ব্র্যাক-লেগো ফাউন্ডেশনের ‘স্প্ল্যাশ’ উদ্যোগ
পাঁচ বছরে বাংলাদেশ ও উগান্ডার ৪ লাখ শিশু পাবে খেলাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ
স্টাফ রিপোর্টার : মানবিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের জন্য নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং খেলাধুলাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। শিশুদের শিক্ষা, মানসিক সুস্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিকাশ নিশ্চিত করতে এসব খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। এর ফলে বাস্তুচ্যুতিসহ নানা সংকটের মধ্যে থেকেও শিশুরা শিখতে পারবে এবং নিজেদের সম্ভাবনাগুলোকে বিকশিত করার সুযোগ পাবে।
ব্র্যাক আয়োজিত সাসটেইনিং প্লে, লার্নিং অ্যান্ড স্কিলস ইন হিউম্যানিটারিয়ান কনটেক্সটস (স্প্ল্যাশ) উদ্যোগের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। আজ সোমবার সকালে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং দ্বিতীয় পর্বের প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (সচিব) ডক্টর মোহাম্মদ জকরিয়া এবং সম্মনিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য দেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে লেগো ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক কর্মসূচির প্রধান ও ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক আলামির বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৪৭ কোটি ৩০ লাখের বেশি শিশু সংঘাত ও মানবিক সংকটপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছে। যেখানে ৫ কোটি ২০ লাখের বেশি শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। এসব অঞ্চলে শিক্ষা, সুরক্ষা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ব্র্যাক ও লেগো ফাউন্ডেশনের পাঁচ বছর মেয়াদি ৫ কোটি মার্কিন ডলারের এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও উগান্ডায় মানবিক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত ৪ লাখ শিশু ও কিশোর-কিশোরীর কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে শিশুদের লালন-পালন ও বিকাশে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ব্র্যাক ও লেগো ফাউন্ডেশনের এই অংশীদারত্ব সব বয়সী শিশুদের খেলাধুলার মাধ্যমে শেখা এবং তাদের সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শিশুদের জন্য বিনিয়োগ করার অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় যত্ন, সহায়তা ও সুযোগ নিশ্চিত করা হলে আগামী দিনে আমরা একটি দায়িত্বশীল, সহনশীল ও নেতৃত্বদানে সক্ষম প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব; যারা দেশকে আরও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নেবে।
দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিতের প্রতি শিশুদের আগ্রহ বাড়াতে খেলার ছলে শেখার পদ্ধতিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার এ ধরনের সফল মডেলগুলোকে নিয়ে ব্র্যাক ও লেগো ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কাজ করতে পারে। পাশাপাশি এই পদ্ধতিগুলোকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেও চালু করা সম্ভব। শিক্ষার এই সামগ্রিক রূপটিকে বড় পরিসরে বাস্তবায়ন করতে পারলে তা কেবল শিশুদেরই উপকার করবে না, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বড় অবদান রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ বলেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সেটি অবশ্যই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চাহিদার ভিত্তিতে এবং তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতে হবে। প্রকল্প ভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিভঙ্গিই লেগো ফাউন্ডেশনের সঙ্গে এই অংশীদারত্বকে অনন্য করে তুলেছে। গত ৫০ বছরে ব্র্যাক এমন সব কার্যকর, ব্যয় সাশ্রয়ী এবং বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়নযোগ্য মডেল তৈরি করেছে, যেগুলো পরে বিভিন্ন অংশীদারের সহযোগিতায় আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো (এনজিও) এখনো এমন সব উদ্ভাবনী মডেল তৈরি করে চলেছে, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে সক্ষম।
আসিফ সালেহ্ আরও বলেন, আমরা এমন এক সময়ে রয়েছি, যখন পারস্পরিক আস্থা, সামাজিক সংহতি ও আশাবাদ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। তাই আমাদের আবারও মৌলিক বিষয়গুলোর দিকে ফিরে যেতে হবে এবং প্রতিটি শিশুর জন্য প্রারম্ভিক বিকাশ, শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যের মাধ্যমে শেখা, বেড়ে ওঠা এবং বিকশিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদের মতো দূরদর্শী পথপ্রদর্শকদের কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অর্থবহ পরিবর্তনের সূচনা হয় আশাবাদ, মহৎ উদ্দেশ্য এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার থেকে। ১৯৭২ সালে আরও অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যদি আমরা মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়ে থাকি, তবে আজও তা সম্ভব। সেই বিশ্বাস থেকেই আমরা আশা করি, স্প্ল্যাশ বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি কার্যকর মডেল হয়ে উঠবে।
সাম্প্রতিক সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (সচিব) ডক্টর মোহাম্মদ জকরিয়া বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিশু ও পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে ‘স্প্ল্যাশ’-এর মতো উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সরকার, এনজিও এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সম্মিলিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শিশুদের সামগ্রিক কল্যাণ এবং দেশের উন্নয়নে বড় অবদান রাখা সম্ভব বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, সবচেয়ে কঠিন মানবিক সংকটকময় পরিস্থিতিতেও কীভাবে সফলভাবে কাজ করা যায়, ‘স্প্ল্যাশ’ আমাদের তা শেখাচ্ছে। এই উদ্যোগে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সফল পরিকল্পনাগুলো সারা দেশে ব্যবহার করা সম্ভব। এর ফলে আরও অনেক বেশি শিশু এসব উদ্যোগের সুফল পাবে।
লেগো ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক কর্মসূচির প্রধান ও ভাইস প্রেসিডেন্ট তারেক আলামি বলেন, ব্র্যাক ও লেগো ফাউন্ডেশনের এই অংশীদারত্ব শিশুদের উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রতি আমাদের যৌথ অঙ্গীকারের প্রতিফলন। আমরা এমন উদ্যোগে বিশ্বাস করি, যা স্থানীয়ভাবে পরিচালিত, পরীক্ষিত এবং দীর্ঘস্থায়ী। আমাদের বিশ্বাস, সরকার, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও উন্নয়ন অংশীদারেরা একসঙ্গে কাজ করলে শিশু ও পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তাগুলো আরও শক্তিশালী হবে। এর মাধ্যমেই দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব। স্প্ল্যাশ উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা এমন অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা অর্জন করতে চাই, যা বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য মানবিক সংকটপূর্ণ অঞ্চলে শিশুদের জন্য আরও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিতে সহায়তা করবে।
উদ্বোধনী অধিবেশনে শিশুদের বিকাশে খেলাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন ব্র্যাক স্বাস্থ্য কর্মসূচি ও মানবিক সংকট ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির ঊর্ধ্বতন পরিচালক ড. মো. আকরামুল ইসলাম। শিশুদের জন্য খেলাধুলাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্বের নানাদিক তুলে ধরেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের (বিআইইডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইরাম মরিয়াম।
ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি, কমিউনিকেশনস অ্যান্ড এনগেজমেন্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন পরিচালক কে এ এম মোর্শেদ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশনে আলোচনা পর্ব সঞ্চালনা করেন। আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ফরিদ আহ্মদ, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হায়দার এবং কক্সবাজারের ফাঁসিয়াখালী ইসলামিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ আক্কাছ। অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য রাখেন ব্র্যাকের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও অভিবাসন কর্মসূচির পরিচালক সাফি রহমান খান।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ব্র্যাক ও লেগো ফাউন্ডেশনের এই অংশীদারিত্বের প্রথম ধাপ ‘স্প্ল্যাশ’ বাংলাদেশে ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে। এ উদ্যোগের আওতায় শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু-কিশোরদের বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে অল্পবয়সী শিশু ও তাদের পরিবারের জন্য শিশুদের চাহিদা বুঝে যত্ন নেওয়া, আশ্রয়শিবিরে ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে খেলাধুলাভিত্তিক প্রারম্ভিক শিক্ষা, শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণে সহায়তা এবং কিশোর-কিশোরীদের জন্য অব্যাহত শিক্ষা, জীবনদক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ, পরামর্শ বা মেন্টরশিপ ও জীবিকায়নের সুযোগ সৃষ্টি। পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা ও সার্বিক বিকাশে অভিভাবক, শিক্ষক এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের ভূমিকা আরও শক্তিশালী করা হবে।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে বক্তব্য রাখেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপা শংকর, সহযোগী পরিচালক ডা. শায়লা ইসলাম, বিআইইডির কর্মসূচি প্রধান সৈয়দা সাজিয়া জামান, শিক্ষা কর্মসূচির কর্মসূচি প্রধান মো. মোয়াজ্জেম হোসেন, ব্র্যাক স্বাস্থ্য কর্মসূচির লিড মেহেদী হাসান, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ, মানবিক সংকট ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির কর্মসূচি সমন্বয়ক ডা. এস এম হাসানুজ্জামান প্রমুখ অনুষ্ঠানের বিভিন্ন অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন। ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এডুকেশন (গ্লোবাল) কর্মসূচির প্রধান ডা. রাফিয়াত রশীদ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন।
এ ছাড়া উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন অংশীজনের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেন।
(পিআর/এসপি/জুলাই ১৩, ২০২৬)
