অ্যাডভোকেট আজিজার রহমান আজু


অবশেষে বহুল কাঙ্খিত সেই দিনটি এলো। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরের শেষদিকে নির্বাচনি জনসভায় যোগ দিতে শতাব্দীর মহানায়ক বঙ্গবন্ধু এলেন পঞ্চগড়। করতোয়া ব্রিজের দক্ষিণ পশ্চিমে নদীপাড়ের উম্মুক্ত বিশাল মাঠে সেদিন তিল ধারণের ঠাঁই ছিলনা। প্রায় পঞ্চাশ হাজার লোক সেদিন জনসভায় উপস্থিত ছিল। সবার ব্যাকুল প্রত্যাশা শেখ মুজিবকে একনজর দেখা। সকাল থেকে মানুষ যে যেভাবে পেরেছে জনসভাস্থলে হাজির হয়েছে। এতো মানুষ একসাথে জীবনে প্রথম দেখা। আমরাও জগদল হাইস্কুল থেকে ঝাঁক বেঁধে এসে জনসভায় যোগ দিয়েছি। মাইকে ক্ষণে ক্ষণে ঘোষণা করা হচ্ছে - ভাইসব আর কিছুক্ষণের মধ্যে বঙ্গবন্ধু এসে  আপনাদের সামনে উপস্থিত হবেন। আপনারা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন কিন্তু এই কিছুক্ষণ আর শেষ হয়না। অবশেষে ধৈর্য অপেক্ষা প্রতীক্ষার চুড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত যখন অপেক্ষমান জনতা। ঠিক তখনই মাইকে ঘোষণা হলো- ভাইসব বঙ্গবন্ধু এসে গেছেন। শুনে শরীরের সমস্ত লোম শিউরে উঠলো। সবাই ঘাড় উঁচু করে তখন বঙ্গবন্ধুকে দেখার জন্য উদগ্রীব। দেখলাম বাঁশ আর কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে উঁচু মঞ্চে উঠছেন বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে আমার প্রথম বঙ্গবন্ধুকে দেখা। সবার চেয়ে লম্বা সৌম্য সুদর্শন ধবধবে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি কালো মুজিব কোর্ট পরিহিত বঙ্গবন্ধু মঞ্চের চারদিকে ঘুরে হাত নেড়ে নেড়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানালেন। মাইকে তখন শ্লোগান উচ্চারিত হচ্ছে- 

'মুজিব ভাই মুজিব ভাই'- 'লালগোলাপ শুভেচ্ছা।'
'তোমার ভাই আমার ভাই'-'মুজিব ভাই মুজিব ভাই।'
'তোমার বন্ধু আমার বন্ধু'- 'বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু।'
'ভোট দিন ভোট দিন' 'নৌকা মার্কায় ভোট দিন।'

-জয় বাংলা। শুরু হলো বৃষ্টি একেবারে মুষলধারে। জনসভার মানুষ সামান্য এদিক সেদিক কিন্তু তিলধারণের ঠাঁই নেই, যেখানে সেখানে বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা পেতে এত মানুষ যাবে কোথায়?
মুহুর্তে অসংখ্য কালো ছাতায় ভরে গেল জনসভা। তাঁর জন্যও একটা ছাতা যোগাড় করা হলো। কে একজন একটা ভাঙা ছাতা তাঁর মাথার উপর মেলে ধরার চেষ্টা করলো কিন্তু চোখের সামনে এত মানুষকে ভিজতে দেখে ছাতার নীচে তিনি দাঁড়ালেন না। এগিয়ে গিয়ে সামনে ডায়াসের উপর থরে থরে সাজানো মাউথ পিচগুলোর উপর মুখ রেখে বললেন- 'ভায়েরা আমার,' মুহূর্তেই পটপট করে বন্ধ হয়ে গেল শত সহস্র ছাতা। জনসভায় তখন পিনপতন নীরবতা। আল্লাহর অপার রহমতে বৃষ্টিও থেমে গেল। অতঃপর তিনি বললেন - 'আমরা পূর্ব বাংলার মানুষ ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগকে ভোট দিয়ে পাকিস্তান কায়েম করেছি। সেই মুসলিম লীগ ২৩ বছরে আমাদের হাড়গোড় সব চুষে খেয়েছে। পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাস আমাদের শোষণ বঞ্চনার ইতিহাস। ২৩ বছরের ইতিহাস আমাদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। তারা পদে পদে আমাদের অধিকার হরণ করেছে। আমরা বাঙালিরা যখনই আমাদের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করেছি । তখনই তারা গুলি চালিয়ে আমাদের দাবায় রাখার চেষ্টা করেছে কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাতে দেবোনা। আমি ছয়দফা দিয়েছি। ছয়দফার ভিত্তিতে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র রচনা করে আমাদের চিরকালের শোষণ বঞ্চনার অবসান ঘটাবো- ইনশাআল্লাহ।'

'ভায়েরা আমার,

একটা কথা মনে রাখবেন, সামনের ভোট আমাদের অধিকার আদায়ের ভোট। সামনের ভোট আমাদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের ভোট। সামনের ভোট মুক্তির ভোট। সে ভোট আপনারা সবাই নৌকায় দেবেন। আমি আপনাদের ভাই। আপনাদের ভোট চাওয়ার অধিকার আমার আছে। আমি আপনাদের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছি। জীবন যৌবনের বারটি বছর কারাগারে কাটিয়েছি। ওরা আমাকে ফাঁসির মঞ্চে তোলার জন্য ষড়যন্ত্র করেছে। আমি কোনদিন বাংলার মানুষের স্বার্থের প্রশ্নে আপোষ করি নাই। ভোটের হক আমার। যে যেখানে আছো সবাই নৌকা মার্কায় ভোট দিও।

আর একটা কথা, আমি সব জায়গায় ভালো কেন্ডিডেট দিতে পারি নাই। আমি একটা করে কলাগাছ দাঁড় করিয়েছি। তোমরা আমার কলার গাছটাকেই ভোট দিও। আমি দাঁড়িয়েছি নৌকায় ভোট দিলে সে ভোট আমি পাবো' - বলেই শেষ করতে চাইলে ছাত্রলীগ নেতা এস এম নুরুল হক ঢাকাইয়া নুরু তাঁর কানে কানে কিছু একটা বললে তিনি ডায়াসে ফিরে গিয়ে পূনরায় বললেন- 'আর হ্যাঁ যারা টাকা দিয়ে ভোট কিনতে চায় তাদের টাকা নেবেন। ওগুলো আমাদেরই টাকা। আমাদের রক্ত ঘাম পানি করা টাকা। যত পারেন টাকা নেন ভোট দেন নৌকায়। জনসভা শেষ। আচ্ছালামুয়ালাইকুম আল্লাহ হাফেজ।'
একটি ভাষণ, একটি কন্ঠ যে হাজার হাজার মানুষকে নিমেষেই উজ্জীবিত করতে পারে সেদিন তা প্রত্যক্ষ করেছিলাম।মাইকে শ্লোগান উঠলো -

'ভোট দিন ভোট দিন' জনতা উত্তর দিল 'নৌকা মার্কায় ভোট দিন।'
'তোমার ভাই আমার ভাই' '-মুজিব ভাই মুজিব ভাই।'
'বঙ্গবন্ধু এগিয়ে চল-আমরা আছি তোমার সাথে।'
'তোমার আমার মার্কা' 'নৌকা মার্কা।'
'বাঙালিরা এক হও'-'নৌকায় ভোট দাও।'
'নৌকায় দিলে ভোট'
'খুশি হবে দেশের লোক।'-জয় বাংলা।

তুমুল ভিড় ঠেলে সেদিনের সে সরু লোহার ব্রিজে চিঁড়াচেপটা হয়ে কেমনে কেমনে বাড়ি এসে পৌঁছেছি, তা মনে নেই। তবে সেদিন রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে চুপিচুপি ঘর থেকে বের হয়ে পরিষদ ভবন,কমিউনিটি সেন্টার,সমবায় অফিস,হাসপাতাল ভবনের যেখানে যত নৌকা ছাড়া অন্য দলের পোস্টার ছিল সব ছিঁড়ে মঙ্গলু চাচার দোকান থেকে আগুন নিয়ে পুড়িয়ে দিলাম। সবগুলো দেয়ালে তখন শুধু একটি দলের পোস্টারই থাকলো বঙ্গবন্ধুর মার্কা,নৌকার মার্কা।

লেখক: সিনিয়র আইনজীবী, পঞ্চগড় জজকোর্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।