ভারসাম্যের বাইরে: পর্ব- ২
বন্দর নয়, মানদণ্ড গড়ার সময় এখন বাংলাদেশের
মো. ইমদাদুল হক সোহাগ
একটি বন্দর গড়া যায় কংক্রিট, ইস্পাত, ক্রেন ও বিপুল বিনিয়োগ দিয়ে। কিন্তু সামুদ্রিক প্রভাব জন্ম নেয় ভিন্ন এক ভিত্তির ওপর, যেখানে প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও আস্থাযোগ্য মানদণ্ড প্রধান ভূমিকা রাখে। অবকাঠামো জাহাজকে বন্দরে টানে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত গুরুত্ব দেয় বিশ্বাসযোগ্য শাসনব্যবস্থা।
বাংলাদেশ আজ তার সামুদ্রিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বঙ্গোপসাগর আর শুধু ভৌগোলিক সীমারেখা নয়; এটি দেশের বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, ডিজিটাল সংযোগ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই প্রশ্নটি আর এ নয় যে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আসল প্রশ্ন হলো, এই ভৌগোলিক সুবিধাকে বাংলাদেশ কতটা কার্যকরভাবে দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত প্রভাব ও আঞ্চলিক নেতৃত্বে রূপ দিতে পারে।
এই রূপান্তরের জন্য চিন্তায় মৌলিক পরিবর্তন দরকার। এখন আর শুধু নতুন বন্দর নির্মাণের প্রতিযোগিতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক সহযোগিতার ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। মাতারবাড়ী, চট্টগ্রাম, মোংলা কিংবা পায়রা বন্দরের প্রকৃত গুরুত্ব নির্ধারিত হবে সেখানে কত বড় জাহাজ ভিড়তে পারে, তা দিয়ে নয়; বরং কতটা স্বচ্ছ নিয়ম, পূর্বানুমেয় কার্যক্রম ও নির্ভরযোগ্য প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সেবা দেওয়া যায়, তার ওপর। সক্ষমতা বাণিজ্যকে আকৃষ্ট করে, কিন্তু ধারাবাহিকতা আস্থা তৈরি করে। আর সেই আস্থাই শেষ পর্যন্ত কৌশলগত প্রভাবের ভিত্তি।
এই বাস্তবতায় মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের জন্য এক বিশেষ সুযোগ। এটিকে কেবল আরেকটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এমন একটি আধুনিক সামুদ্রিক ও লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে, যা পুরো বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে। গভীর সমুদ্রবন্দর বড় জাহাজ গ্রহণ, পণ্য পরিবহন সহজ করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সক্ষমতা বাড়াবে ঠিকই, কিন্তু এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করবে নির্মাণ-পরবর্তী শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা। অবকাঠামো অপরিহার্য; শেষ পর্যন্ত নির্ধারক শক্তি হলো প্রতিষ্ঠান।
তাই মূল প্রশ্নগুলো প্রকৌশলগত নয়, প্রশাসনিক। বন্দরে পণ্য কত দ্রুত খালাস হবে? শুল্ক ও ফি কতটা স্বচ্ছ হবে? বাণিজ্যিক তথ্য সাইবার ঝুঁকি থেকে কতটা সুরক্ষিত থাকবে? বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে? তেল ছড়িয়ে পড়া, সাইবার হামলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সংকটের সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কত দ্রুত ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারবে? এসব কোনো আনুষ্ঠানিক খুঁটিনাটি নয়; এগুলোই একটি দেশের সামুদ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি।
বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত, মাতারবাড়ীকে শুধু গভীর সমুদ্রবন্দর নয়, বরং বঙ্গোপসাগরের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক সামুদ্রিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলা। এই বিশ্বাস এক দিনে তৈরি হয় না। স্বচ্ছ নিয়ম, পূর্বানুমেয় প্রক্রিয়া, কার্যকর পরিবেশগত সুরক্ষা এবং শুল্ক কর্তৃপক্ষ, নিরাপত্তা সংস্থা, বেসরকারি অপারেটর ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের দক্ষ সমন্বয়ই সেই আস্থা গড়ে তোলে। সামুদ্রিক সুনাম বক্তৃতায় নয়, ধারাবাহিক কর্মদক্ষতার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়।
এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের কিয়াউকপিউ বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। চীনের জন্য এটি কেবল একটি বন্দর নয়; বরং ভারত মহাসাগরে বিকল্প প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর বৃহত্তর কৌশলের অংশ। অর্থাৎ, একটি বন্দর কখনো কখনো বৃহৎ ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনারও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের পথ অবশ্য ভিন্ন হওয়া উচিত। অন্য কোনো শক্তির কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে ওঠার বদলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে নির্ভরযোগ্য সামুদ্রিক সুশাসন। যদি দেশটি স্বচ্ছ নিয়ম, দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং আস্থাভিত্তিক বাণিজ্যিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে, তবে সেটিই হবে তার প্রকৃত কৌশলগত সুবিধা।
মাতারবাড়ীকে ঘিরে বাংলাদেশের এই দৃষ্টিভঙ্গি আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে। ইতিমধ্যে বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সামুদ্রিক পরিবহন সহযোগিতা নিয়ে চুক্তি কার্যকর হওয়ার পথে এগোচ্ছে। ফলে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে সংযোগ, বাণিজ্য ও সমন্বিত নীতির নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ চাইলে একটি বে অব বেঙ্গল মেরিটাইম স্ট্যান্ডার্ডস ইনিশিয়েটিভ বা বঙ্গোপসাগর সামুদ্রিক মানদণ্ড উদ্যোগের সূচনা করতে পারে।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য হবে আঞ্চলিক বন্দরগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় সহজ করা, ডিজিটাল কার্গো ব্যবস্থাকে পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত করা, শুল্ক কার্যক্রমে সমন্বিত ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, উপকূলীয় নৌপরিবহনের অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন, বন্দরগুলোর সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা, তেল দূষণ মোকাবিলায় যৌথ প্রস্তুতি গড়ে তোলা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণে অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা।
তবে এ ধরনের উদ্যোগ বড় বড় ঘোষণা দিয়ে শুরু করার প্রয়োজন নেই। সীমিত পরিসরে কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপই ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। যেমন, বন্দরে জাহাজ আগমনের তথ্য বিনিময়ের অভিন্ন পদ্ধতি, বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনের জন্য একীভূত রিপোর্টিং ব্যবস্থা, জরুরি পরিস্থিতিতে সমন্বিত যোগাযোগ কাঠামো, সাইবার নিরাপত্তার ন্যূনতম মানদণ্ড এবং উপকূলীয় দুর্ঘটনা মোকাবিলার অভিন্ন নির্দেশিকা। এসব পদক্ষেপ হয়তো শিরোনাম হয় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলোই আঞ্চলিক সহযোগিতার স্থায়ী সংস্কৃতি গড়ে তোলে। সামুদ্রিক ক্ষেত্রে আস্থা গড়ে ওঠে প্রতিদিনের দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে, আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে নয়।
এ ধরনের নেতৃত্বের ধরনও আলাদা। বড় শক্তিগুলো সাধারণত সামরিক ঘাঁটি, সমুদ্রপথ কিংবা কৌশলগত প্রবেশাধিকার নিয়ে প্রতিযোগিতা করে। কিন্তু মধ্যম শক্তির দেশগুলো প্রভাব বিস্তার করে আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য করে তোলার মাধ্যমে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এ ক্ষেত্রে অনন্য। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল, নদীনির্ভর অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের মধ্যবর্তী অবস্থান দেশটিকে স্বাভাবিকভাবেই একটি সংযোগকেন্দ্রে পরিণত করেছে। এই অবস্থানকে কৌশলগত শক্তিতে রূপ দিতে হলে আধিপত্য নয়, বরং নিয়মভিত্তিক সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। উন্নত অবকাঠামো থাকলেও যদি কার্যকর শাসনব্যবস্থা না থাকে, তাহলে বিলম্ব, অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ব্যয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। দুর্বল নিয়ন্ত্রক কাঠামো বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমায়, বীমা ব্যয় বাড়ায় এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। অন্যদিকে স্বচ্ছ নীতিমালা, দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং নির্ভরযোগ্য পরিচালন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করে, সরবরাহব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। আজকের ইন্দো-প্যাসিফিক বাস্তবতায় নির্ভরযোগ্যতাই এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কেবল নতুন বন্দর নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দেশের সামুদ্রিক শাসনব্যবস্থার ভেতরে আরও কার্যকর সমন্বয়। বন্দর কর্তৃপক্ষ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক বিভাগ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, মৎস্য অধিদপ্তর, আবহাওয়া অধিদপ্তর, ডিজিটাল নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনকে একটি সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা ও সুস্পষ্ট দায়িত্ব কাঠামোর অধীনে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের অনেক সক্ষমতা আজও সম্পদের অভাবে নয়, বরং বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত, দুর্বল সমন্বয় ও খণ্ডিত বাস্তবায়নের কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না। সামুদ্রিক শাসনব্যবস্থাও এর ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশের সামুদ্রিক ভবিষ্যৎ তাই কেবল বন্দরে কতটি জাহাজ ভিড়ল কিংবা কত টন পণ্য ওঠানামা করল, সেই পরিসংখ্যান দিয়ে নির্ধারিত হবে না। প্রকৃত মূল্যায়ন হবে সেই জাহাজগুলো কী ধরনের নীতিমালা, কতটা দক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং কতটা নির্ভরযোগ্য পরিচালন কাঠামোর মুখোমুখি হচ্ছে, তার ওপর। যে রাষ্ট্র ভৌগোলিক সুবিধার সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষের সমন্বয় ঘটাতে পারে, ভবিষ্যতের বঙ্গোপসাগর মূলত তার পক্ষেই কাজ করবে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একটি বিরল কৌশলগত সম্পদ। কিন্তু ভূগোল নিজে কখনো শক্তি নয়; শক্তিতে পরিণত হয় তখনই, যখন তাকে দক্ষ প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ শাসন এবং দূরদর্শী নীতির মাধ্যমে কাজে লাগানো যায়। আমাদের সামনে এখন সেই সুযোগ রয়েছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু নতুন বন্দর নির্মাণেই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি এমন একটি সামুদ্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলব, যা আঞ্চলিক আস্থা, সহযোগিতা ও নেতৃত্বের নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে?
বঙ্গোপসাগরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে শুধু গভীর সমুদ্রবন্দর নয়, বরং সেই বন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান, নিয়ম, জবাবদিহি ও বিশ্বাসযোগ্যতা। দীর্ঘমেয়াদে সামুদ্রিক প্রভাব তাদের হাতেই থাকবে, যারা সবচেয়ে বড় বন্দর নির্মাণ করবে বলে নয়; বরং যারা এমন নিয়ম ও মানদণ্ড গড়ে তুলবে, যার ওপর অন্য রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদার এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা নির্ভয়ে আস্থা রাখতে পারবে। বাংলাদেশের জন্য এটাই হতে পারে আগামী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক কৌশল।
লেখক : ভূরাজনীতি বিশ্লেষক ও নীতিবিষয়ক কলাম লেখক।
