায় আসে না। সুন্দর তো সুন্দরই। সুন্দরে সুন্দরে মিলে অরূপেরই অনুসন্ধান করেছেন নাট্যকার ও নাট্য নির্দেশক। রূপ আর অরূপ বুঝিবা একে অপরের পরিপূরক। ঢাকা থিয়েটার শুরু থেকেই শেকড় সন্ধানী নাট্যদল। তাইতো শেকড়ের টানে ঘরে ফিরি। ঘরে কী ফিরতে দেয় নাটক! হ্যাঁ ঘরে ফিরি! মাথার মধ্যে বাজে রঙমহালের নিনাদিত সুর ও সংলাপ। কখনোবা বর্ণনা। ঘরে ঢুকলেতো আরেক কাব্যকথা শুরু হয়। তাই আজও আকাশ কাঁপে। আমি চুপ। আমি চৈতন্যে-অচৈতন্যে আলো খুঁজি। আসলেই কী রজব ও খুশবু আন্ধা! আমার কাছে মনে হয় না। সাধু তো সকলের জ্ঞানচক্ষু খুলে দিলেন। চোখে দেখি এটা জ্ঞানত না। জ্ঞান চুক্ষ খুলে দিলেন। সেই চক্ষে সবদেখা যায় অন্ধকার অথবা আলো। নাটকের মোদ্দাকথা- রঙমহাল জ্ঞানচক্ষু খুলে দেয় নয়নে নয়নে।

রজব মৌসুমেিক ভুলেছে। আবার ফিরে আসে খুশবুর কাছে। খুশবু গ্রহণ করেনি। কেন করেনি? এ প্রশ্ন তোলা থাক- অন্য এক সন্ধায় বলা যাবে হয়তো। নাট্যকার বলছে, রূপও অরূপের আখ্যান রঙমহাল। নির্দেশক বলছেন রূপ-অরূপের আখ্যানকে কতখানি তুলে ধরতে পেরেছি তা বলবে দর্শক। বাংলা নাটকের সুবর্ণপুত্র নাসির উদ্দীন ইউসুফ ও মঞ্চকুসুম শিমুল ইউসুফের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা।
নাট্যকার বলছেন, আমার রচিত নাটক মঞ্চায়নের ঘটনায় তাঁদের আগ্রহ ও উচ্ছাস আমাকে আপ্লুত করেছে। এই নাট্যের সংগে যুক্ত সকলের প্রতি আমার অশেষ প্রণতি। শিল্পের পথে ঢাকা থিয়েটার দীর্ঘজীবী হোক। যেনো আমরা ধম নিতে পারি।

রজব চরিত্রে অনিক ইসলাম দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। খুশবু চরিত্রে নাসরিন নাহার মঞ্চে তাকে দেখে নির্বাক অভিনয় দেখে চোখের জলে ভেসে আমার দু’নয়ন। হাবিবা আজিজ হ্যাপী ও যা তাই করেছে। নার্গিস আক্তারের অভিনয় মন কেড়েছে। জানা ছিলো না বন্ধুপত্নিও অভিনয় জানে। সাধু চরিত্রে মোস্তফা রতন আন্ধারে আলো জ্বালে। চুমকি বরাবর ভালো অভিনয় করে। এখনো অনেক সময় সামনে এগুনোর। মঞ্চে আলো জ্বেলেছেন ওয়াসিম আহমেদ। বলা যায় আলোর নাচন। মঞ্চ পরিকল্পনায়- সাকিল সিদ্ধার্থ। সেটের বহুবিধ খেলা দেখিয়েছেন। গান লিখেছেন- ড. রুবাইয়াৎ আহমেদ। সুর- শিমুল ইউসুফ ও অন্যান্য সকল।

ঢাকা থিয়েটার এগিয়ে যাক- পদ বিক্ষেপে সামনের দিকে। একদিন আলো আসবেই। এইতো রঙমহাল। রঙে রঙে সুনীল আকাশ। একদিন ঢাকা থিয়েটার রঙিন হবে। নিরাভরণ হবো আমরা। আকাশে আকাশ ছুঁয়ে।

লেখক : শিক্ষক ও নাট্যকার।