স্টাফ রিপোর্টার : জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং আদেশে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করাই আইনসম্মত ও যথাযথ পদক্ষেপ বলে দাবি করেছে জামায়াতে ইসলামী সমর্থক আইনজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ লইয়ার্স কাউন্সিল।

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি, গণভোট, জুলাই সনদ ও পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায়: বর্তমান বাস্তবতা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তারা এমন দাবি করেন।

বাংলাদেশ লইয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকারের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু প্রমুখ।

তাদের মতে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায় প্রকাশের একমাত্র আইনগত মাধ্যম। গণঅভ্যুত্থানের আইনি দলিল।
বর্তমানে কার্যকর আইন। এই আইন সংশ্লিষ্ট সকলের ওপর বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশের কোনো আদালত এই আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেনি। কারণ এই আইনই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের লিখিত রূপ।

লিখিত বক্তব্যে শিশির মনির বলেন, বর্তমান সংবিধানে সরাসরি গণঅভ্যুত্থানের কোনো বিধান না থাকলেও, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।

তিনি আরও বলেন, যখন নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সরকার পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন জনগণ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমেই তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটায়। এই গণঅভ্যুত্থান থেকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের ম্যান্ডেট লাভ করেছে। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের আলোকে সুপ্রিম কোর্টের উপদেষ্টামূলক এখতিয়ার থাকলেও, কোনো সরকার বৈধ না অবৈধ- এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের নেই। বরং জনগণ যখন তাদের ইচ্ছা প্রকাশের মাধ্যমে কোনো সরকার গঠন করে, সেই ম্যান্ডেটই হয় ওই সরকারের বৈধতার মূল ভিত্তি।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের আইনি ভিত্তি নিয়ে শিশির মনির বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশই ছিল সেই নির্বাচনের একমাত্র আইনি ভিত্তি। এই সনদের মাধ্যমেই রাষ্ট্র সংস্কারের একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ নির্ধারণ করা হয়েছিল।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলো এই সনদের অঙ্গীকার অনুযায়ী সংস্কারের পথে হাঁটতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমনকি দলীয় সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, যা সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন’।

পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহালের রায়ের বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে শিশির মনির বলেন, এই রায়ের ফলে এখন সংবিধান সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পথ সম্পূর্ণ সুগম হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, ফিলিপাইন, গ্রানাডা বা লেসোথোর মতো দেশগুলোতেও গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের ইচ্ছাই ছিল সর্বোচ্চ বিচারক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আদালত গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা নিয়ে বিচার করার পরিবর্তে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকেই প্রাধান্য দিয়েছে। তাই এটি এখন দেশের কার্যকর আইন এবং সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য তা পালন করা বাধ্যতামূলক।

শিশির মনির আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধনী অধ্যাদেশসহ সংস্কারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। অথচ সরকার পুনরায় এগুলো প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে কোনো আইনের বৈধতা বা অবৈধতা নির্ধারণ করা আইনের শাসনের পরিপন্থী। কোনো আইন অসাংবিধানিক কি না, তা নির্ধারণ করার একমাত্র এখতিয়ার উচ্চ আদালতের।

১৬ বছরের একনায়কতান্ত্রিক শাসন ও বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে ছাত্র-জনতা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তা বাস্তবায়নে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি। শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ ও ফায়াজসহ ১৪ শত শহীদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় জুলাই জাতীয় সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নই একমাত্র পথ, বলেন শিশির মনির।

(ওএস/এএস/জুলাই ১৭, ২০২৬)