ওয়াজেদুর রহমান কনক, নীলফামারী : এক টুকরো বাঁশ আর এক মুঠো স্বপ্ন—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে যে জীবনের কঠিনতম বাস্তবতাকে বদলে ফেলা যায়, তার এক জীবন্ত ও অনন্য উদাহরণ নীলফামারীর হাজিমুল ইসলাম। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও যার দিন কাটত চরম অর্থনৈতিক সংকটে এবং পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে অন্যের বাড়িতে বাঁশের সিলিং লাগানোর দিনমজুর খেটে চলত যার জীবন সংগ্রাম, আজ তিনি একজন সফল ও স্বাবলম্বী উদ্যোক্তা। তার হাতের জাদুকরী ছোঁয়ায় প্রাণহীন বাঁশ ও বেত রূপ নিচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক শিল্পকর্মে। পাহাড়ি পর্যটন শহর রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান কিংবা কক্সবাজারের সীমানা পেরিয়ে সেইসব পণ্য এখন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে চলে যাচ্ছে সুদূর ইউরোপের বাজারে। নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ঢেলাপীর এলাকার উত্তর সোনাখুলী ডাঙ্গাপাড়ার বাসিন্দা হাজিমুল নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আজ গড়ে তুলেছেন হস্ত শিল্পের এক কারখানা।

তবে দিনমজুর থেকে সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ পথচলা হাজিমুলের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। তীব্র অর্থনৈতিক অনটন আর উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি হবে কি না—এমন এক চরম অনিশ্চয়তা নিয়ে শুরু হয়েছিল তার এই অন্যরকম পথচলা। অন্যের অধীনে দিনমজুরের কাজ করার সময় থেকেই নিজের স্বাধীন কিছু একটা করার তাগিদ মনে মনে তীব্রভাবে অনুভব করতেন তিনি। একদিন হঠাৎ করেই মাথায় আসে গ্রামীণ চিরচেনা বাঁশ দিয়ে নিত্যনতুন ও শৌখিন জিনিসপত্র তৈরির অভিনব কথা। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ না থাকায় মুশকিল আসান করল হাতের স্মার্টফোনটি। তিনি ইউটিউব ঘেঁটে দিনরাত এক করে বাঁশের পণ্য তৈরির সূক্ষ্ম কৌশল ও আধুনিক নকশা শেখা শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে নিজের বাড়ির পাশের বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কেটে এনে পরম যত্নে তৈরি করেন কয়েকটি পানির মগ এবং সেই মগগুলোর ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের একটি অনলাইন পেজে আপলোড করেন। প্রথম দিকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে অভাবনীয় সাড়া পান তিনি, যার ফলে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

চাহিদা ক্রমাগত বাড়ার সাথে সাথে হাজিমুল তার এই ক্ষুদ্র উদ্যোগকে আরও বড় করার সিদ্ধান্ত নেন এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তোলেন আরিফুল হস্ত শিল্প কারখানা। বর্তমানে তার কারখানায় বাঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে আধুনিক ডিজাইনের মগ, নান্দনিক ট্রে, ল্যাম্পশেড, বাহারি ফুলদানি, ঘর সাজানোর শোপিস সেট, ফল বা সবজি রাখার ঝুড়ি এবং ড্রয়িংরুমের জন্য বাঁশের তৈরি চমৎকার সোফা সেটসহ নানা রকম বৈচিত্র্যময় পণ্য। এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকার ও সাধারণ ক্রেতারা অনলাইনের মাধ্যমে অর্ডার করে সংগ্রহ করছেন। হাজিমুল ইসলাম কেবল নিজেকেই স্বাবলম্বী করেননি, বরং এলাকার আরও ১৫ জন কর্মহীন মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়ে এক অনন্য সামাজিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বর্তমানে তার কারখানায় নিয়মিত কাজ করছেন ১৫ জন নারী ও পুরুষ শ্রমিক, যাদের ঘরে এখন আর আগের মতো অভাবের কালো ছায়া নেই।

কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিক মনোয়ারা বেগম নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন যে আগে ঘরে বসে অলস সময় কাটত এবং সংসারে সারাক্ষণ অভাব লেগেই থাকত, তবে এখন হাজিমুল ভাইয়ের কারখানায় কাজ করে যা আয় করেন তা দিয়ে ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি সংসারেও বড় অবদান রাখতে পারছেন এবং এর ফলে তাদের ভাগ্য বদলে গেছে। আরেক শ্রমিক হেলাল উদ্দিন জানান যে আগে তিনি বাড়িতে বাঁশ দিয়ে দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কিছু পণ্য তৈরি করতেন, কিন্তু বাজারে প্লাস্টিকের পণ্যের আধিপত্য আসার পর থেকে সেভাবে আর বিক্রি না হওয়ায় তার নিজস্ব ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে হাজিমুলের কারখানায় এসে কাজ শুরু করে এখন বেশ ভালোভাবে জীবনযাপন করছেন। একইভাবে শ্রমিক ববিতা রানি রায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন যে তারা গরীব মানুষ হওয়ায় অভাবের সংসার কোনোমতে চলত, তবে এখানে কাজ করে যা পান সেটা দিয়ে সন্তানের পড়ালেখার সাহায্যের পাশাপাশি পরিবারের প্রাত্যহিক খরচে অনেক সাহায্য হচ্ছে।

দিনমজুর থেকে সফল উদ্যোক্তা হওয়া হাজিমুল ইসলাম এখন এই কারখানা থেকে মাসিক প্রায় চল্লিশ হাজার টাকার মতো আয় করছেন এবং শুধু নিজেরই রোজগার নয়, বরং তার হাত ধরে আরও অনেক পরিবারের মুখে হাসি ফুটেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে তারা যারা এখানে কাজ করছেন, তাদের যদি সরকারি উন্নত প্রশিক্ষণসহ সুদমুক্ত ও সহজ শর্তে বড় ঋণের ব্যবস্থা করা যায়, তবে পণ্য উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধির পাশাপাশি আরও বিপুল সংখ্যক দক্ষ জনবল তৈরি করা সম্ভব হবে। উদ্যোক্তাদের এই স্বপ্নপূরণে ইতিবাচক আশার আলো দেখাচ্ছে বিসিক নীলফামারী জেলা কার্যালয়।

বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক মো. নূরেল হক আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন যে তারা সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের পেশাদার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন এবং ইতিমধ্যেই উদ্যোক্তাকে সহায়তা হিসেবে বিনাসুদে এক লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। সেই সাথে ভবিষ্যতে সেখানে কীভাবে আরও সহায়তা করলে এই উদ্যোগ আরও বেশি লাভবান ও প্রসারিত হতে পারে, বিসিকের পক্ষ থেকে সেই সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

(ওকে/এসপি/জুলাই ১৫, ২০২৬)