মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু


একটি রাষ্ট্র তখনই নিঃশব্দে ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে, যখন তার সাংবিধানিক স্তম্ভগুলো নড়বড়ে হয়ে আসে। আর সে সংকট যখন নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাস্তু এবং নিরাপত্তার মৌলিক অধিকারকে গ্রাস করে—তখন তা কেবল রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, পরিণত হয় অস্তিত্বের চূড়ান্ত সংকটে। দেশের সাম্প্রতিক চিত্রপত্র, প্রতিদিনের সংবাদ শিরোনাম কিংবা রাজপথের ধুলাবালি থেকে যে বার্তা ভেসে আসছে, তা স্পষ্ট ও ভারী। সাংবিধানিক অনিশ্চয়তা আর অনিশ্চিত রাজনীতির দোলাচলে আজ বাংলাদেশ এমন এক অন্ধকারের মুখোমুখি, যেখানে রাজপথ থেকে গৃহকোণ-সর্বত্র এক অদ্ভুত আশঙ্কার দীর্ঘশ্বাস।

রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি ভিত্তি আজ এতটাই ভঙ্গুর রূপ ধারণ করেছে যে, একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক ক্রিয়াশীলতা প্রায় সম্পূর্ণ ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। রাষ্ট্র যখন তার মূল দায়িত্ব—নাগরিকের ন্যূনতম নিরাপত্তা দেওয়া-পালনে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রীয় অকার্যকরতার আতঙ্ক গ্রাস করে সমাজকে। তবে আজ রাজপথে ও লোকালয়ে যে বিশৃঙ্খলা দৃশ্যমান, তা কিন্তু রাতারাতি এক দিনে তৈরি হয়নি কিংবা কেবল রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের মতো কোনো একক ঘটনার আকস্মিক পরিণতি নয়। মূলত গত ৫ই আগস্টের পর থেকেই এক অশুভ ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোয় যে চরম শিথিলতা তৈরি হয়েছিল, তা-ই আজ ডালপালা মেলে এক বিশাল বৃক্ষে রূপ নিয়েছে। ৫ই আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর ও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার যে ধস শুরু হয়েছিল, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কিংবা শীর্ষ পর্যায়ের সাংবিধানিক শূন্যতা সেই চলমান সংকটকে কেবল আরও বহুগুণ ঘনীভূত ও বেগবান করেছে মাত্র। শাসনব্যবস্থার শুরু থেকেই সৃষ্ট এই দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক শূন্যতার কারণে শীর্ষ তরী থেকে শুরু করে একদম নিচের তলা পর্যন্ত রাষ্ট্র আজ এক অভূতপূর্ব পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় পতিত।

শাসনতান্ত্রিক ও আইনি এই ধারাবাহিক শিথিলতার বিষাক্ত সুযোগটি শুরু থেকেই গ্রহণ করে আসছে সমাজের নিকৃষ্টতম দুষ্কৃতকারী ও সুযোগসন্ধানী চক্র। ৫ই আগস্টের পর তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক ধোঁয়াশাকে কাজে লাগিয়ে দেশজুড়ে যে চাঁদাবাজি, নগ্ন দখলদারি এবং নিরবচ্ছিন্ন লুটপাটের অশুভ মহোউৎসব শুরু হয়েছিল, তা আজও নিরবচ্ছিন্নভাবে বজায় রয়েছে। সাধারণ গৃহস্থের বছরের পর বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা বাসাবাড়ি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর রক্তজল করা ঘামে দাঁড় করানো দোকান কিংবা ছোট বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আজ গায়ের জোরে দখল হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে, অথচ আইন রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি যেন এক দূরের অচেনা ছায়া। কোনো বাধা না পেয়ে, কোনো আইনি প্রতিরোধের মুখোমুখি না হয়ে অপরাধীরা যখন দিনের পর দিন এই তাণ্ডব চালিয়ে যায়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে সভ্যতার পোশাক খুলে আমরা এক আদিম জঙ্গল রাজত্বের দিকে হেঁটে যাচ্ছি।

এমন এক জটিল বাস্তবতায় আজ সচেতন মানুষের মনে ইতিহাস ও বর্তমানের নানা হিসাব-নিকাশ উঁকি দিচ্ছে। যুগে যুগে—১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, কিংবা ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম—ছাত্র সমাজ সবসময় রাষ্ট্রকে অন্যায় ও শোষণের পথ থেকে ফিরিয়ে আনার মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ছাত্র আন্দোলনের সেই ঐতিহাসিক ইতিবাচক অবদানগুলোই জাতিকে বারবার নতুন জীবনের দিশা দিয়েছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে শিখিয়েছে এবং একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছে। আন্দোলনের পেছনের মূল চেতনাও ছিল শাসনব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে যে রাজনৈতিক শূন্যতা ও অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশের সামনে এক আশঙ্কাজনক বিপরীত বাস্তবতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার আকস্মিক ধস, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তাহীনতা এবং সুযোগসন্ধানী চক্রের অপতৎপরতা ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহাসিক সাফল্য ও মূল স্পিরিটকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে। আন্দোলনের ইতিবাচক অর্জনগুলো পাওয়ার বিপরীতে পরবর্তী এই অরাজকতা ও অস্থিরতা হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংহত সামাজিক মূল্যবোধ এবং সাধারণ মানুষের শান্তিময় জীবনযাত্রাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এমন এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে দেশের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে হাটে-বাজারে, গণপরিবহনে ও আড্ডায় কেবলই এক থমথমে আলোচনা-‘দেশটা আসলে কোন দিকে যাচ্ছে?’ গণমাধ্যমজুড়ে ছড়িয়ে থাকা খবর আর সাধারণ জনতার চোখেমুখে ছড়িয়ে থাকা এই চাপা অসন্তোষ দেখে আজ সচেতন মহলে বড় এক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে: বাংলাদেশ কি তবে আরও এক নতুন ও বড় ধরনের গণবিস্ফোরণ বা চরম রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত হচ্ছে? ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যখনই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়—তখন রাজপথই হয়ে ওঠে শেষ আশ্রয়স্থল। বর্তমানের এই দিশাহীনতা, সর্বব্যাপী নিরাপত্তাহীনতা এবং আইনি শূন্যতা নাগরিক মনে যে গভীর ক্ষোভ সঞ্চার করছে, তা স্পষ্টতই একটি নতুন গণবিস্ফোরণ বা বড় ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের আগাম বার্তা বহন করে।

আস্থার এই চরম খরার দিনে সাধারণ মানুষের মন থেকে আইনের প্রতি বিশ্বাসটুকুও দ্রুত উঠে যাচ্ছে। রাজপথে প্রকাশ্যে মানুষকে পিটিয়ে মারার যে বর্বরোচিত দৃশ্য আমরা দেখছি—যাকে সুশীল ভাষায় 'মব জাস্টিস' বলা হয়—তা মূলত রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার ওপর চরম অনাস্থারই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে পুরোনো সেই বিষাক্ত সংস্কৃতি: গায়েবি ও মিথ্যা মামলার ঢালাও বাণিজ্যে সাধারণ নিরপরাধ মানুষকে জড়িয়ে দেওয়া। এর ফলে একদিকে যেমন মূল দখলদার ও অপরাধীরা অধরা থেকে যাচ্ছে, অন্যদিকে আইনি বেড়াজালে পিষ্ট হয়ে কাঁদছে নিরীহ পরিবারগুলো।

কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষত তৈরি হচ্ছে আমাদের সমাজদেহের সুকোমল অংশে। এই ঘোর অরাজকতার প্রথম ও প্রধান শিকার হচ্ছেন আমাদের নারী ও শিশুরা। নিজের চেনা ঘরে, রাতের অন্ধকারেও আজ নারীদের নিরাপত্তা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাসাবাড়িতে তাণ্ডবের সাথে সাথে বাড়ছে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ। যে রাষ্ট্রে একজন নারী তার নিজ গৃহে, কিংবা রাজপথে স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস ফেলতে ভয় পায়-সেখানে বড় বড় সংস্কার, প্রবৃদ্ধি বা স্বাধীনতার ভাষণ বড্ড ফাঁপা এবং অর্থহীন শোনায়।

এই সর্বগ্রাসী আঁধার কোনো চিরন্তন সত্য হতে পারে না, হতে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশ ইতিপূর্বে অনেক ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে এই অশুভ অধ্যায় থেকে উৎরাতে হলে রাষ্ট্রকে তার হারানো রুদ্ররূপ পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। রাজনীতিকে রাজপথের সংঘাত থেকে বের করে এনে পারস্পরিক সহনশীলতা ও জাতীয় রাজনৈতিক ঐকমত্যের টেবিলে সমাপিত করতে হবে; ৫ই আগস্ট পরবর্তী তৈরি হওয়া শাসনতান্ত্রিক সংকট ও পরবর্তীতে রাষ্ট্রপ্রধানের পদত্যাগের মতো জটিলতায় সৃষ্ট সাংবিধানিক জট কাটাতে হবে সর্বজনগ্রাহ্য আইনি পথ ও পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে। একই সাথে দল-মত নির্বিশেষে সকল চাঁদাবাজ, লুটেরা ও দখলদারদের বিরুদ্ধে সেনা ও পুলিশের কঠোর যৌথ অভিযান এখন সময়ের দাবি। ভুয়া মামলা, মব কালচার এবং ইতিহাস-সংস্কৃতি ধ্বংসকারী সুযোগসন্ধানীদের কঠোর বিচারিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত রুখে দিতে হবে।

লুটপাট আর দখলের রাজত্ব কখনো কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের গৌরবোজ্জ্বল পরিচয় হতে পারে না। ক্ষমতা বদল কিংবা রাষ্ট্রের সংস্কারের একমাত্র সার্থকতা নিহিত থাকে একজন সাধারণ নাগরিকের রাতে শান্তিতে ঘুমোতে যাওয়ার নিশ্চয়তার ওপর, আমাদের গৌরবময় ইতিহাস ও মুক্তিকামী চেতনার স্বাভাবিক সুরক্ষার ওপর। রাজনীতির রক্তচক্ষু আর লোভের খেলা বন্ধ করে যদি এখনই সাধারণ মানুষের জীবন, সম্পত্তি ও নারীদের মান-সম্মান রক্ষায় রাষ্ট্র কঠোর না হয়—তবে ইতিহাসের পাতায় এই সময়টি কেবল একটি রাজনীতির পরিবর্তন হিসেবে নয়, একটি রাষ্ট্রের ভেঙে পড়ার করুণ কাহিনী হিসেবে লেখা থাকবে। সময় বড্ড কম, আর দেশের সাধারণ মানুষের সহ্যের সীমানাও আজ শেষপ্রান্তে।

লেখক : একজন কবি।