ডাঃ রবিউল হোসেন ও আমার স্মৃতি
আবদুল হামিদ মাহবুব
বাংলাদেশের চক্ষু চিকিৎসার পথিকৃৎ অধ্যাপক ডাঃ রবিউল হোসেন আর নেই। ২০২৬ সালের ২৭ জুন, শনিবার তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর প্রয়াণের সংবাদ শুনেই বহু বছর আগের কিছু স্মৃতি একে একে ফিরে এলো।
ডাঃ রবিউল হোসেনকে আমি খুব ঘনিষ্ঠভাবে চিনতাম না। তবে তাঁকে দেখেছি, তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। আমার কিশোর বয়স থেকেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়। সম্ভবত ১৯৭৭ কিংবা ১৯৭৮ সালের কথা।তখন প্রতিবছর শীত মৌসুমে মৌলভীবাজারে চক্ষু শিবির অনুষ্ঠিত হতো। এসব শিবিরের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন ডাঃ শাহ নুরুল ইসলাম। তাঁকে আমি আগে থেকেই চিনতাম। তিনি রেডক্রসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং আমাদের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে এসে স্বেচ্ছাসেবক সংগ্রহ করতেন। পরে জানতে পারি, তিনি আমার গ্রাম ঢেউপাশায় থেকে লেখাপড়া করেছেন এবং আমার চাচার সহপাঠী ছিলেন।
ডাঃ শাহ নুরুল ইসলামের উদ্যোগেই মৌলভীবাজারে বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতির শাখা গড়ে ওঠে। সংগঠনের অস্থায়ী কার্যালয় ছিল শহরের চৌমোহনায় তাঁর ‘শাহ মেডিকেল হল’-এর চেম্বারে। এই সংগঠনের উদ্যোগেই প্রতিবছর ছয়-সাত দিনব্যাপী চক্ষু শিবির অনুষ্ঠিত হতো। সেই সময় আমি, মোঃ কামরুল ইসলাম ও রতনকান্তি চাকলাদার; আমরা তিনজনই তখন মাত্র সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত হয়েছি। আমরা তিনজনই তখনও কিশোর বয়সী। আমাদের ওপর দায়িত্ব পড়ল গ্রামগঞ্জের হাট-বাজারে গিয়ে টিনের তৈরি চোঙা মাইক দিয়ে চক্ষু শিবিরের প্রচারণা চালানোর।
হাতে কিছু লিফলেট ধরিয়ে দেওয়া হলো। প্রায় এক মাস ধরে আমরা বিভিন্ন হাট-বাজারে ঘুরেছি। মাইকে ঘোষণা করেছি; কোথায়, কবে চক্ষু শিবির হবে, দেশ-বিদেশের চিকিৎসকরা আসবেন, বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার করা হবে, রোগীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে। একজন বলতে বলতে ক্লান্ত হলে আরেকজন মাইক হাতে নিতাম।
আমার স্মৃতি দেখে বলছি। সম্ভবত প্রথম চক্ষু শিবিরটি হয়েছিল বর্তমান আলী আমজদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্থানে। তখন সেটি ছিল আলী আমজদ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। শিবির শুরু হলে আমরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ শুরু করি। বিভিন্ন বিদ্যালয়ের স্কাউট ও গার্লস গাইডের সদস্যরাও যুক্ত ছিলেন। এখনো আয়েশা শাহনাজ রিনির নাম মনে আছে। আরও অনেকে ছিলেন, কিন্তু এত বছর পরে সবার নাম আর মনে নেই। শিবিরের অফিস পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদ আতহার। তিনিও নিষ্ঠার সঙ্গে পুরো কার্যক্রম সামলেছিলেন।
সেখানেই প্রথম দেখি ডাঃ রবিউল হোসেনকে। তাঁকে দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছিলাম। অত্যন্ত সুদর্শন মানুষ। রাজপুত্রের মতো ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তাঁর আসল সৌন্দর্য ছিল কাজে। রোগীদের প্রতি তাঁর মমতা, ধৈর্য এবং নিষ্ঠা ছিল অসাধারণ।তখনকার দিনে এখনকার মতো আধুনিক অপারেশন থিয়েটার ছিল না। স্কুলের কয়েকটি উঁচু বেঞ্চ একসঙ্গে জুড়ে অপারেশন টেবিল বানানো হতো। আধুনিক মাইক্রোস্কোপও ছিল না। চিকিৎসকেরা বিশেষ ধরনের ম্যাগনিফায়িং গ্লাস ব্যবহার করতেন।
প্রথম দিন আমার দায়িত্ব ছিল অপারেশনের সময় রোগীর চোখে টর্চের আলো ধরে রাখা। আলোটি নির্দিষ্ট কোণে ধরে রাখতে হতো, যাতে চিকিৎসকের কাজ সহজ হয়। দুটি টেবিলে একসঙ্গে অস্ত্রোপচার চলছিল। আমি একটি টেবিলে আলো ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিছুক্ষণ পর রক্ত দেখে মাথা ঘুরে গেল। এরপর কী হয়েছিল মনে নেই। পরে জানতে পারি, আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলাম। পাশের টেবিলে অপারেশন করছিলেন ডাঃ রবিউল হোসেন। তিনিই দ্রুত আমাকে ধরে ফেলেছিলেন। জ্ঞান ফেরার পর তিনি হেসে বলেছিলেন, 'এই সাহস নিয়ে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করবে? সামান্য রক্ত দেখেই জ্ঞান হারিয়েছিলে! আমি না ধরলে তো তোমারই বিপদ হতো।' কথাগুলো আজও কানে বাজে। তাঁর মৃত্যুসংবাদ শুনে সবার আগে সেই ঘটনাটিই মনে পড়েছিল।
এরপর আর কখনো অপারেশনের পাশে দাঁড়াইনি। তবে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অন্যান্য দায়িত্ব পালন করেছি। প্রতিবছর চক্ষু শিবিরে কাজ করেছি। আর প্রায় প্রতি বছরই দেখেছি, ডাঃ রবিউল হোসেন তাঁর চিকিৎসক দল নিয়ে মৌলভীবাজারে এসেছেন। পরে ডাঃ শাহ নুরুল ইসলাম জার্মানিতে চক্ষু চিকিৎসার ওপর প্রশিক্ষণ নেন। দেশে ফিরে তিনি পূর্ণাঙ্গ চক্ষু বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁর নেতৃত্বে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত চক্ষু শিবির অনুষ্ঠিত হতে থাকে। এসব কর্মসূচিতে জার্মানির স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘আন্ধেরি হেলফি’-এর সহযোগিতা ছিল। পরে জানতে পারি, বাংলাদেশে এই ধরনের চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রম বিস্তারে ডাঃ রবিউল হোসেনই ছিলেন মূল উদ্যোক্তা।
তিনি ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। কারিতাস বাংলাদেশের সহযোগিতায় চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় মাত্র ৩ হাজার ৬০০ টাকা এবং ৪০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটির। পরে এর কার্যক্রম সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য চক্ষু হাসপাতাল ও শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৮৩ সালের আরেকটি স্মৃতি আজও স্পষ্ট। সেবার মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের নির্মাণ কাজ পরিদর্শনের জন্য জার্মানির আন্ধেরি হেলফির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মিস রুজি গোলমান এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ডাঃ রবিউল হোসেন। সন্ধ্যায় তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা হয় মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসে। তখন সেখানে টিনের একটি ভবন ছিল। এখনো সেটা আছে। তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের কাছ থেকে অতিথিদের রাখার জন্য সেই ভবনের একটি কক্ষ বরাদ্দ পাওয়া গেল। একটি কক্ষে একটি মাত্র খাট। অতিথি দুজন; রুজি গোলমান ও ডাঃ রবিউল হোসেন। রুজি গোলমান নিজের সঙ্গে আনা একটি কম্বল মেঝেতে বিছিয়ে বললেন, তিনি মেঝেতেই থাকবেন। ডাঃ রবিউল হোসেন যেন খাটে ঘুমান। বিষয়টি দেখে আমরা সবাই কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছিলাম। ডাঃ শাহ নুরুল ইসলাম ও সৈয়দ মোহাম্মদ আতহারসহ উপস্থিত সবাই বিব্রত ছিলেন। কিন্তু রুজি গোলমান হাসিমুখে সবাইকে আশ্বস্ত করলেন। এরপর কীভাবে রাত কাটিয়েছিলেন, তা আর জানা হয়নি। পরদিন হাসপাতালের নির্মাণ কাজ দেখে তাঁরা চলে যান। পরে ১৯৮৬ সালে হাসপাতাল উদ্বোধনের সময় আবারও রুজি গোলমান মৌলভীবাজার এসেছিলেন।
ডাঃ রবিউল হোসেন শুধু একজন চিকিৎসক ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি আন্দোলনের নাম। তাঁর উদ্যোগে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ চক্ষু শিবিরের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ মানুষের চোখের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। ১৯৭৫ সালে শুরু হওয়া স্কুলশিক্ষার্থীদের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা কর্মসূচির আওতায় প্রায় আট লাখ শিক্ষার্থীর চোখ পরীক্ষা করা হয়েছে। ১৯৮৩ সালে তিনি চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে 'চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র' প্রতিষ্ঠা করেন। সেটাকে এখন দেশ-বিদেশের মানুষ CEITC হিসাবে চেনে। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চক্ষু চিকিৎসাকেন্দ্র। তাঁর উদ্যোগে সেখানে ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন অপটোমেট্রি কোর্স চালু হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অপথালমোলজি প্রতিষ্ঠাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর অবদান ছিল সমান উজ্জ্বল। তিনি দীর্ঘদিন এশিয়া প্যাসিফিক একাডেমি অব অপথালমোলজির জাতীয় কাউন্সিলর ও আঞ্চলিক সচিব ছিলেন। আন্তর্জাতিক অন্ধত্ব প্রতিরোধ সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ৯০ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়েছে। ২৮ জুন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার কাঠাছড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।
ডাঃ রবিউল হোসেন চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান, তাঁর হাতে দৃষ্টি ফিরে পাওয়া লাখো মানুষ এবং তাঁর মানবিক কর্মযজ্ঞ তাঁকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে। আমার স্মৃতিতেও তিনি চিরদিন সেই মানুষটি হয়েই থাকবেন; যিনি একদিন অপারেশন টেবিলের পাশে অজ্ঞান হয়ে পড়া এক কিশোর স্বেচ্ছাসেবককে ধরে বলেছিলেন, এই সাহস নিয়ে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করবে? শ্রদ্ধা ও বিদায়ী অভিবাদন ডাঃ রবিউল হোসেন। আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন।
লেখক: যুগ্মসাধারণ সম্পাদক, মৌলভীবাজার বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল।
