মোঃ ইমদাদুল হক সোহাগ


১. ভূমিকা: বিশ্বায়ন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও প্রান্তিক ক্রয়ক্ষমতার দ্বন্দ্ব উন্নয়নশীল বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত প্রবৃদ্ধির চোখধাঁধানো পরিসংখ্যান শোনানো হয়। সরকারি নথিপত্রে স্থূল অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধির গ্রাফ ওপরের দিকে উঠলেও সাধারণ নাগরিক যখন প্রতিদিন বাজারে যান, তখন এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল বা জ্বালানির দাম মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সাধ্যের বাইরে চলে যায়। এর কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদরা প্রায়ই চিরাচরিত ব্যাখ্যা দেন—‘যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়ানো হয়েছে’ কিংবা ‘আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটেছে’।

কিন্তু একটি মৌলিক ও অপ্রিয় প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া হয়: আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইউএস ফেড)-এর একটি অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত বা সুদের হার বাড়ানোর খেসারত কেন ঢাকার একজন রিকশাচালক, নিম্নবিত্ত পরিবার বা মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীকে নিজের কষ্টের উপার্জন উজাড় করে দিতে হবে? এই বৈষম্য দুর্ঘটনাবশত তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটি তৈরিই করা হয়েছে এমনভাবে, যাতে কেন্দ্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রান্তিক বা পেরিফেরি দেশগুলোর অর্থনীতিকে সরাসরি শুষে নিতে পারে। যখনই ওয়াশিংটনে ডলার শক্তিশালী হয়, তখন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তৈরি হয় আমদানিকৃত মুদ্রাস্ফীতি (Imported Inflation)। বিদেশী মূলধন দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মার্কিন বাজারে পাড়ি জমায় (Capital Flight)। ফলে স্থানীয় মুদ্রার মান পতনের সাথে সাথে প্রান্তিক জনগণের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এক লহমায় সংকুচিত হয়ে পড়ে।

২. ‘সার্কাসের হাতি’র উপমা ও প্রাতিষ্ঠানিক মনস্তাত্ত্বিক অবরুদ্ধতা

আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর আত্মঘাতী আচরণ বোঝার জন্য 'সার্কাসের হাতি'র উপমাটি অত্যন্ত প্রামাণ্য। শৈশবে একটি হাতির বাচ্চাকে যখন লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়, সে বারবার চেষ্টা করেও তা ভাঙতে পারে না। ক্রমাগত ব্যর্থতার ফলে তার মস্তিষ্কে তৈরি হয় এক ধরনের 'শেখা অসহায়ত্ব' (Learned Helplessness)। পরবর্তীতে হাতিটি যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে বিশাল ক্ষমতার অধিকারী হয়, তখন তাকে সামান্য একটি সুতির দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখলেও সে আর পালানোর চেষ্টা করে না। কারণ তার স্মৃতিতে গেঁথে থাকে—এই বন্ধন ছেঁড়া অসম্ভব।

আজকের বৈশ্বিক আর্থিক রাজনীতিতে গ্লোবাল সাউথ ঠিক একইভাবে শৃঙ্খলিত। নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশাল জনসংখ্যা, কাঁচামাল এবং বিশাল ভোক্তা বাজার থাকা সত্ত্বেও উন্নয়নশীল দেশগুলো ধরে নিয়েছে—মার্কিন ডলার এবং পশ্চিমা পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য একপাও এগোতে পারে না। নিজেরা উৎপাদিত পণ্য নিজেদের মধ্যে কেনাবেচা করার সময়ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে একটি তৃতীয় দেশের মুদ্রাকে মেনে নেওয়ার এই প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরশীলতাই হলো একবিংশ শতাব্দীর 'অর্থনৈতিক দাসত্ব'। "নিজেরা উৎপাদিত পণ্য নিজেদের মধ্যে কেনাবেচা করার সময়ও তৃতীয় কোনো দেশের মুদ্রাকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে মেনে নেওয়াই হলো একবিংশ শতাব্দীর অর্থনৈতিক দাসত্ব।"

৩. ডলারের বৈশ্বিক একচ্ছত্র আধিপত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক শাসন

মার্কিন ডলারের এই একচেটিয়া আধিপত্য কেবল কোনো মেটাফোর বা মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক অর্থবাজারের একটি সুনির্দিষ্ট বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো। ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটলমেন্টস (BIS)-এর সাম্প্রতিক ট্রাইএনিয়াল সেন্ট্রাল ব্যাংক সার্ভির উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে এই সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন গড়ে ৯.৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন (FX Turnover) সম্পাদিত হয়। এই সুবিশাল বৈশ্বিক লেনদেনের ৮৯ শতাংশেই কোনো না কোনো পক্ষে মার্কিন ডলার যুক্ত থাকে। আন্তর্জাতিক ফরেন এক্সচেঞ্জ সোয়াপ (FX Swaps)-এর দৈনিক লেনদেনই দাঁড়িয়েছে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে।

অন্যদিকে, বৈশ্বিক ব্যাংক লেনদেনের প্রধান বার্তাপ্রেরণকারী মাধ্যম বেলজিয়ামভিত্তিক সুইফট (SWIFT) নেটওয়ার্ক। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পেমেন্ট মেটাতে সুইফটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে কোনো দেশকে যদি যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক কারণে সুইফট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তবে সেই দেশটির পুরো অর্থব্যবস্থা রাতারাতি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এভাবে প্রযুক্তি ও মুদ্রার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ডলারকে বৈশ্বিক রাজনীতির প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

৪. আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও একক ‘ভেটো’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ব্রেটন উডস' সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংক দারিদ্র্য বিমোচন ও স্থিতিশীলতার জপমালা জপলেও, তাদের পরিচালন পদ্ধতি চরম বৈষম্যমূলক।

আইএমএফ-এ সদস্য দেশগুলোর ভোটিং ক্ষমতা নির্ধারিত হয় তাদের অর্থনীতির আকার অনুযায়ী প্রদান করা কোটা দ্বারা। নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো প্রধান নীতিমালা সংশোধনের জন্য কমপক্ষে ৮৫ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে আইএমএফ-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একারই ভোটিং ক্ষমতা রয়েছে ১৬.৪৯ শতাংশ এবং কোটা শেয়ার ১৭.৪৬ শতাংশ। এর ফলে ওয়াশিংটন একাই যেকোনো প্রস্তাবিত বৈশ্বিক আর্থিক নীতিতে সরাসরি 'ভেটো' দেওয়ার অকাট্য ক্ষমতা ভোগ করে।
অপরদিকে, বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও চীনের ভোটিং ক্ষমতা মাত্র ৬.০৮ শতাংশে আটকে রাখা হয়েছে। জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক অবদানের দিক থেকে গ্লোবাল সাউথের হিস্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও, ব্রেটন উডস সংস্থাসমূহের নিয়ন্ত্রক আসন এখনো পশ্চিমা বিশ্বের দখলেই রয়ে গেছে।

৫. ক্ষুদ্র-অর্থনৈতিক কেস স্টাডি: ‘ডিসিসি’ কৌশল ও হিডেন ফি’র ফাঁদ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থার এই মোড়লগিরি কেবল সামষ্টিক অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি আঘাত হানে সাধারণ ভ্রমণকারী, প্রবাসী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পকেটে। সম্প্রতি একজন আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারী মালয়েশিয়া ভ্রমণে গিয়ে যখন আন্তর্জাতিক কার্ড (ভিসা, মাস্টারকার্ড, অ্যামেক্স) দিয়ে কেনাকাটা করতে যান, তখন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ডলারে পেমেন্ট না নিয়ে কেবল মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতে (MYR) পেমেন্ট নিতে বাধ্য হন। এর কারণ, মালয়েশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ব্যাংক নেগারা মালয়েশিয়া)-এর 'ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি নোটিশ ৪' অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ সীমানায় যেকোনো সেবা বা পণ্যের লেনদেন স্থানীয় মুদ্রায় নিষ্পন্ন করা একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। এটি মূলত অনিয়ন্ত্রিত 'ডলারাইজেশন' রোধে মালয়েশিয়ার মুদ্রানীতিগত সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার একটি পদক্ষেপ।

তবে আসল কারসাজিটি করা হয় আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে এবং একুয়ারিং ব্যাংকগুলোর ব্যবহৃত 'ডাইনামিক কারেন্সি কনভার্সন' (DCC) কৌশলের মাধ্যমে। যখন একজন বিদেশী নাগরিক কার্ড পেমেন্ট করেন, তখন পেমেন্ট নেটওয়ার্ক প্রথমে রিঙ্গিতকে ডলারে এবং পরবর্তীতে ডলারকে কার্ডধারীর স্থানীয় মুদ্রায় (যেমন টাকা) রূপান্তর করে। এই দ্বৈত রূপান্তরের সুযোগে পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ও ইস্যুকারী ব্যাংকগুলো ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত 'ক্রস-বর্ডার মার্কআপ ফি' কেটে নেয়। এর সাথে সার্ভিস ভ্যাট যুক্ত হয়ে সাধারণ নাগরিককে প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত অন্যায্য অতিরিক্ত হিডেন ফি গুনতে হয়।

একই চিত্র দেখা যায় ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ থেকে গুগল, মেটা, আমাজন বা নেটফ্লিক্স-এর সার্ভিস কিনতে গেলে সরাসরি টাকায় নিষ্পত্তির নিজস্ব অবকাঠামো না থাকায়, ডলারে পেমেন্ট অনুমোদন দিতে বাধ্য হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলারের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অপচয় ঘটে এবং অতিরিক্ত চার্জের বোঝা পড়ে গ্রাহকের ওপর।

৬. এশীয় বাণিজ্যে ডলার অপসারণের ৩ প্রধান প্রযুক্তিগত বাধা

প্রশ্ন উঠতেই পারে—এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের মধ্যে পণ্য লেনদেনের সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ডলার ব্যবহার করবে কেন? কেন বাংলাদেশ, ভারত, চীন বা মালয়েশিয়া সরাসরি নিজস্ব মুদ্রায় কেনাবেচা করতে পারছে না? এর পেছনে তিনটি শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত দেয়াল রয়েছে:

১. গভীর বাণিজ্য ঘাটতি: বাংলাদেশ চীন বা ভারত থেকে বছরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করলেও সমপরিমাণ রপ্তানি করতে পারে না। এখন সম্পূর্ণ বাণিজ্য টাকা-রুপিতে নিষ্পত্তি করতে চাইলে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ 'বাংলাদেশি টাকা' জমতে থাকবে। কিন্তু সেই টাকা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণীয় না হওয়ায় ভারত তা দিয়ে অন্য কোনো দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল বা উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতি কিনতে পারবে না।

২. অবাধ রূপান্তরযোগ্যতার অভাব: মার্কিন ডলার, ইউরো বা জাপানি ইয়েনের মতো এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলোর মুদ্রা আন্তর্জাতিক বাজারে অবাধে রূপান্তরযোগ্য (Convertible) নয়। কোনো মুদ্রাকে বৈশ্বিক বাণিজ্য মুদ্রা হতে হলে তার পেছনে গভীর মূলধনী বাজার, অনিয়ন্ত্রিত মুদ্রা প্রবাহ এবং রাজনৈতিক বিশ্বস্ততার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি থাকতে হয়, যা এশীয় মুদ্রায় এখনো অনুপস্থিত।

৩. ভূ-রাজনৈতিক অবিশ্বাসের দেয়াল: ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক হয়ে 'ইউরো' চালু করতে পেরেছিল কারণ তাদের মাঝে রাজনৈতিক ঐকমত্য ছিল। কিন্তু এশিয়ার দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত দ্বন্দ্ব ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। ভূ-রাজনৈতিক কারণে ভারতের পক্ষে চীনের 'ইউয়ান'কে একক এশীয় বাণিজ্য মুদ্রা হিসেবে মেনে নেওয়া অসম্ভব, কারণ এতে এশিয়ার অর্থনীতিতে বেইজিংয়ের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

৭. উদীয়মান বিকল্প: আসিয়ান এলসিটি, কিউআর কানেক্টিভিটি ও ব্রিকস

ডলারের অনিয়ন্ত্রিত দরবৃদ্ধি ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অস্ত্রায়ন থেকে বাঁচতে গ্লোবাল সাউথ এখন বিকল্প আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তুলছে:

● আসিয়ান এলসিটি ফ্রেমওয়ার্ক: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ান ডলারে নির্ভরতা কমাতে 'Local Currency Transaction (LCT) Framework' চালু করেছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম এখন তাদের আঞ্চলিক বাণিজ্যে সরাসরি স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহার বৃদ্ধি করছে।

● ক্রস-বর্ডার কিউআর পেমেন্ট: আসিয়ান দেশগুলো তাদের জাতীয় কিউআর পেমেন্ট নেটওয়ার্কগুলোকে যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে একজন থাই পর্যটক ইন্দোনেশিয়ায় গিয়ে ভিসা/মাস্টারকার্ডের অতিরিক্ত ফি ছাড়াই নিজ দেশের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ দিয়ে সরাসরি স্থানীয় মুদ্রায় কেনাকাটা করতে পারছেন।

● পেট্রো-ইউয়ান ও সিআইপিএস: চীন মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার কাছ থেকে তেলের মূল্য পরিশোধে নিজস্ব মুদ্রা 'ইউয়ানে' লেনদেন উৎসাহিত করছে। সুইফটের বিকল্প হিসেবে তারা সিআইপিএস (CIPS) প্রসারিত করছে।

● ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB): ব্রিকস জোটের ব্যাংক সদস্য দেশগুলোকে ডলার ঋণের বদলে স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ প্রদান শুরু করেছে, যা উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে বিনিময় হারের ধ্বংসাত্মক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করছে।

৮. বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত নীতি-সুপারিশ

সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির আঘাত থেকে জাতীয় অর্থনীতিকে বাঁচাতে বাংলাদেশ সরকারের জন্য অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য চারটি নীতিগত পদক্ষেপ প্রস্তাব করা হলো:

১. দ্বিপাক্ষিক পেমেন্ট চুক্তি সম্প্রসারণ: ভারত, চীন ও মালয়েশিয়ার মতো প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের সাথে টাকা-রুপি বা টাকা-ইউয়ানে বাণিজ্যের সীমা ও আইনি পরিকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণ করা।

২. আঞ্চলিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্তি: বাংলাদেশের 'বাংলা কিউআর' পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আসিয়ানের 'রিজিওনাল পেমেন্ট কানেক্টিভিটি' (RPC) নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করা। এতে প্রবাসী ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীরা কার্ড নেটওয়ার্কের ৩–৭% প্রচ্ছন্ন ফি এড়াতে পারবেন।

৩. বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের বৈচিত্র্যায়ন: বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে এককভাবে ডলারের ওপর ঝুঁকি না রেখে সোনা, আইএমএফের বিশেষ ড্রয়িং রাইটস (SDR) এবং রূপান্তরযোগ্য অন্যান্য আঞ্চলিক মুদ্রার অনুপাত বৃদ্ধি করা।

৪. ডিজিটাল জায়ান্টদের ওপর স্থানীয় মুদ্রা নিষ্পত্তির শর্ত: গুগল, মেটা, আমাজন বা নেটফ্লিক্স-এর মতো বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে সেবা প্রদান করতে হলে দেশীয় ব্যাংকিং চ্যানেলে সরাসরি টাকায় পেমেন্ট সেটেলমেন্টের আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করা।

৯. উপসংহার: আধুনিক অর্থব্যবস্থার শৃঙ্খলমুক্তি

মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য কোনো চিরন্তন বা প্রাকৃতিক নিয়ম নয়; এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিয়ন্ত্রণের একটি কৃত্রিম ব্যবস্থা। জিডিপির প্রবৃদ্ধির কৃত্রিম পরিসংখ্যান দেখিয়ে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের অন্যায্য অর্থনৈতিক শোষণ আড়াল করা যাবে না।

সার্কাসের হাতির মনস্তাত্ত্বিক অবরুদ্ধতা ভেঙে উন্নয়নশীল বিশ্বকে আজ জেগে উঠতে হবে। আঞ্চলিক মুদ্রা সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত কিউআর কানেক্টিভিটি এবং স্বাধীন আর্থিক কাঠামোর বিকাশ ঘটিয়ে ডলারের এই একচেটিয়া আধিপত্য মোকাবিলা করা কেবল কোনো অর্থনৈতিক পছন্দ নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের মতো উদীয়মান দেশের টিকে থাকা এবং প্রকৃত ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের একমাত্র পথ।

লেখক: গবেষক ও ভূ-অর্থনৈতিক নীতি বিশ্লেষক।