রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরা : ধর্মীয় অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরায় জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উদযাপিত হয়েছে।

এ উপলক্ষে সাতক্ষীরা সদরের ঝাউডাঙা জগন্নাথদেবের মন্দিরে বৃহষ্পতিবার সকাল ১০ টা থেকে পবিত্র গীতা, ভাগবৎ পাঠসহ জগন্নাথদেব, সুভদ্রা ও বলরামের জীবনী নিয়ে আলোকপাত করা হয়।

গীতাপাঠ শেষে জয়মহাপ্রভু সেবক সংঘের সাবেক সভাপতি বিশিষ্ঠ ধর্মীয় আলোচক গোষ্ঠ বিহারী মণ্ডল ও সাংবাদিক রঘুনাথ খাঁ বলেন, তারা এমন এক সময়ে জগন্নাথদেবের রথযাত্রা পালন করছেন, যে সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারি ও গাইবান্ধার পলাশবাড়ির রাধাগোবিন্দ ও কালীমন্দিরের সভাপতি এবং ৮১ ফুট লম্বা ভগবান রামচন্দ্রের মুর্তি প্রতিষ্ঠাতা হরিদাস তরোনী দাস বিনা অপরাধে কারাগারে রয়েছেন।

ঝাউডাঙা জগন্নাথ মন্দিরের ৯৬ শতক জমির মধ্যে হাসান তারেক নামের এক ব্যক্তি ভুয়া ডিসিআর দেখিয়ে জোরপূর্বক ট্রাকের কভার দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরির নামে জায়গা দখল করে রেখেছে। সম্প্রতি পরানদহে কানাই সরদার, বিপ্লব সরদারসহ সংখ্যালঘুদের রেকডীয় ও দখলীয় জায়গা জবরদেখলের চেষ্টা অব্যহত রেখেছে জগন্নাথপুরের শুকুর আলী ও তার স্বজনরা। মাগুরা বৌ বাজারে বীথিকা সাধু হত্যা মামলা, পুরাতন সাতক্ষীরা মায়ের বাড়িতে দুঃসাহসিক চুরি, পিসি জুয়েলার্সের বাড়ি, পুরাতন সাতক্ষীরার গোবিন্দ ঘোষের বাড়ি ও সাংবাদিক রামকৃষ্ণ চক্রবর্তীর বাড়ি, সরকারপাড়ার শ্যামল রাহার বাড়িতে দুঃসাহসিক চুরির কোন ক্লু উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। শ্যামনগরে যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরে মায়ের মুকুট চুরির ঘঁনায় পুলিশ মুকুট উদ্ধার ও সিসি ক্যামরায় দেখা যাওয়া চোরকে গ্রেপ্তার করতে না পারলেও বাদি জ্যোতি চট্টোপাধায়ের পরামর্শে মুকুটটি সোনার হলেও তা রোল্ডগোল্ডের বলে তড়িঘড়ি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।

বল্লী মুজিবর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকার, আশাশুনির বাওচাষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নৈশ প্রহরী বিকাশ বাছাড়ের উপর কাল্পনিক অভিযোগ তৈরি করে মব সৃষ্টির মাধ্যমে বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারের চেষ্টা বর্তমান সরকারের ভাবমুর্তিকে খাটো করে দিয়েছে। বিএনপি নেতা পরিচয়ে সোলায়মান কবীরসহ কয়েকজন বিশেষ সুবিধা নিয়ে শ্যামনগরের যশোরেশ্বরী কালীমন্দিরের জায়গা জবরদখল করে প্রধান ফটকে বেলাল হোসেন ও আকবর মোল্লাকে পাকা দোকান ঘর বানাতে সহযোগিতা করা হয়েছে।

এ ছাড়া শ্যামনগরের ভেটখালিতে পশু চিকিৎসক অনিমেষ পরমান্য অপহরণ, মীরগাং এ দীলিপ গাইনের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া মামলা তুলে না নেওয়ায় তার এক ভাইপোকে থানায় তুলে নিয়ে ৩৩ ঘণ্টা পর একটি সাজানো ধর্ষণ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলে পাঠানো, জেলেখালিতে বিষ্টু পরমান্যের জায়গা দখল করে বাড়ি ঘর ভাংচুরের পর জহির গাজীর চলাচলের রাস্তা নির্মাণ, একই গ্রামে কৃষ্ণপদ মণ্ডল ও তার শরীকদের জায়গা দখলে বাধা দেওয়ায় ১০ জনকে কুপিয়ে জখম, কালিগঞ্জের চম্পাফুল কালীবাড়িতে মাধবী মণ্ডলকে দফায় দফায় নির্যাতন করে সামাদ গাজী ও তার ছেলে আলমগীর কবীরের নেতৃত্বে সাত বিঘা জমি দখল করাসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের জায়গা দখলের বিষয়টি তুলে ধরেন তারা। এসব ঘটনায় ন্যয়বিচার বঞ্চিত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মনোবল ভেঙে যাওয়ায় তারা দেশ ছাড়তে পারেন।

এদিকে বিকেল তিনটায় মন্দির প্রাঙ্গনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পবিত্র গীতা পাঠ করেন গোষ্ঠ বিহারী মণ্ডল। ঝাউডাঙা জগন্নাথদেব মন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি সন্তোষ কুমার ঘোষের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সাতক্ষীরা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক সাংসদ বিএনপি নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিব। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম সনৎ কুমার ঘোষ, হিন্দু ধর্মীয় নেতা সন্তোষ পাল, সাংবাদিক রঘুনাথ খাঁ, ঝাউডাঙা ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি রফিকুল ইসলাম, বিএনপি নেতা আতাউর রহমান প্রমুখ।

বক্তারা বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ উল্লেখ করে বলেন, জগন্নাথদেব সকল সৃষ্টির জন্য কাজ করে গেছেন। ১৯৭১ সালে এদেশের মুক্তিযুদ্ধে হিন্দুদের অবদান অস্বীকার করা যাবে না। তাই মুক্তিযুদ্বের চেতনায় বিশ্বাসী সকলকে সংখ্যালঘুদের রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। ঝাউডাঙা জগন্নাথদেবের মন্দিরের কোন জায়গা জবরদখল বরদাস্ত করা হবে না। মন্দিরের ৯৬ শতক জমি কেউ দখল করার চেষ্টা করলে কড়া হাতে তা মোকবিলা করা হবে। পরে ফিতা কেটে শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি হাবিবুল ইসলাম হাবিব। শোভাযাত্রাটি ঝাউডাঙা বাজার সংলগ্ন প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে মন্দির চত্বরে এসে শেষ হয়। পরে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।

এ ছাড়া বৃহষ্পতিবার বিকেলে সাতক্ষীরা মায়ের বাড়িতের জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উপলক্ষে আলোচনা সভা শেষে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়।

এ ছাড়াও সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর, আশাশুনি সদর, কালিগঞ্জের চম্পাফুল কালিবাড়ি, নলতা রথখোলা, শ্যামনগরের কাছড়াহাটি, দেবহাটা সদর ও কলারোয়ার জয়নগর, তালা সদরসহ বিভিন্ন স্থানে যথাযোগ্য মর্যাদায় রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামি ২৪ জুলাই উল্টোরথ অনুষ্ঠিত হবে। ১৬ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন মন্দিরে বিশেষ জগন্নাথদেবের মাহাত্ম পর্যালোচনাসহ বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালিত হবে।

(আরকে/এএস/জুলাই ১৭, ২০২৬)