আবু নাসের হুসাইন, ‎সালথা : একসময় যে ফসল ছিল স্বপ্নের সোনা। আজ সেই ফসলের ন্যাম্যমুল্যে না পাওয়ায় লোকসানে পড়ে দিশেহারা কৃষকেরা। দেশের অন্যতম পাট ও পেঁয়াজ উৎপাদনকারী ফরিদপুরে সালথায় এবার ভালো ফলন হলেও কৃষকের মুখে নেই হাসি। পেঁয়াজের বাজারমুল্যে উৎপাদন ব্যয়ের থেকে নিঁচে নেমে গেছে। অন্যদিকে পাটে উৎপাদন ব্যয়, আবহাওয়ার ঝুঁকি, সেচ সংকট ও বাজার অনিশ্চয়তা মিলিয়ে কৃষকের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কৃষকদের একাংশ এখন বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে তারা কৃষি ছেড়ে বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হবেন।

‎সালথা উপজেলার ৮টি ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, মাঠে ফলন ভালো হলেও কৃষকের ঘরে স্বস্তি নেই। পেঁয়াজ বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ উঠছে না। বাজারদরের ধাক্কায় অনেক কৃষকের ঘরে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। ফসল বিক্রির আয় দিয়ে উৎপাদন ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না; সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে চাষিদের।

‎উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার মোট কৃষি জমির পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার ৯৫০ হেক্টর। এরমধ্যে চলতি মৌসুমে প্রায় ১২ হাজার ৮৮৫ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করা হয়েছিল। এছাড়া প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে। আবাদকৃত জমির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলের কৃষিতে পাট ও পেঁয়াজই প্রধান ফসল হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

‎কৃষকদের ভাষ্য, বীজ, সার, কীটনাশক, ডিজেল, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি সবকিছুর দাম বেড়েছে। অথচ বাজারে তার প্রতিফলন নেই। বর্তমানে এক মণ পেঁয়াজের দাম ৮০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে থাকলেও উৎপাদন ব্যয় তার চেয়েও বেশি। এতে কৃষিখাত দিন দিন অলাভজনক হয়ে উঠছে।

‎পাট চাষিরাও একই ধরনের অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। অনেক এলাকায় সেচ ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বাজারে ন্যায্য মূল্য না থাকায় কৃষকেরা আগাম লাভের হিসাব করতে পারছেন না। ফলন ভালো হলেও বাজারদরের পতন ও উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতির কারণে কৃষকেরা এখন দ্বিমুখী চাপে পড়েছেন। ভালো উৎপাদনের পরও লাভ না হওয়ায় কৃষিখাত ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে।

‎সালথার সোনাপুর এলাকার কৃষক আকবর বলেন, সারাবছর পরিশ্রম করে চাষ করি। কিন্তু শেষে লাভ তো দূরের কথা, মূলধনই ফেরত পাই না। এভাবে কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কৃষক মিলন মুন্সি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পেঁয়াজে লোকসান, পাটেও লাভের নিশ্চয়তা নেই। এর চেয়ে তামাক চাষ করলে অন্তত লাভের আশা থাকে। কৃষক রাকিব মোল্যা বলেন,যে কৃষক দেশের মানুষের খাবারের যোগান দেয়, সেই কৃষকই যদি নিজের সংসার চালাতে না পারে, তাহলে কৃষি টিকবে কীভাবে।

‎জানা যায়ফরিদপুরে আধুনিক পেঁয়াজ সংরক্ষণ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনও সব কৃষকের কাছে পৌঁছেনি। ফলে অধিকাংশ কৃষক বাধ্য হয়ে মৌসুমেই কম দামে ফসল বিক্রি করেন। সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে অনেকের মজুত ফসলও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

‎কৃষকদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে আগামী কয়েক বছরে পেঁয়াজ ও পাটের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এর প্রভাব শুধু ফরিদপুরেই নয়, দেশের কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।

‎এ বিষয়ে সালথা উপজেলা উপসহকারী পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুল বারী বলেন, এ বছর সালথা উপজেলায় ১৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে তোষা পাট-৯ (সবুজ সোনা) জাতের আবাদ প্রায় ১ হেক্টর এবং জেআরও-৫২৪ (নাবিন) জাতের আবাদ সবচেয়ে বেশি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকরা ভালো ফলন পেয়ে লাভবান হবেন। বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পাটের দাম প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা। মৌসুমের শুরুতে কৃষকরা আরও ভালো দাম পাবেন বলে আশা করছি।

‎উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুদর্শন শিকদার বলেন, এ বছর পেঁয়াজের ফলন ভালো হয়েছে। বর্তমানে দাম কিছুটা কম থাকলেও কৃষকরা শেষ পর্যন্ত ন্যায্যমূল্য পাবেন বলে আশা করছি। গত বছর পাটের ভালো দাম পাওয়া গেছে। এবারও ভালো দামের পাশাপাশি পাট পচানোর জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা হবে বলে আশা করছি।

(এএন/এসপি/জুলাই ০৪, ২০২৬)