রিপন মারমা, কাপ্তাই : রাঙ্গামাটি কাপ্তাই উপজেলার শিলছড়ি এলাকায় সরকারি লিজকৃত জমি জালিয়াতির মাধ্যমে মালিক সেজে ১০ কোটি ৩৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা ঘিরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত ‘স্টারলিং প্লাইউড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান মাহমুদ খানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা।

দুদকের রাঙ্গামাটি সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. রাজু আহমেদের দায়ের করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, শিলছড়ি গ্রামে অবস্থিত স্টারলিং প্লাইউড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের নামে সরকারি জমি লিজ নেওয়ার কোনো বৈধ রেকর্ডপত্র নেই। অথচ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান মাহমুদ খান প্রকৃত তথ্য গোপন করে ও নথিপত্র জালিয়াতি করে নিজেকে ভূমির মালিক দাবি করেন।

২০১৫ সালে আনসার ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প স্থাপনের জন্য ওই এলাকা থেকে ২২ দশমিক ১৭ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে জেলা প্রশাসন ৮ দশমিক ০৯ একর জমির জন্য ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৮ সালের ২ জুলাই হাসান মাহমুদ খান প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ১০ কোটি ৩৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকা সরকারি কোষাগার থেকে উত্তোলন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৫৫-৫৬ সালের দিকে স্টারলিং প্লাইউড ইন্ডাস্ট্রিজ কারখানাটি গঠিত হলেও ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন মালিকরা দেশত্যাগ করেন। এরপর ১৯৮৭ সালে মরহুমা আছিয়া খানম নিজেকে কারখানার মালিক দাবি করে কারখানার জমি ‘শেল অয়েল কোম্পানি’কে সাব-লিজ দিয়ে অবৈধ অর্থ আয় শুরু করেন। পরবর্তীতে ওই জমিতে আনসার ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯১ সালে আছিয়া খানমের মৃত্যুর পর তার পুত্র হাসান মাহমুদ খান কারখানার সব যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ও মালামাল বিক্রি করে দেন এবং কারখানাকে অস্তিত্বহীন করে তোলেন। তবুও তিনি নিজেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিচয় দিয়ে সরকারি ক্ষতিপূরণের অর্থ আত্মসাৎ করেন।

শিলছড়ির বাসিন্দা সাবেক ইউপি সদস্য মিনু মারমা ও স্থানীয় বিএনপি নেতা জাফর আহমদ স্বপন জানান, ওই এলাকায় ১১৪টি ভূমিহীন পরিবার ৪০ থেকে ৬০ বছর ধরে বসবাস করে আসছেন। তাদের বসতভিটা, মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান ও খেলার মাঠসহ নাগরিক সুবিধা রয়েছে। হাসান মাহমুদ খান ভুয়া মালিকানা দাবি করে এসব পরিবারের ওপর উচ্ছেদ আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন।ভুক্তভোগী ১১৪টি পরিবার তাদের বসতভিটা রক্ষার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে জমি বন্দোবস্তের আবেদন করেছেন এবং বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞ আদালতে সিভিল স্যুট চলমান রয়েছে। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি আদালত হাসান মাহমুদ খানের মামলা খারিজের আবেদন নামঞ্জুর করেন। পরবর্তীতে তিনি সিভিল আপিল দায়ের করেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন।

ভুক্তভোগীদের আইনজীবিদের তথ্যমতে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুসন্ধান চালিয়েও স্টারলিং প্লাইউড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মালিকানা সংক্রান্ত কোনো বৈধ দাখিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, যেখানে কারখানাটির কোনো অস্তিত্বই নেই, সেখানে মালিক সেজে সরকারি টাকা হাতিয়ে নেওয়া রাষ্ট্রের সাথে চরম প্রতারণা।এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান মাহমুদ খানের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে ও সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।দুদকের মামলায় দণ্ডবিধির অভিযোগ আনা হয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত হাসান মাহমুদ খানকে কোনো প্রকার সরকারি অর্থ যেন প্রদান করা না হয়। রাষ্ট্র ও জনস্বার্থে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন শিলছড়িবাসী।

(আরএম/এএস/জুলাই ০৭, ২০২৬)