লতিফা নিলুফার পাপড়ি


আমার জন্ম একটি মুসলিম পরিবারে। ইসলাম আমার ধর্ম। শৈশব থেকেই আজানের ধ্বনি শুনে ফজরের নামাজ আদায় করতে শিখেছি। সেটিই ছিল আমার ধর্মীয় শিক্ষা, আমার বিশ্বাসের ভিত্তি। কিন্তু আমার বেড়ে ওঠা কেবল একটি ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

সন্ধ্যা নামলেই পাশের বাড়ির নমিতা পিসিদের উঠোন থেকে ভেসে আসত শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনি। বাড়ির মেয়ে-বউরা প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনায় বসতেন। ঠিক সেই সময় আমরা মাগরিবের নামাজ আদায় করতাম। দাদা বলতেন, 'ওটা তাদের প্রার্থনার সময়। অন্যের উপসনাকেও সম্মান করতে হয়'। এই একটি বাক্যের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল আমার মানবিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় পাঠ।

আমরা ভাইবোনেরা একসঙ্গে বসে কোরআনের সূরা-আয়াত মুখস্থ করতাম। একই সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই কাজী নজরুল ইসলামের অসংখ্য গান আমাদের মুখস্থ হয়ে যেত। নানার বাড়ির প্রতিটি ঘর ছিল বইয়ে ভরা। বই, গান, ধর্মীয় শিক্ষা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ; এসবের সমন্বয়েই আমাদের শৈশব গড়ে উঠেছিল।সেখান থেকেই শিখেছি, নিজের ধর্মে বিশ্বাসই ঈমান, কিন্তু অন্যের ধর্মকে সম্মান করাও সভ্যতার পরিচয়। নিজের বিশ্বাসকে ভালোবাসতে হলে অন্যের বিশ্বাসকে ঘৃণা করতে হয় না।

আমার জন্ম এমন এক পরিবারে, যেখানে জাত, বর্ণ কিংবা ধর্মের বিভাজনের চেয়ে মানুষ হওয়াটাই বড় ছিল। আম্মা চাকরি করতেন বিকেজিসি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে, আব্বা বৃন্দাবন কলেজে। বহু বছর পরে আম্মা একদিন বলেছিলেন, 'বিকেজিসি' নামটির অর্থ 'বাসন্তী কুমারী গোপাল চন্দ্র'। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামের মধ্যেও যে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির স্মৃতি লুকিয়ে থাকতে পারে, তখনই প্রথম গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলাম।

সংক্রান্তির সময় আম্মার হিন্দু সহকর্মীদের বাড়িতে গিয়ে পিঠাপুলি, নাড়ু, লুচি, আলুর দম, সন্দেশ খাওয়া ছিল আমাদের কাছে উৎসবেরই অংশ। আম্মার মুখে শুনেছি, তাঁর সহকর্মী লিপি মাসি প্রতিদিন ভালোবাসা দিয়ে তাঁর চুল বেঁধে দিতেন। তাঁদের সন্তানের নাম ছিল পাপড়ি, পরাগ, কলি। তখন এসব ছিল একেবারেই স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ। ধর্ম মানুষকে আলাদা করেনি; বরং প্রতিবেশীকে আপনজন বানিয়েছিল। আজ ফিরে তাকালে প্রশ্ন জাগে; এই সহজ, স্বাভাবিক সম্পর্কগুলো কোথায় হারিয়ে গেল?

কাবেরীদি, তোমাদের কথা আজও মনে পড়ে। কেন তোমরা একদিন রাতের অন্ধকারে ভারত চলে গেলে? আমরা তো পাশাপাশি বসবাস করতাম। তোমাদের বাড়ির নাম ছিল ‘সুধাময়ী’। পরে সেটির নাম বদলে গেল ‘খাঁন মঞ্জিল’। ইতিহাস কখনো শুধু বাড়ির নাম বদলায় না; বদলে দেয় মানুষের স্মৃতি, শৈশব, সম্পর্ক এবং বিশ্বাস। এই অভিজ্ঞতা শুধু একটি পরিবারের নয়। উপমহাদেশের ইতিহাসে এমন অসংখ্য কাবেরী, অসংখ্য কাদের, অসংখ্য দিলীপ দাসের গল্প ছড়িয়ে আছে। দেশভাগ, দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা; সবকিছুর সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ। আজও সেই ইতিহাস যেন আমাদের তাড়া করে বেড়ায়।

আজ যখন দেখি ধর্মের নামে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে, মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে, তখন গভীরভাবে ব্যথিত হই। মনে হয়, বিপন্ন হচ্ছে কেবল একটি সম্প্রদায় নয়; বিপন্ন হচ্ছে আমাদের মানবিক অস্তিত্ব। আমরা প্রায়ই উচ্চারণ করি; সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। কিন্তু বাস্তবে কি আমরা এই কথাটি ধারণ করতে পেরেছি?

বাংলাদেশে যখন কোনো হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ হামলা, লুটপাট কিংবা নির্যাতনের শিকার হন, তখন আহত হয় মানবতা। আবার ভারতে যখন মুসলমান কিংবা অন্য কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বৈষম্য, সহিংসতা বা ঘৃণার শিকার হন, তখনও পরাজিত হয় মানবতাই। মানবাধিকারের ভাষা কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা সংখ্যালঘুর ভাষা হতে পারে না। ন্যায়বিচারেরও কোনো ধর্ম নেই।

যে অন্যায় হিন্দুর বিরুদ্ধে, তার প্রতিবাদ যেমন প্রয়োজন, তেমনি যে অন্যায় মুসলমানের বিরুদ্ধে, তার বিরুদ্ধেও একই নৈতিক দৃঢ়তায় দাঁড়াতে হবে। অন্যায়কে ধর্ম দিয়ে মাপা শুরু করলে ন্যায়বিচার আর ন্যায় থাকে না; তা কেবল পক্ষপাত হয়ে ওঠে।ঘৃণার কোনো ধর্ম নেই। সহিংসতারও কোনো ধর্ম নেই।মানুষের রক্তের রং এক। মানুষের কান্নার ভাষাও এক। কেটে দিলে হিন্দুর শরীর থেকে যে রক্ত বের হয়, মুসলমানের শরীর থেকেও সেই একই রক্ত ঝরে। মৃত্যুর পরে মানুষের দেহেরও কোনো ধর্ম থাকে না। থেকে যায় কেবল স্মৃতি, কর্ম আর ইতিহাস। তবু আমরা কেন বারবার একই ভুল করি? কেন রাজনীতির বিভাজন, ক্ষমতার লোভ কিংবা কুটিল স্বার্থের কাছে মানবিকতা পরাজিত হয়? কেন প্রতিটি দাঙ্গার পরে আমরা নতুন করে শিখি যে শেষ পর্যন্ত হার মানে মানুষই?

ইতিহাসের পাতা খুললেই দেখা যায়; সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বিজয়ী কেউ হয় না। জ্বলে ওঠে মানুষের ঘর, ভেঙে যায় সম্পর্ক, অনাথ হয় শিশু, শূন্য হয় মায়ের কোল। লাভবান হয় কেবল সেই শক্তিগুলো, যারা মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট ধর্ম নয়; সংকট মানবিকতার।

জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আর উন্নয়নের এই সময়েও আমরা যদি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে না শিখি, তবে আমাদের সভ্যতার অগ্রগতি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমরা হয়তো আরও আধুনিক হব, আরও ধনী হব, আরও শক্তিশালী হব; কিন্তু মানবিক না হলে সেই উন্নয়নের কোনো অর্থ থাকবে না।

আমি এখনও বিশ্বাস করি, এই বাংলার মাটি সম্প্রীতির মাটি। এই মাটিতে বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতি, বহু ভাষার মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী পাশাপাশি বসবাস করেছে। সেই ঐতিহ্য এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। হারিয়ে যায়নি মানুষের ভেতরের ভালোবাসাও। প্রয়োজন কেবল ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস।

কারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিচয় হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান নয়; আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা মানুষ। আর সেই কারণেই আজও বিশ্বাস করি; মানুষের আগে মানুষ। আর সত্যিই; 'সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।

লেখক: পেশায় শিক্ষক, লেখালেখি করেন।