রূপক মুখার্জি, নড়াইল : মহান মুক্তিযুদ্ধে সর্বোচ্চ বীরত্বের স্বীকৃতি পাওয়া ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য দেশের বিভিন্ন জেলায় গড়ে তোলা হয়েছে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বীরশ্রেষ্ঠদের আত্মত্যাগ তুলে ধরার উদ্দেশে প্রতিষ্ঠানগুলো গড়া হয়েছিল। 

নড়াইল সদর উপজেলার মহিষখোলা (বর্তমান নূর মোহাম্মদ নগর) গ্রামে স্থাপন করা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। এটি নূর মোহাম্মদ শেখের জন্মস্থান।

নড়াইল জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে ৬৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রতিষ্ঠানটিতে বীরশ্রেষ্ঠের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ছাড়াও রয়েছে প্রায় ৬ হাজার বই। ২০০৮ সালের ১৮ মার্চ উদ্বোধন করা হয় এই প্রতিষ্ঠানটি।

সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শনকালে প্রতিষ্ঠানটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।

এ সময় বাইরে থেকে দেখা যায়, কয়েকটি জানালার কাচ ভাঙা পড়ে আছে। আশপাশে কেউ নেই। এরপর গ্রন্থাগারের কেয়ারটেকার ইউনুস শেখের মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে তাকে ফোন দিলে তিনি জানান, দাপ্তরিক কাজে তিনি নড়াইল জেলা পরিষদে গেছেন। এ কারণে গ্রন্থাগারটি বন্ধ আছে।

এ সময় এলাকার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বীরশ্রেষ্ঠের স্মরণে ও এলাকাবাসীর জ্ঞানের প্রসার ঘটানোর লক্ষ্যে কোটি টাকা খরচ করে গ্রন্থাগার ও জাদুঘরটি নির্মাণ করে হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। জনবল সংকটে মাঝে-মধ্যে এটি বন্ধ থাকে।

দূরদূরান্ত থেকে অনেক অতিথিরা এসেও ফিরে যান কখনো কখনো। এ ছাড়া লাইব্রেরিতে ছয় হাজার বই থাকা সত্ত্বেও লাইব্রেরিয়ানের অভাবে এর সুষ্ঠু ব্যবহার হচ্ছে না।

পরে জেলা পরিষদের গিয়ে আবার কথা হয় কেয়ারটেকার ইউনুস শেখের সঙ্গে। তিনি বলেন, মাঝে-মধ্যে লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ দেওয়া হলেও তারা থাকেন না।

প্রতিষ্ঠানের শুরু থেকেই তিনি এখানে কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করছেন। পুরো প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে তিনি একাই কর্মরত। এর ফলে দাপ্তরিক কোনো কাজকর্মে তিনি বাইরে থাকলে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ পড়ে থাকে। এ ছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় অনেক মানুষের সমাগম হয়, সে সময় একার পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন হয়।

তিনি আরও বলেন, ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করার ফলে ভবন, বই ও আলমারিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেখান একজন করে লাইব্রেরিয়ান, আয়া ও প্রহরী নিয়োগ দিলে ভালো হয়।

এ ব্যাপারে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আছাদুজ্জামান বলেন, প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করা হয়েছে এবং এখানকার নানা সমস্যার বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নড়াইলের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম বলেন, ' বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখ গ্রন্হাগার ও যাদুঘর জেলার একটি গর্বিত এবং অহংকারী প্রতিষ্ঠান। এটির নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের জন্য যে জনবল প্রয়োজন, তা আপাতত: নেই। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের লক্ষে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ হলেই সেখানে কাজ করা হবে। '

উল্লেখ্য, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী নড়াইলের মহিষখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ আমানত শেখ ও মায়ের নাম জেন্নাতুন্নেসা। ১৯৫৯ সালের ১৪ মার্চ তিনি পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআর এ যোগদান করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি ৮ নং সেক্টরে যোগদান করেন এবং যশোরের শার্শা উপজেলার কাশীপুর সীমান্তে ৫ সেপ্টেম্বর সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন এবং পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নূর মোহাম্মদ শেখকে 'বীরশ্রেষ্ঠ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

(আরএম/এসপি/জুলাই ১৮, ২০২৬)