বিকাশ স্বর্ণকার, বগুড়া : ব্রিটিশ আমলে নির্মিত প্রায় দেড়'শ বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে বগুড়ার সান্তাহার রেলওয়ে জংশনের দাপ্তরিক কার্যক্রম। ভবনগুলোর আয়ুষ্কাল অনেক আগেই শেষ হলেও এখনো সেগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়নি। ফলে প্রতিদিন প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় শতাধিক রেল কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রেলওয়ে থানার পুলিশ সদস্য। যেকোনো সময় ভবন ধসে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার রেলওয়ে স্টেশন ১৮৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় শুধু ব্রডগেজ রেললাইন ছিল। পরে ১৯০০ সালে সান্তাহার থেকে ফুলছড়ি পর্যন্ত মিটারগেজ রেললাইন নির্মাণ করা হয় এবং ১৯০১ সালে ওই রেলপথ চালু হলে সান্তাহার স্টেশন জংশনে পরিণত হয়। সে সময় রড-সিমেন্টের ব্যবহার না থাকায় স্টেশনের ভবনগুলো চুন-সুরকি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। দীর্ঘ দেড় শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও ভবনগুলোর বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ও সীমানা প্রাচীর সংস্কার করা হলেও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে। বর্তমানে স্টেশন মাস্টারের কার্যালয়, সহকারী স্টেশন মাস্টারের কার্যালয়, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির বিশ্রামাগার, মালামাল সংরক্ষণের গুদাম, রেলওয়ে থানা এবং দুটি খাবার হোটেল—সবই ওই পুরোনো চুন-সুরকির ভবনে পরিচালিত হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনের বিভিন্ন স্থানে দেয়ালে ফাটল, পলেস্তারা খসে পড়া এবং ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার ঘটনা নিয়মিত। সম্প্রতি রেলওয়ের প্রকৌশল (কার্য) বিভাগ কয়েকটি ভবনের ছাদে নামমাত্র সংস্কার করলেও তাতে অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। বর্ষা মৌসুমে অনেক কক্ষেই পানি পড়ে, যা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের পরিবেশকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

সান্তাহার রেলওয়ে জংশনের স্টেশন মাস্টার খাতিজা খাতুন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভবনে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও যাত্রী সবার নিরাপত্তাই হুমকির মুখে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানে দাপ্তরিক কাজ করতে হচ্ছে। ভবন ধসে পড়লে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

সান্তাহার নাগরিক কমিটির অন্যতম সদস্য ও সাবেক অধ্যাপক রবিউল ইসলাম বলেন, স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ও সীমানা প্রাচীর সংস্কারের আগে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন ছিল। দ্রুত আধুনিক ও নিরাপদ ভবন নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

সান্তাহার রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (কার্য) আব্দুর রহমান জানান, সরকার দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জংশন স্টেশনকে আইকনিক স্টেশনে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে এবং সান্তাহার জংশনও সেই তালিকায় রয়েছে। তবে এ-সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র এখনো তাদের দপ্তরে পৌঁছায়নি। নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকায় পুরোনো ভবনগুলোতে বড় ধরনের সংস্কারও করা হচ্ছে না।

এ বিষয়ে বগুড়া- ৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মহিত তালুকদার বলেন, সরকার সান্তাহার স্টেশনের পুরোনো ভবন ভেঙে আধুনিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যেই দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধান হবে।

স্থানীয়দের দাবি, উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশন সান্তাহারে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী যাতায়াত করেন। তাই যাত্রী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো দ্রুত অপসারণ করে আধুনিক, নিরাপদ ও যুগোপযোগী রেল ভবন নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

(বিএস/এসপি/জুলাই ২০, ২০২৬)