কালিগঞ্জে জোড়া খুন
ফারজানার দাফন সম্পন্ন হলেও সুমাইয়ার লাশ এখনো মর্গে
রঘুনাথ খাঁ,সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা এক স্কুল ছাত্রী ও এক ঝালমুড়ি বিক্রেতার মৃত্যুর ঘটনায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। গতকাল মঙ্গলবার ফারজানা সুলতানার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হলেও সুমাইয়া আক্তারের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। সুমাইয়া আক্তারের স্বজনরা লাশ দাফন কালে পাল্টা হামলার আশঙ্কায় হাসপাতালের মর্গ থেকে বুধবার বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত লাশ নিয়ে আসতে পারিনি।
আজ বুধবার বিকেলে কাজলা কাশিবাটি এলাকায় যেয়ে জানা গেছে,কাজলা কাশিবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ফারজানা সুলতানাকে স্কুলের সামনের ঝাল মুড়ি বিক্রেতা সুমাইয়া আক্তার সোমবার সকালে স্কুল থেকে ডেকে বাড়িতে নিয়ে যায়। ফারজানাকে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে তার হাত পা বেঁধে কানের সোনার দুল ছিনিয়ে নেয় সুমাইয়া আক্তার। পরে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ আলমারির ড্রয়ারে লুকিয়ে রেখে বাড়ি থেকে চলে যায়। মাইকিং করে খোঁজাখুঁজির পর সোমবার বার বিকেলে ফারজানা সুলতানার লাশ সুমাইয়ার আলমারির মধ্যে আছে মর্মে স্থানীয়রা নিশ্চিত হয়। পরে মোবাইল ফোনে বাড়িতে ডেকে আনা হয় সুমাইয়াকে। বিকেল সোয়া ছয়টার দিকে ফারজানার লাশ আলমারি থেকে উদ্ধার হওয়ার পর সুমাইয়াকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ইট দিয়ে থেঁতলে ও পিটিয়ে হত্যা করে ক্ষুব্ধ জনতা।এ সময়ে সুমাইয়া আক্তারের বাড়ি ঘর ভাঙচুর করে অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাত ৯ টার পর দুটি লাশ পুলিশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। রাতে পুলিশের উদ্ধতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। মঙ্গলবার বিকেলে সদর হাসপাতালের মর্গে ফারজানা ও সুমাইয়ার লাশের ময়না তদন্ত সম্পন্ন হয়। মঙ্গলবার রাত সাড়ে সাতটায় কাশি বাটি টাইগার ক্লাব মাঠে ফারজানার নামাজে জানাজার শেষে পারিবারিক কবরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।
এদিকে ফারজানা আক্তারকে গ্রামে এনে দাফন করা হলে নতুন করে হামলা করা হবে বলে এলাকায় প্রচার হয়। ফলে সুমাইয়ার স্বজনরা লাশ মর্গে রেখে আসতে বাধ্য হয়। বুধবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত সুমাইয়া লাশ মর্গে পড়েছিল। কাশিবাটি একটি গ্রামের হাফিজুল ইসলামের স্ত্রী তোউফাতুন্নেসা জানান, এলাকায় উত্তেজনা থাকায় তার দেবর মনিরুল ইসলামের স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার এর লাশ বুধবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত হাসপাতালের মর্গ থেকে আনা সম্ভব হয়নি। এমনকি এই দুটি মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় নানান অপপ্রচার চলছে। মনিরুল ঢাকা থেকে সাতক্ষীরায় ফিরলেও নতুন করে হামলার ভয়ে সে বাড়িতে আসতে পারেনি। তার একমাত্র তিন বছরের মেয়ে আনিসাকে তার নানী নিয়ে গেছে। সুমাইয়া আক্তার এর লাশ যাতে দাফন করা যায় সেজন্য পুলিশের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। কাজলা কাশিবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নুরুন্নাহার পুতুল জানান, ফারজানা সুলতানা তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তার রোল নাম্বার ছিল১। বরাবরই সে মেধাবী ছিল। সোমবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে ক্লাসরুম খোলার সাথে সাথে ফারজানা টেবিলের ড্রয়ারে ব্যাগ রেখে বেরিয়ে যায়। পরবর্তীতে সুমাইয়া আক্তারকে হাত পা বেঁধে নির্যাতনের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে মর্মে জানতে পারে।
ফারজনার মৃত্যুর পর তিনি ও তার সহকর্মীরা তাদের বাড়িতে গেছেন। জন্মদিনে বাবা -মা ফারজানাকে হাজার টাকা জোড়া সোনার দুল বানিয়ে দেন। ঋণগ্রস্ত ভাজা মুড়ি বিক্রেতা সুমাইয়া আক্তার কয়েকদিন ধরে ফারজানাকে মুড়ি খাইয়ে টাকা নিত না মর্মে তার মায়ের কাছ থেকে জানতে পারেন।ওই দুটি সোনার দুলের জন্য সুমাইয়া৷ স্কুল ছাত্রী ফারজানাকে হত্যা করেছে মর্মে তার পরিবারের লোকজন মনে করে। কাশিবাটি গ্রাম ও কারবালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী সাব্বির হোসেন জানান, একটি হত্যার পর হত্যাকারীকে সুমাইয়া আক্তার কে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নিই দিয়ে ফেললে হত্যা করা হয়েছে সেটা ন্যয় বিচার ও আইনের পরিপন্থী। যেভাবে নৃশংসভাবে দিয়ে ইট দিয়ে সুমাইয়াকে হত্যা করা হলো সেটাও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। এরপরও সুমাইয়ার লাশ দাফন করতে না পারা পুলিশের ব্যর্থতা টাকেই প্রমাণ করে।।
কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শহিদুল ইসলাম জানান, সুমাইয়ার লাশ যে দাফন করা হয়নি এটা তিনি জানেন না। দাফন করা না হলে হাসপাতালে থাকতে পারে। লাশ দাফনের সমস্যা হলে পুলিশ অবশ্যই সমাধানের উদ্যোগ নেবে। বুধবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত দুটি হত্যার ঘটনায় আমার কোন মামলা হয়নি তবে প্রস্তুতি চলছে।
(আরকে/এসপি/জুলাই ২২, ২০২৬)
