লৌহজংয়ে পরকীয়ার সালিসে ৫০ হাজার টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ
এখতিয়ার বহির্ভূত বিচারে বিবাহ বিচ্ছেদের রায়!
মো. মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ : তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষমতা গ্রাম আদালতের নেই। কিন্তু গ্রাম আদালতকে পাশ কাটিয়ে একজন মহিলা মেম্বার অর্থের বিনিময়ে সালিস করে এক দম্পত্তির বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়েছেন। এই নিয়ে সালিস মিমাংসার স্ট্যাম (নন জুডিশিয়াল) করে পরকিয়া প্রেমিকের সাথে বিয়ে দিয়ে দেবার জন্য ৩ মাস অপেক্ষায় থাকার রায় দিয়েছেন ওই মহিলা মেম্বার। ঘটনাটি ঘটেছে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ ইউনিয়নের পদ্মা সেতু পূর্ণবাসন কেন্দ্রে। যা গ্রাম্য আদালত আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩) অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ। এ ধরণের বিচার করা মহিলা মেম্বারতো দূরের কথা গ্রাম আদালতেরও এখতিয়ার নেই।
কুমারবোগের ওই পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরকীয়া কান্ডে আপত্তিকর অবস্থায় এক যুগলকে আটকের পর, তা মীমাংসার নামে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য রিনা বেগমের বিরুদ্ধে। প্রকাশ্যে বিচার না করে স্থানীয় আলতাফ শেখের বাড়ির দ্বিতীয় তলায় দরজা বন্ধ করে সালিস চলানোয় স্থানীয় এলাকাবাসী ও যুবসমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুমারভোগ পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দা মোঃ উজ্জল ঢাকায় চায়না প্রজেক্টে কর্মরত থাকার সুবাদে দীর্ঘদিন ধরে বাড়ির বাইরে থাকেন তিনি। এই সুযোগে তার স্ত্রীর সাথে স্থানীয় আজিজুল শেখ নামের এক ব্যক্তির পরকীয়া সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গত কয়েকদিন আগে রাত আনুমানিক ১১টার দিকে আপত্তিকর অবস্থায় তাদের দু’জনকে হাতেনাতে আটক করে স্থানীয় যুবসমাজ ও এলাকাবাসী। ঘটনার রাতেই বিষয়টি মীমাংসার আশ্বাস দিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য রিনা বেগম সময় চেয়ে নেন বলে স্থানীয়রা জানান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, ঘটনার দু’দিন পর পুনর্বাসন কেন্দ্রের আলতাফ শেখের বাড়ির দ্বিতীয় তলায় এক সালিস বৈঠক বসে। অভিযোগ উঠেছে, বিচার কার্য পরিচালনায় ও আনুষঙ্গিক খরচ-এর অজুহাত দেখিয়ে পরকীয়া কান্ডে জড়িত দুই পক্ষ থেকেই ২৫ হাজার টাকা করে মোট ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন মেম্বার রিনা বেগম।
বিচারের নামে এই অর্থ আদায়ের বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বিচারের নামে বিচার করতে টাকা লাগবে কেন? আর বিচার যদি ন্যায়সঙ্গত হয়, তবে দ্বিতীয় তলার ঘরের দরজা বন্ধ করে কেন বিচার কার্য সম্পন্ন করতে হবে?"
এলাকাবাসীর গুরুতর অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় একটি চক্র ইতিপূর্বেও বিভিন্ন অনৈতিক ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার কথা বলে এভাবে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। বিচারকে বাণিজ্য বানিয়ে ফেলার কারণেই সমাজে পরকীয়ার মতো অনৈতিক কার্যক্রম দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সালিশ সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী স্বামী মোঃ উজ্জল তার স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়ার ৩ মাস পর আজিজুল শেখ ওই নারীকে বিয়ে করতে পারবেন বলে রায় দেওয়া হয়েছে এবং বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটানো হয়েছে। তবে এই রায় নিয়েও চরম সংশয় প্রকাশ করেছে এলাকাবাসী। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকা আজিজুল ৩ মাস পর আদৌ ওই নারীকে বিয়ে করবে, নাকি মেম্বারের এই কথিত বিচারের আড়ালে ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যাবে তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে সংরক্ষিত আসনের ওই ইউপি সদস্য রিনা বেগমের কাছে জানতে চাইলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, দুজনে পরকীয়া জড়িত ছিল। তাদেরকে বিচার করে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটনা হয়েছে। এবং তিন মাস ১০ দিন অপেক্ষার পর পরকিয়া প্রেমিকের সাথে ১ লাখ টাকা দেন মোহরে তাদের বিয়ে দেয়া হবে বলে মর্মে স্ট্যাম্পে রায় দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে উভয় পক্ষের পরিবারের সম্পতি ছিল। বিবাহ বিচ্ছেদের বিচার করার এখতিয়ার তার আছে বলে তিনি দাবী করে।
ইউনিয়ন পষিদের গ্রাম আদালতে কেন বিচার করলেন না- এরকম প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি আমার ভূল হয়েছে। তবে বিচার করে আমি কোন টাকা পয়সা নেইনি। এটি সম্পূর্ণ মিথা।
এ ব্যাপরে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আরাধনা রানী কর্মকার জানান, ইউপি মেম্বার কেন বিবাহ বিচ্ছেদের মত ঘটনার বিচার করার এখতিয়ার ইউনিয়ন পরষদের গ্রাম আদালতেরও নেই। এক মাত্র পারিবারিক আদালতই এই ধরণের রায় দিতে পারে।
(এমকে/এসপি/জুন ২৪, ২০২৬)
