মৃত্যুকালীন লিখিত জবানবন্দি থাকার পরও
রমেশ দাসকে আত্মহননে বাধ্য করার ঘটনার ৫২ দিনেও মামলা নেয়নি ওসি!
রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ি গ্রামের রমেশ দাসকে আত্মহননে বাধ্য করার ঘটনার ৫২ দিনেও মামলা নেয়নি পুলিশ। মৃতের বাবা অভিযোগকারি সত্য চরণ দাসকে কখনো ময়না তদন্তের প্রতিবেদন আসার পর, আবার কখনো উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলার পর মামলা নেওয়ার কথা বললেও একপর্যায়ে আদালতে মামলা করার কথা বলায় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মাসুদুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দক্ষিণ ফিংড়ি গ্রামের উৎপল দাস জানান, তার বড় ভাই রমেশ চন্দ্র দাস ২০২২ সাল থেকে পাড়ার মোড়ে একটি মুদিখানা দোকান পরিচালনা করে আসছিলো। ব্যবসার সুবাদে প্রতিবেশি বিধবা সান্ত¡না দাসের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন এর পাশাপাশি সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে দাদা রমেশ দাসের। বিষয়টি ভালভাবে মেনে নেয়নি সান্ত¡না দাসের পরিবারের স্বজনরা। একপর্যায়ে ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টার দিকে দাদা রমেশ দাস, বউদি অনিমা দাস ও ছেলে শিশু রুদ্র দোকান থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় নিত্যানন্দ দাস, রবিন দাস, দুলাল দাস ও ঝর্ণা দাসসহ কয়েকজন তাদেরকে পিটিয়ে জখম করে। মামলা থেকে বাঁচতে সান্ত¡না দাসের ননদ ঝর্ণা দাস তড়িঘড়ি করে বাদি হয়ে ২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল দাদা রমেশ দাস এর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যনালে ধর্ষণের চেষ্টা মামলা দায়ের করে। তদন্তে সত্যতা না পাওয়ায় মামলা খারিজ হয়ে যায়। দাদা, বউদি ও ভাইঝিকে মারপিটের ঘটনায় দাদা রমেশ চন্দ্র দাস বাদি হয়ে রবিন দাস, নিত্যানন্দ দাস ও দুলাল দাসসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় সান্ত¡না দাসকে প্রধান সাক্ষী করা হয়।
পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোর উপপরিদর্শক মোঃ মাহাবুবর রহমান নিত্যানন্দ, রবিন ও দুলাল এর নাম উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। নিত্যানন্দ ও দুলাল আদালত থেকে জামিন নিলেও রবিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। গত ৬ মে আসামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠণের পর গত ৬ জুন সাক্ষীর জন্য দিন ধার্য করা হয়। বর্তমানে দাদা রমেশ চন্দ্র দাস ইজিবাইক চালাতো। ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল রাতে রমেশ দাসকে মারপিটের ঘটনায় তিনি ২৮ এপ্রিল থানায় ১৫৯৮ নং সাধারণ ডায়েরী করেন। তপন কুমার বিশ্বাস ডায়েরীর তদন্ত শেষে ওই বছরের ২০ মে আদালতে নিত্য দাস, রবিন দাস, ঠাকুর দাস ও দুলাল দাসের বিরুদ্ধে ২৭ নং ননজিআর মামলা দায়ের করেন।
উৎপল দাস আরো জানান, সম্প্রতি ফিংড়ি বাজারের সবজি বিক্রেতা আনসার সরদারের ছেলে শহীদুল ইসলামের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে সান্ত¡নার। এ নিয়ে দাদা প্রতিবাদ করায় শহীদুল ও সান্ত¡নার সঙ্গে সান্ত¡নার সম্পর্কের অবনতি হয়। শহীদুল, রবিন, নিত্যা, দুলাল ও ঝর্ণা দাদাকে সম্প্রতি কয়েকবার বাজারে মারপিট করে। তাকে মেরে ফেলারও হুমকি দেয়। বউদির সোনার দুল নিয়ে নেওয়া ও রমেশকে মারপিট করার বিষয়ে কথা বলায় বাবা সত্যচরণ দাসকেও রাস্তার উপর মারপিট করে সান্ত¡নাসহ কয়েকজন। ১১ মে সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে সান্তনা দাস দাদা রমেশকে মোবাইল ফোনে ডেকে বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে তার হাতে কয়েকটি গ্যাসের ট্যাবলেট দিয়ে খেয়ে আত্মহত্যা করতে বলে সান্ত¡না। গ্যাস ট্যাবলেট না খেলে পাশে অবস্থান করা রবিন , নিত্য ও শহীদুল তাকে খুন করে ফেলবে বলে জানায় সান্তনা।
গ্যাস ট্যাবলেট খেতে না চাইলে মুঠোফোনে শহীদুল, রবিন ও নিত্যকে বাড়িতে ডেকে আনে ওই নারীা। একপর্যায়ে তারা চারজন মিলে দাদাকে ওই গ্যাস ট্যাবলেট খেতে বাধ্য করে। এরপর দাদা দৌড়ে বাড়ি এসে এ সংক্রান্ত একটি চিরকুটে বিস্তারিত লেখার পর বমি করতে শুরু করে। তাকে নিয়ে সাতক্ষীরা ব্লীজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ১টার দিকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। ১২ মে সকালে সদর থানার উপপরিদর্শক মনিরুজ্জামান মৃত্যুর আগে দাদার হ্যা-নোট, টালিখাতা, নোটবুক ও একটি স্যাম্পনি জেড-৪২ মডেলের স্মার্ট ফোন জব্দ করে নিয়ে যান। এ ঘটনায় তার বাবা সত্য চরণ দাস পরদিন থানায় একটি প্রাথমিক অভিযোগ দায়ের করলে উপপরিদর্শক মনির হোসেন তদন্ত শুরু করেন। গত ২৩ মে থানায় প্রতিবেশী সান্ত¡না দাস, নিত্য দাস ও শহীদুল ইসলামের নাম উল্লেখ করে একটি এজাহার দায়ের করেন। রমেশ দাসের ময়না তদন্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত তাদেরকে অপেক্ষা করতে বলা হয়। ময়না তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জানার জন্য বাবা ও এক মানবাধিকার কর্মীদের নিয়ে তিনি কয়েকবার থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে যান।
গত ২৮ জুন ময়না তদন্ত প্রতিবেদন থানায় এসেছে মর্মে জানতে পেরে তারা আবারো থানায় যান। একপর্যায়ে মামলা নেওয়া সম্ভব না উল্লেখ করে থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেন। মঙ্গলবার দুপুরে জব্দকৃত মৃতের স্মার্ট ফোনসহ বিভিন্ন প্রমাণাদি আনতে যেয়ে মামলার বিষয়টি উত্থাপন করলে সন্ধ্যার মধ্যে উপপরিদর্শক মনির ও উর্দ্ধতন কর্মকর্তার সঙ্গে পরামর্শ করে রাতেই মামলার ব্যাপারে বাবাকে ফোন করে জানানোর ব্যাপারে নিশ্চিত করেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় বাবাকে নিয়ে আবারো থানায় গেলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গেছেন বলে জানানো হয়। দুপুর দুটোর দিকে থানায় গেলে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলার পর দুই এক দিনের মধ্যে মামলার ব্যাপাওে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তাদেরকে ও দেশের প্রথম শ্রেণীর জাতীয় দৈনিকের এক প্রতিনিধিকে জানানো হয়।
থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসামীদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে ৫২ দিনেও এজাহারটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করেননি বলে অভিযোগ করেন সত্য চরণ দাস ও তার ছেলে উৎপল দাস।
এ ব্যাপারে বৃহষ্পতিবার দুপুর দুটোর দিকে সদর থানার নিজ অফিস কক্ষে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে মামলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জব্দকৃত মুঠোফোনটি উপপরিদর্শক মনিরের কাছ থেকে উৎপল দাসকে নেওয়ার জন্য বলা হয়।
(আরকে/এসপি/জুলাই ০২, ২০২৬)
