স্পোর্টস ডেস্ক : বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক জয় শুধু আটলান্টার মাঠেই আলোড়ন তোলেনি, বরং ক্রীড়াঙ্গনের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। মাঠে আবেগঘন উদযাপন দিয়ে শুরু হওয়া এই ঘটনাটি পরে যুক্তরাজ্যের রক্ষণশীল মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।

বিতর্কের সূত্রপাত হয়, যখন ফাইনালে ওঠার আনন্দ উদযাপনের সময় আর্জেন্টিনা দলের কয়েকজন ফুটবলার ‘ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার’ লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করেন। ইংল্যান্ডের বিদায়ের পর এই দৃশ্য ব্রিটিশদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়। বিশেষ করে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সাবেক উপদেষ্টা নাইল গার্ডিনার তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ নিজের সরকারি অ্যাকাউন্টে গার্ডিনার ঘটনাটিকে ‘ব্রিটিশবিরোধী কদর্য প্রদর্শন’ বলে অভিহিত করেন। তিনি আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের আচরণকে ‘তৃতীয় বিশ্বের মানসিকতা’ বলেও মন্তব্য করেন।

আর্জেন্টিনার সংবাদপত্র লা নাসিওন–এর বিস্তারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রভাবশালী এই পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের আর্থিক সুবিধা ও যুক্তরাজ্যে তাদের বসবাসের সুযোগ-সুবিধার প্রসঙ্গ টেনে সরাসরি তাদেরই লক্ষ্য করে সমালোচনা করেন।

গার্ডিনার লেখেন, ‘ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা যে আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা এই ব্রিটিশবিরোধী প্রদর্শনে অংশ নিয়েছে, তাদের সবার যুক্তরাজ্যের কর্মভিসা বাতিল করা উচিত।’ তিনি এ ধরনের রাজনৈতিক বার্তার ক্ষেত্রে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণেরও দাবি জানান।

তার এই বক্তব্যের পর টটেনহ্যাম হটস্পারের ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের লিসান্দ্রো মার্তিনেজ আলোচনায় চলে আসেন। সম্প্রচারের সময় তাদের ওই ব্যানার হাতে দেখা গিয়েছিল।

অভিবাসনসংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি গার্ডিনার ফিফার কাছেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তার দাবি, ফুটবল মাঠে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া ফিফার নিয়মবিরুদ্ধ। তাই আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।

তিনি আরেকটি পোস্টে লেখেন, ‘ফুটবলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ফিফার নিয়মে নিষিদ্ধ। আর্জেন্টিনাকে বহিষ্কার করা উচিত।’

এই মন্তব্য দ্রুতই ব্রিটিশ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইনফোবায়ে ও ইএসপিএন–এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপে মতপ্রকাশের সীমা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

তবে ইউরোপীয় এই বিশ্লেষকের মন্তব্যে বিচলিত হননি আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। বরং তারা ব্যাখ্যা করেছেন কেন এমন বার্তা নিয়ে তারা উদযাপন করেছেন।

লিসান্দ্রো মার্তিনেজ বলেন, ‘আমরা সব সময় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে আমাদের প্রিয় আর্জেন্টিনাকে প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করি। আর্জেন্টিনার মানুষকে আমরা হতাশ করতে পারতাম না।’

মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসও একই সুরে বলেন, ‘ফকল্যান্ড সব সময়ই আর্জেন্টিনার থাকবে। এটি আমাদের ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়, আমরা তা জানি এবং সেটি আমাদের কষ্ট দেয়। আমরা আমাদের দেশের সব মানুষের জন্যই খেলেছি।’

গার্ডিনারের সঙ্গে আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিদের বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার প্রকাশ্য বিতর্ক হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে আর্জেন্টিনার অর্থসচিব ও উপ-অর্থমন্ত্রী পাবলো কির্নোর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার তর্ক হয়। কির্নো এক মতামত নিবন্ধে লিখেছিলেন, দ্বীপগুলোর ওপর আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বের দাবি এখনও সম্পূর্ণ বৈধ।

এদিকে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক চললেও আর্জেন্টিনা শিবিরের পুরো মনোযোগ এখন বিশ্বকাপ ফাইনালের দিকে। আলবিসেলেস্তেরা বিশ্বাস করে, এসব বিতর্ক তাদের জন্য বাড়তি প্রেরণার কাজই করবে। শারীরিক ক্লান্তির পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তা দেখিয়ে তারা এবার জার্সিতে আরেকটি তারকা যোগ করার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে।

(ওএস/এএস/জুলাই ১৭, ২০২৬)