ওয়াজেদুর রহমান কনক


একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটের নাম জলবায়ু পরিবর্তন। এটি কেবল বৈজ্ঞানিক আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ কোনো তত্ত্ব নয়, বরং মানব সভ্যতার বর্তমান ও ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণকারী এক রূঢ় বাস্তবতা। "ক্লাইমেট অ্যাকশন" বা জলবায়ু পদক্ষেপ শব্দবন্ধটি আপাতদৃষ্টিতে একটি বৈশ্বিক কর্মসূচি মনে হলেও, এর গভীরতম ভাবার্থ নিহিত রয়েছে মানুষের বর্তমানের দূরদর্শিতা এবং ভবিষ্যতের নিরাপদ অস্তিত্ব নিশ্চিতকরণের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের মধ্যে। আজকের দিনে নেওয়া প্রতিটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ কীভাবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও টেকসই পৃথিবীর গ্যারান্টি হতে পারে, তা বুঝতে হলে জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব ও এর প্রতিকারের ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিকগুলো বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলো গ্রিনহাউস গ্যাসের অনিয়ন্ত্রিত নির্গমন, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করছে। শিল্প বিপ্লব-পরবর্তী সময় থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা বিগত আট লক্ষ বছরে দেখা যায়নি। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, হিমবাহের গলন এবং চরম আবহাওয়ার ঘনঘটা কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ই ডেকে আনছে না, বরং বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা এবং মানব স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে "ক্লাইমেট অ্যাকশন" বা জলবায়ু রোধে পদক্ষেপ কোনো বিলাসিতা নয়, বরং মানব প্রজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানোর এক অপরিহার্য প্রয়াস।

আজকের পদক্ষেপের প্রথম এবং প্রধান স্তম্ভ হলো জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে দ্রুত সবুজ ও নবায়নযোগ্য শক্তির অর্থনীতিতে রূপান্তর। কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে সৌর, বায়ু এবং জলবিদ্যুতের মতো পরিবেশবান্ধব শক্তির উৎসে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এই রূপান্তর কেবল কার্বন নির্গমনই কমাবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী ও টেকসই শক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্পায়নের যুগের চেয়ে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে বর্তমান দশকেই কার্বন নির্গমন প্রায় অর্ধেক কমিয়ে আনতে হবে। আজকের এই কঠোর ও সাহসী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী ২০৫০ বা ২১০০ সালে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাসযোগ্য থাকবে কি না।

তবে কেবল প্রশমন বা নির্গমন হ্রাসই যথেষ্ট নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, তার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া বা অভিযোজন প্রক্রিয়ার ওপর সমান জোর দিতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ গ্লোবাল সাউথের উপকূলীয় ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লবণাক্ততা-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন, ভাসমান কৃষি, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন আজই করতে হবে। বর্তমানের এই স্থানীয় ও জাতীয় পদক্ষেপগুলো আগামী দিনের কোটি কোটি মানুষকে জলবায়ু উদ্বাস্তু হওয়া থেকে রক্ষা করবে, নিশ্চিত করবে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা।

জলবায়ু পদক্ষেপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো "জলবায়ু ন্যায়বিচার"। ঐতিহাসিকভাবে উন্নত দেশগুলো কার্বন নির্গমনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হলেও, এর খেসারত দিতে হচ্ছে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। তাই আজকের পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম হওয়া উচিত উন্নত দেশগুলো কর্তৃক প্রতিশ্রুত জলবায়ু তহবিল বা ক্লাইমেট ফাইন্যান্সের সঠিক ও সময়োপযোগী বণ্টন। লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল একটি সমতাভিত্তিক বৈশ্বিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা সম্ভব। বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক নেতৃত্বে যদি এই দূরদর্শিতা প্রতিফলিত না হয়, তবে আগামী দিনের বিশ্ব চরম নৈরাজ্য ও সম্পদের যুদ্ধের মুখোমুখি হবে।

একই সাথে, প্রকৃতির নিজস্ব পুনরুদ্ধার ক্ষমতার ওপর আস্থা রেখে প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধানের দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। বনায়ন, ম্যানগ্রোভ বা সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক ঢাল সংরক্ষণ এবং জলাভূমি রক্ষা করার মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবেই বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করা সম্ভব। আজকের দিনে যদি আমরা এই সবুজ ফুসফুসগুলোকে রক্ষা করতে পারি, তবে আগামী দিনের প্রজন্ম একটি বিশুদ্ধ বাতাস ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ পৃথিবী উপহার পাবে।

পরিশেষে বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দূরবর্তী ভবিষ্যৎ নয়, এটি বর্তমানেরই এক চলমান সংকট। আজ আমরা যে নীতি গ্রহণ করব, যে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করব এবং জীবনযাত্রায় যে পরিবর্তন আনব, তারই প্রতিচ্ছবি দেখা যাবে আগামীর পৃথিবীর সুরক্ষায়। বর্তমানের নিষ্ক্রিয়তা আগামী দিনের নিরাপত্তাকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই "ক্লাইমেট অ্যাকশন" হলো বর্তমানের সাথে ভবিষ্যতের সেই অলিখিত চুক্তি, যেখানে আজকের ত্যাগ ও দূরদর্শী পদক্ষেপই নিশ্চিত করবে আগামী দিনের মানব সভ্যতার অস্তিত্ব, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই বহুমাত্রিক সংকটের গভীরতা অনুধাবন করতে হলে এর সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধন এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পরিবেশগত প্রভাবকে আলোচনার কেন্দ্রে আনা জরুরি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কেবল সনাতন পদ্ধতির অভিযোজন বা প্রশমন যথেষ্ট নয়, বরং ডেটা-চালিত প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, নিখুঁত আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং দূর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স ও স্যাটেলাইট ইমেজারির ব্যবহার আজকের দিনের অন্যতম প্রধান বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ। এই প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ গ্রামীণ জনপদে টেকসই কৃষি নিশ্চিত করতে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের জীবন ও জীবিকার আগাম সুরক্ষা বলয় তৈরিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে।

একই সাথে, বর্তমান বিশ্বকে গুরুত্ব দিতে হবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নগরায়নের ওপর। বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনের একটি বিশাল অংশ আসে শহরাঞ্চল থেকে। তাই "গ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার" বা পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ, বহুতল ভবনে ছাদ-কৃষি, এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ-চালিত বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির আওতায় আনা আজ আর কোনো বিকল্প ধারণা নয়, বরং সময়ের দাবি। প্লাস্টিক বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধ করে বৃত্তাকার অর্থনীতি বা "সার্কুলার ইকোনমি" মডেলের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে সম্পদের পুনর্ব্যবহার পরিবেশের ওপর চাপ অনেকাংশে কমিয়ে দেবে।

শিক্ষা ব্যবস্থায় জলবায়ু সাক্ষরতা বা "ক্লাইমেট লিটারেসি" অন্তর্ভুক্ত করা আজকের আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শী পদক্ষেপ। নতুন প্রজন্মকে কেবল তাত্ত্বিক বিজ্ঞান না শিখিয়ে, পরিবেশের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা এবং সবুজ দক্ষতার উন্নয়ন ঘটানো প্রয়োজন, যা আগামী দিনে একটি পরিবেশ-সচেতন নাগরিক সমাজ গড়ে তুলবে। জলবায়ু সংকট কোনো একক রাষ্ট্রের সীমানায় আবদ্ধ নয়, তাই বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতিতে পারস্পরিক কাদা-ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও জ্ঞান ভাগাভাগির সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। আজ আমরা যদি এই সমন্বিত, প্রযুক্তি-নির্ভর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারি, তবেই আগামী দিনের মানব সভ্যতা একটি বাসযোগ্য, নিরাপদ ও ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবীর উত্তরাধিকার লাভ করবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।