কাপাসিয়ায় ‘কাঁঠাল’র বাম্পার ফলন, দাম নিয়ে হতাশ কৃষকরা
সঞ্জীব কুমার দাস, কাপাসিয়া : জাতীয় ফল কাঁঠালের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই উপজেলার গ্রাম-গঞ্জজুড়ে এখন কাঁঠালের মহা উৎসব। বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে, পুকুরপাড়, বাগান ও কৃষিজমির চারপাশে ছোট-বড় অসংখ্য কাঁঠাল ঝুলতে দেখা যাচ্ছে গাছে। প্রতিটি গাছে ২০-৩০টি, আবার কোথাও শতাধিক কাঁঠাল ধরেছে। প্রকৃতির এই অপরূপ দৃশ্য দেখে যেন চোখ জুড়ায়ে যায়, প্রচুর পরিমান কাঠাল উৎপাদনের ফলে বাজার দর কমে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছে কৃষকরা।
উপজেলার ১১ ইউনিয়নের টোক, উজলী দিঘীরপাড়, চৌকারচালা, নরসিংহপুর, জলপইতলা, বেগুনি, ভাকোয়াদী, কাপাসিয়া সদর ও চাঁদপুর বাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রতিদিন ভোর থেকেই জমে উঠছে কাঁঠালের বাজার। কৃষকরা ভ্যান, অটোরিকশা ও অন্যান্য ছোট যানবাহনে করে কাঁঠাল নিয়ে আসছেন বাজারে। কিন্তু পানি দামে কাঠাল বিক্রিতে হতাশ হয়ে পড়েছে কৃষকরা। এ সুযোগে কম দামে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, কুমিল্লা ও চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকাররা এসব কাঁঠাল কিনে নিয়ে যাচ্ছে ট্রাকযোগে দেশের নানা প্রান্তে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাজার সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, মৌসুমের শীর্ষ সময়ে কাপাসিয়া থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৮০টি ট্রাক কাঁঠাল দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। ঢাকার বড় ফলের আড়তসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাপাসিয়ার কাঁঠালের বিশেষ চাহিদা রয়েছে। তবে উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষকরা কাক্সিক্ষত দাম পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। আকার ও মানভেদে কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কাঁঠাল মাত্র ১০ থেকে ৫০ টাকায় কিনে নিচ্ছেন পাইকাররা। উপজেলার বিভিন্ন হাট বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সময় মতো ক্রেতা না পাওয়ায়
কাঁঠাল গাছেই পেকে নষ্ট হচ্ছে। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষকরা বাধ্য হয়ে কম দামে কাঁঠাল বিক্রি করছেন। কেন্দুয়াব গ্রামের পাইকার আব্দুল কাদির বলেন, “কাপাসিয়ার কাঁঠালের স্বাদ ও গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন। কিন্তু সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যায়। তখন কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।”
বড়চালা গ্রামের পাইকার মফিজ উদ্দিন বলেন, “গ্রাম থেকে কাঁঠাল সংগ্রহ করে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়ে থাকে।”
নরসিংহপুর গ্রামের পাইকার কফিল উদ্দিন জানান, “প্রতিদিন দুই ট্রাক কাঁঠাল সিলেটে পাঠাই। শুধু আমি নই, আরও অনেক ব্যবসায়ী বিভিন্ন জেলায় কাঁঠাল পাঠাচ্ছেন। এই ব্যবসার ওপর বহু পরিবারের জীবিকা নির্ভরশীল।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, কাপাসিয়ার কাঁঠালের সুগন্ধ ও স্বাদ অন্য অঞ্চলের তুলনায় আলাদা হওয়ায় এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে উৎপাদন বেশি হলে বাজারে দাম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
চৌকারচালা বাজারের এক ব্যবসায়ী বলেন, মৌসুমের শুরুতে বড় একটি কাঁঠাল ১২০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এখন একই কাঁঠাল ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাঁঠাল শুধু একটি ফল নয়; এটি অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য। কাঁঠালের কোয়া, বীজ ও কাঁচা কাঁঠাল থেকে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদন সম্ভব। আধুনিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে অপচয় কমবে এবং কৃষকরাও অধিক লাভবান হবেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোখলেছুর রহমান জানান, কাপাসিয়া উপজেলায় বর্তমানে ১ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের আবাদ হয়েছে। এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ও সম্ভাব্য উৎপাদন প্রায় ৭৬ হাজার ৩৪০ মেট্রিক টন।
তিনি বলেন, “কাঁঠাল উৎপাদনে কাপাসিয়া দেশের অন্যতম শীর্ষ উপজেলা। সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা আরও উন্নত করা গেলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং কাঁঠালভিত্তিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।”
(এসকেডি/এসপি/জুন ২৭, ২০২৬)
