মেঘ ডাকলেই আতঙ্ক, বৃষ্টিতে ক্লাস বন্ধ
নড়াইলে ১২ মাধ্যমিকে শ্রেণিকক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ
রূপক মুখার্জি, নড়াইল : মেঘ জমলেই অস্থির হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীরা। বৃষ্টি শুরু হলেই কেউ বই-খাতা বাঁচাতে বেঞ্চ সরিয়ে নেয়, কেউ ছুটে যায় শিক্ষকদের কক্ষে। ছাউনির টিন ফুটো হয়ে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে, জানালা-দরজা না থাকায় বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে যায় বই-খাতা। ঝড় উঠলে কাঁপতে থাকে পুরো ঘর।
নড়াইলে এমন অন্তত ১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে পাঠদান। ঝুঁকিতে থাকা বিদ্যালয় ভবনের মধ্যে নড়াইল সদর উপজেলার তুলারামপুর ইউনিয়নের দেবিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও শেখহাটি ইউনিয়নের মালিয়াট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক বলে জানিয়েছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা।
আজ শনিবার দুপুরে সদর উপজেলার তুলারামপুর ইউনিয়নের দেবিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, আধাপাকা টিনশেড ঘরে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। ঘরটির ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে চালের টিনে বড় বড় ছিদ্র। সেখান থেকে আকাশ দেখা যাচ্ছে। দুপুরে রোদ সরাসরি ঢুকছে শ্রেণিকক্ষে।
হালকা বাতাসে কেঁপে উঠছে টিনের চাল। কয়েকজন শিক্ষার্থী বারবার মাথার ওপরের টিনের দিকে তাকাচ্ছে। আধাপাকা ভবনের দেয়ালে অনেক জায়গায় বড় বড় ফাটল। কথা হয় কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। সীমা বিশ্বাস নামের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, ‘যখন মেঘ ডেকে ওঠে, ভয়ে আমরা কেঁপে উঠি।
সদর উপজেলার মালিয়ার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৌরভ আঢ্য বলে, আমাদের বন্ধুরা ভালো স্কুলে পড়ে। এটা দেখে আমাদের মন খারাপ হয়। শহর দূরে হওয়ায় বাবা-মা গ্রামের স্কুলে ভর্তি করেছেন। টিন ছাউনি দেওয়া ঘরে একটু বৃষ্টিতে আমাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। আমরা চাই আমাদের স্কুলটায় সুন্দর একটি ভবন হোক।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ১৩১টি মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সদর উপজেলায় ৬৪টি, লোহাগড়ায় ৩৬টি এবং কালিয়া উপজেলায় ৩১টি। এগুলোর মধ্যে ১২টি মাধ্যমিক ও নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নতুন ভবন না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চলছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চলছে এমন বিদ্যালয়গুলো হলো সদর উপজেলার বিছালী ইউনিয়নের সিআরএম মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আউড়িয়া ইউনিয়নের মূলদাইড় তালতলা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, বাঁশগ্রাম ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, তুলারামপুর ইউনিয়নের দেবীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, শেখহাটি ইউনিয়নের শেখহাটি নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় এবং একই ইউনিয়নের মালিয়াট মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও দেবভোগ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়; পৌর এলাকার বিআরডি আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়; কালিয়া উপজেলার মাউলি ইউনিয়নের মাউলি পঞ্চপল্লী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পুরুলিয়া ইউনিয়নের নোয়াগ্রাম নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পহরডাঙ্গা ইউনিয়নের মধুমতি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং পাঁচগ্রাম ইউনিয়নের জয়নুল আবেদন নুরুন্নাহার নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
তুলারামপুর ইউনিয়নের দেবিপুর গ্রামের সুকান্ত বিশ্বাস বলেন, ‘১৯৯৫ সালে স্থানীয় বাসিন্দারা এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের জন্য দেবিপুর গ্রামে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করে। নিজেরদের অর্থায়নে নির্মিত এই ভবনের কোনো সংস্কার হয়নি। পুরনো টিনশেড ঘরে চলছে পাঠদান। সামান্য বৃষ্টিতে বই-খাতা ভিজে যায়। ঝড় এলে টিনের চালা কাঁপে। জায়গায় জায়গায় বড় বড় ছিদ্র। আমরা বিদ্যালয়ে ছেলে-মেয়েদের পাঠিয়ে আতঙ্কে থাকি।’
দেবীপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাসুদেব চন্দ্র সেন বলেন, ‘ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে বই-খাতা ভিজে যায়। শিক্ষার্থীরা দৌড়ে অফিসকক্ষে চলে আসে। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষকরা সঠিকভাবে পাঠদান করতে পারেন না। অন্যদিকে ভবন না থাকায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসতে চায় না। নতুন ভবনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। তবে এখনো সুফল মেলেনি।’
জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর তালিকা প্রণয়ন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পাঠানো হয়েছে দাবি করে নড়াইল জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন বলেন, জেলায় ১৩১টি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চলছে। আমরা এসব বিদ্যালয়ের তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আশা করছি পর্যায়ক্রমে এসব প্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন হবে।
(আরএম/এসপি/জুলাই ০৪, ২০২৬)
