ঈশ্বরদী প্রতিনিধি : চেরনোবিল ও ফুকুশিমার মতো অতীতের পারমাণবিক দুর্ঘটনার সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনা প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, রূপপুরে ব্যবহৃত আধুনিক Generation-III+ VVER-1200 প্রযুক্তির নকশায় অতীতের বড় পারমাণবিক দুর্ঘটনা থেকে পাওয়া সব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে কেন্দ্রটির নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বহুস্তরীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে।

তিনি জানান, চেরনোবিল ছিল RBMK এবং ফুকুশিমা ছিল Generation-II BWR প্রযুক্তির রিঅ্যাক্টর। অন্যদিকে রূপপুরে রয়েছে Defence-in-Depth নীতির ভিত্তিতে Double Containment, Core Catcher, Passive Heat Removal System, Emergency Core Cooling System, Hydrogen Recombiner এবং Severe Accident Management-সহ আধুনিক সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এছাড়া প্রতিটি অপারেশনাল ধাপ কঠোর নিয়ন্ত্রক তদারকি, আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন এবং প্রশিক্ষিত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত জনবলের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং কার্যক্রম নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া নানা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত শিল্পপ্রক্রিয়াগুলোর একটি। প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো শুধু যন্ত্রপাতি স্থাপন শেষ হলেই এটি চালু করা যায় না। প্রতিটি সিস্টেম, যন্ত্রপাতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ধাপে ধাপে পরীক্ষা, যাচাই এবং সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা হয়। প্রতিটি পর্যায়ে শত শত গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড (Acceptance Criteria) পূরণ করতে হয় এবং ফলাফল বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি)-এর অনুমোদিত কর্মসূচি অনুযায়ী কমিশনিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি BAERA, VO Safety, CREA, Rostechnadzor এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পর্যালোচনা করছেন। কোনো পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না এলে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর পুনরায় পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। তাই কমিশনিংয়ে সময় লাগা কোনো দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

সম্প্রতি রূপপুর প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন তথ্য, মতামত ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার প্রসঙ্গে এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং প্রযুক্তিগতভাবে সবচেয়ে জটিল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি। এর নিরাপত্তা ও পরিচালন সক্ষমতা শুধু এনপিসিবিএলের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি), বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ), VO Safety, CREA, Rostechnadzor এবং আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর বহুস্তরীয় নিয়ন্ত্রক তদারকি, মূল্যায়ন ও কারিগরি সহযোগিতার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে।

তিনি দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। প্রয়োজনীয় প্রতিটি কমিশনিং পরীক্ষা, নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার পরই কেন্দ্রটি পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হবে।

তিনি আরও বলেন, রূপপুর শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের প্রতীক। এ প্রকল্প সম্পর্কে মতামত গঠনের ক্ষেত্রে যাচাইকৃত তথ্য, বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তথ্যসূত্রের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এনপিসিবিএল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

(এসকেকে/এসপি/জুলাই ১৬, ২০২৬)