রূপক মুখার্জি, নড়াইল : নড়াইল ২ আসনের এমপি, জেলা জামায়ত ইসলামীর আমীর আতাউর রহমানের (বাচ্চু) মেয়ের নামে এমপির ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদান মঞ্জুরিকান্ডে দলটি চরম ইমেজ সংকটে পড়েছে। 

যদিও ভাইরাল হওয়া এমপির অনুদানের ওই মজ্ঞুরিপত্রে মেয়ের নাম থাকার দায়ে এমপি তার ব্যক্তিগত সহকারিকে (পিএস) বরখাস্ত করে পিএস’র ওপর দায় চাপাচ্ছেন, কিন্তু এখানে এমপির দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলে দলমত নির্বিশেষে অভিমত ব্যক্ত করে এ নীতি বর্হিভুত কাজ জামায়াত ইসলামীর ন্যায় নিষ্ঠা সততার রাজনীতির মূলে কুঠার আঘাত বলেই মনে করছেন। অজশ্র ঘাম রক্ত শ্রমের বিনিময়ে তিলে তিলে গড়া জামায়াতের জনসর্মন জেলা প্রধানের এমন দায়িত্বহীনতায় ধুলায় মিশে যাওয়ায় দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মাঝে চরম চাপা ক্ষোভ অসন্তোষ বিরাজ করছে।

নেতা-কর্মীদের অনেকে এ ঘটনা পর রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত ইসলামী বহু বছর পিছিয়ে গেছে অভিযোগ করে আমীরের উপর দায় চাপাচ্ছেন। তবে দলের কেউ কেউ এ ব্যাপারে এমপির দেয়া ব্যাখা বিবৃতির উপর আস্থাশীল বলেও খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে।

জানা গেছে, ইসলামী রাজনীতি মতাদর্শিক পরিবারে বেড়ে উঠা আতাউর রহমানের (বাচ্চু) ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ছাত্র শিবিরে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক জীবনের পথচলা শুরু। সেই থেকে তিনি নড়াইল জেলা ছাত্র শিবির, লেখাপড়ার সুবাদে খুলনা বিএল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, খুলনা মহানগর, কেন্দ্রীয় ছাত্র শিবিরসহ পর্যায়ক্রমে শিবিরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন হন। দলের নিবেদিত প্রান হিসেবে ২০১৩ সালে ছাত্র রাজনীতি থেকে বাচ্চুর নড়াইল জামায়াতে ইসলামীতে ঢাক পড়ে, তাকে সদর উপজেলা আমীরের দায়িত্ব দেয়া হয়, পরে জেলা সেক্রেটারী এবং ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অদ্যবধি নড়াইল জেলা আমীরের দায়িত্বে বহাল রয়েছেন।

আতাউর রহমান বাচ্চুর পঞ্চম ভাই অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান খুলনা মহানগর জামায়াতের আমীর, তিনি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে খুলনা ৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে পারাজিত হন। ষষ্ঠ ভাই শামসুর রহমান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামীর সহকারি সেক্রেটারি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বহু হামলা মামলা কারাবরণসহ দলে আতাউর রহমান বাচ্চুর অপরিসীম ত্যাগের মূল্যায়ন হিসেবে দল তাকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী করে। বিএনপির আভ্যন্তরিণ কোন্দলের ফলে তার জয়ের পথ সুগম হয়। বাচ্চুর তেমন কোনো আয়ের উৎস নেই, দল থেকে দেয়া সম্মানীর উপর নির্ভরশীল বলে জানাগেছে। নির্বাচনী হলফ নামায় তিনি পেশা ব্যবসা বলে উল্লেখ করে সেখানে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছেন। যদিও ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এ দিকে, আতাউর রহমান বাচ্চু এমপি নির্বাচিত হবার পরে ক্রমান্বয়ে তার মাঝে অহমিকা ভর করতে থাকে, তার এ আচারণকে পীর সাহেবের সঙ্গে তুলনা করে দলীয় সূত্র বলছে, যে বা যারা এমপি সাহেবের মোসাহেবী করে তারাই তার আস্থা ভাজন, তারাই পছন্দের ; এমপির কাছে অন্যদের বিশেষ মূল্যায়ন নেই। আগামী বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনপ্রিয়তার বিচারে নয় এমপির পছন্দের বিচারে জমায়াতের প্রার্থীতা চুড়ান্ত হতে পারে বলে ধারনা তাদের। সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে গিয়ে এমপি জামায়াত ইসলামীর সাংগঠনিক স্বার্থও ক্ষুন্ন হবার বিষয়টিও কখনো কখনো ভুলে যান বলেও অভিযোগ নেতাকর্মীদের। এ দিকে এমপির নিকট কোনো সমস্য অভিযোগ নিয়ে গেলে মানুষ তেমন সমাধান পায় না, অমীমাংসিত পড়ে থাকে। জামায়াত নেতা সাইফুল আবদারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজী, টাকা পয়সা হাতানোর নানা অভিযোগ এমপির কানে উত্থাপিত হলেও সেসব ব্যাপারে তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এমপির মেয়ের নাম সম্বলিত সরকারি অনুদানের মজ্ঞুরিপত্র প্রকাশ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এমপি আতাউর রহমান বাচ্চু দলমত নির্বিশেষে সবার নিকট সততা ন্যায় নিষ্ঠার প্রতিক হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। লজ্জাজনক এ ঘটনাটি মানুষের সেই আস্হা-বিশ্বাসকে ব্যাপক নাড়া দিয়েছে।

যদিও এমপিকে না জানিয়ে পিএস এমপির মেয়ের নাম তলিকায় ঢুকানোর দায়ে এমপি পিএস আবু সালেহ মোহাম্মদ গোফরানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ বলছে , এমপির ঐচ্ছিক বরাদ্দ থেকে নড়াইল ২ আসনে হত দরিদ্রদের যে তালিকা ভাইরাল হয়েছে সেখানে, ১ ও ৮ নাম্বারে এমপি সাহেবের মেয়ের নাম, ৭ নাম্বারে এমপির ক্যামেরা ম্যানের নাম, ১১ ও ১৭ নাম্বারে এমপির শ্যালোকের দুই মেয়ের নাম, ১২ নাম্বারে এমপির শ্যালকের নাম রয়েছে। সেখানে পিএস’র কোনো আত্বীয়-স্বজনের নাম না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে এমপি সাহেব নিজের দূর্নীতি ঢাকতে পিএস’র ওপর দায় চাপাচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের অর্থ শাখা ২’র সিনিয়র সহকারী সচিব রাখী আহমেদ সাক্ষরিত ১৮ জুনের এক পত্রে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে নড়াইল ২ আসনের এমপির ঐচ্ছিক তহবিলের এক লক্ষ ৮৩ হাজার ৫০০ টাকা নির্বাচনী এলাকার মোট ২১জনের মাঝে বন্টনের জন্য মজ্ঞুরী অনুমোদন দেয়া হয়। ঐ তালিকায় দুই জায়গায় এমপির মেয়ে ফাইজার নামসহ অধিকাংশো আত্বীয়-স্বজনের নাম থাকায় এ নিয়ে সমালোচনা ঝড় ওঠে।

এ ব্যাপারে এমপি মোঃ আতাউর রহমান নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় ব্যাখা দিতে গিয়ে জানান, 'সময় স্বল্পতার কারনে মাত্র এক দিনের মধ্যে সংসদ সচিবালয়ে অনুদান গ্রহিতারদের তালিকা জমা দিতে হয়েছে। তিনি নির্বাচনী এলাকায় ব্যস্ত থাকায় ঢাকা থেকে ব্যক্তিগত সহকারি বিষয়টি জানালে তাকে এলাকা থেকে নাম সংগ্রহ করে জমা দিতে বলেন। পরে এমপির পূর্ব স্বাক্ষরিত প্যাডে ব্যক্তিগত সহকারি তালিকা প্রস্তুত করে জমা দেয়। সেখানে কাদের নাম দেয় এমপি দেখার সুযোগ পাননি বলে জানান।

পরে ফেসবুকে তালিকায় মেয়ের নাম দেখে ব্যক্তিগত সহকারীর কাছে জানতে চাইলে সে জানায়, 'তাড়াহুড়া করে যাচাই বাছাই ছাড়া যার তার নামে বরাদ্দ্য এনে পরে সে যদি অনুদানের প্রকৃত হকদার না হয় তাকে বরাদ্দকৃত টাকা না দেয়া গেলে পরে সমালোচনা হবে এই জন্য আমার পরিবারের সদস্যদের নাম দিয়েছে। অনুদানের অর্থ প্রকৃত যাদের প্রাপ্য ইতিমধ্যেই তালিকা সম্পন্ন হয়েছে তাদের হাতেই অনুদান তুলে দেয়া হবে।'

এ ব্যাপারে, জামায়াত ইসলামীর কেন্দ্রীয় সদস্য, নড়াইল জেলা সাবেক আমীর মাওলানা মীর্জা আশেক এলাহী বলেন, এ বিষয়ে এমপি যে বিবৃতি দিয়েছেন আমার তাতেই আস্থাশীল, তবে কেউ যদি তা না মানতে চায় জোর করে মানানো যাবে না। ঘটনা ঘটলে তার কিছু কৃয়া প্রতিকৃয়া থাকবে, সে ক্ষেত্রে কি আরা করনীয়, তবে এটা ঘোরত্বর কোনো অপরাধ নয়, সময়ে সব স্বাভাবিক হয়ে যাব বলেও ব্যক্তিগত ভাবে মনে করেন জামায়াতের এই প্রবীণ নেতা।

এসব বিষয়ে আতাউর রহমানের (বাচ্চু) বলেন, যারা অতি উৎসাহী হয়ে বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে তারা নিজেরাও মন থেকে বিশ্বাস করে না আমার দ্বারা নিজের মেয়ের নামে অনুদান তুলে ভোগ করা সম্ভব।

নিজের আয়ের উৎস সম্পর্কে তিনি জানান, বিগত দিতে জমি কেনাবেচা ও বিভিন্ন মৌসুমে নানা ফসলের ব্যবসা ছিল। এখন সময়ের অভাবে সে সব ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হয়েছে, বর্তমানে নড়াইল শহরে পাঞ্জাবী হাউজ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছেন। সংগঠন থেকে কখনো কখনে সম্মানী পেয়ে থাকেন বলেও তিনি জানান।

এমপি আরও বলেন, এলাকার উন্নয়নে জনসাধারনকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সবার সঙ্গে সদভাব বজায় রেখে কাজ করে যাচ্ছি। দলের সবাই আমার কাছে সমান গ্রহনযোগ্য, বিশেষ কারো প্রতি সুদৃষ্টির কোনো অবকাশ নেই। কোনো প্রকার অনৈতিক কাজে জড়িত কারোরই আমার কাছে কোনো স্থান নেই।

(আরএম/এসপি/জুলাই ৬, ২০২৬)