মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু


বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে একটি পরম সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—প্রশাসনিক বলপ্রয়োগ বা রাজনৈতিক দমন-পীড়ন দিয়ে কোনো বিপুল জনভিত্তি সম্পন্ন ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক শক্তিকে চিরতরে স্তব্ধ করা যায় না। সংকট কিংবা ক্ষমতার অতল গহ্বর, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকেই বারবার ফিনিক্স পাখির মতো নতুন সত্তা নিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটেছে এ দেশের অন্যতম প্রাচীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের।

সাম্প্রতিক সময়ের ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও নজিরবিহীন রাজনৈতিক ঝড়ের পর প্রতিপক্ষ শিবির ভেবেছিল দলটি হয়তো দীর্ঘকালের জন্য রাজনীতির প্রেক্ষাপট থেকে ব্যাকফুটে চলে গেছে। কিন্তু দৃশ্যমান পরিস্থিতির গভীরে চোখ রাখলে ভিন্ন এক সত্য উন্মোচিত হয়। ক্ষমতার বলয় থেকে ছিটকে পড়ার পর মামলা-হামলা, গণগ্রেপ্তার, গুম এবং পরিবারগুলোর ওপর নেমে আসা চরম অনিশ্চয়তাকে পুঁজি করেই আওয়ামী লীগ নতুন এক ইস্পাতকঠিন সংকল্প নিয়ে সংগঠিত হচ্ছে। আঘাতের মাত্রা যত তীব্র হচ্ছে, রাজপথের এই চিরচেনা শক্তির প্রতিরোধ ততটাই ক্ষুরধার ও সুসংগঠিত রূপ ধারণ করছে।

বর্তমানে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে একদম গ্রাম-বাংলার ইউনিয়ন ও প্রান্তিক ওয়ার্ড পর্যায়ের লাখো নেতাকর্মী প্রতিদিন চরম ভয়ভীতি ও মারাত্মক আইনি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস ও ভাঙচুর হওয়া ঘরবাড়ির স্তূপ আজ আর কেবল কোনো নিভৃত কান্নায় আবদ্ধ নেই; তা পরিণত হয়েছে শোষণের বিরুদ্ধে এক সুসংগঠিত প্রতিরোধের সুতীব্র দাবানলে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের মৌলিক নিয়ম হলো, বিপুল জনভিত্তিসম্পন্ন কোনো সুসংগঠিত শক্তিকে প্রশাসনিক বল প্রয়োগে যত বেশি কোণঠাসা করার চেষ্টা চালানো হয়, তাদের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক সংকল্প ততটাই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। কর্মীদের ভেতরের এই গভীর ক্ষোভ আর প্রতিকূলতা জয়ের সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞাই এখন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ধমনীতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করছে।

তবে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নাম করে আঘাত হানা হয়েছে স্বাধীন বাঙালি জাতিসত্তার মৌলিক ভিত্তিমূলে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, মহান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবমাননা, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের স্মৃতিনিদর্শন ধ্বংস, বিভিন্ন স্থানে তাঁর ম্যুরাল ও ভাস্কর্য ভাঙচুর এবং সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের অম্লান চেতনা ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে পদদলিত করার যে চেষ্টা চালানো হয়েছে, তা দেশপ্রেমিক যেকোনো নাগরিকের হৃদয়কে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ইতিহাসকে মুছে ফেলার এই নজিরবিহীন অপচেষ্টা এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বাতন্ত্র্যের ওপর পরিকল্পিত আঘাত সাধারণ মানুষ ও তৃণমূল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অনুভূতির গভীরে এক বিরতিহীন আগুনের জন্ম দিয়েছে। জাতির পিতার অপমান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধারের এই ব্যাকুলতাই আজ আওয়ামী লীগের শক্তির সবচেয়ে বড় আদর্শিক ও আত্মিক উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, ক্ষমতার মসনদে বসে বর্তমান সরকারের নজিরবিহীন প্রশাসনিক স্থবিরতা, চরম দুর্বলতা ও নীতিগত ব্যর্থতা রাজনীতির ময়দানে আওয়ামী লীগের অবস্থানের পুনর্প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে। দেশ পরিচালনায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতার অভাবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অভ্যন্তরীণ ধস নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। দেশের সর্বস্তরে ভয়াবহ আইনশৃঙ্খলাহীনতা, চুরি, ডাকাতি ও রাহাজানির ব্যাপক বিস্তার, লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজারে কৃত্রিম সিন্ডিকেটের কাছে আত্মসমর্পণ এবং নারী নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার চরম ধস আজ সাধারণ জনগণকে এক অনিশ্চিত গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে। দেশ পরিচালনায় সরকারের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের লেশমাত্র না থাকা দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে।

এর পাশাপাশি ক্ষমতার ছায়াতলে থাকা রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর বেপরোয়া মনোভাব ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহার সরকারের ভিত্তিকে ভেতর থেকে ভঙ্গুর ও অকার্যকর করে তুলছে। প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় প্রতিপক্ষকে দমনে ঢালাও মিথ্যা মামলা ও জুলুম-পীড়নের পাশাপাশি নজিরবিহীন লুটপাট, হাট-বাজার, পরিবহন খাত ও স্থাবর সম্পত্তি দখল এবং অলিগলিতে প্রকাশ্য চাঁদাবাজির মতো অনৈতিক অপকর্মে শাসকদলের নেতাকর্মীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গেছে।ক্ষমতার এই লাগামহীন অপব্যবহার এবং জনজীবনের ওপর নেমে আসা চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক অরাজকতা সরকারের কৌশলগত ও নীতিগত দেউলিয়াত্বকেই প্রতিবিম্বিত করে।

সরকারের এই চরম শাসনগত ব্যর্থতা, নৈরাজ্য এবং ইতিহাসের প্রতি অসংবেদনশীলতার সরাসরি খেসারত দিচ্ছে দেশের খেটে খাওয়া কোটি কোটি আমজনতা—দিনমজুর, প্রান্তিক কৃষক, মেহনতি মানুষ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি। যে পরিবর্তনের মিষ্টি আশ্বাস তারা শুনেছিল, প্রতিদিনের অন্যায়, লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও চরম নিরাপত্তাহীনতায় তা আজ ঘোর হতাশায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানের এই চরম স্থবিরতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ আজ গভীর দীর্ঘশ্বাসের সাথে স্মরণ করছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের অভূতপূর্ব মেগা প্রজেক্ট ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের বৈপ্লবিক দিনগুলোকে।

পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল কিংবা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বিশ্বমানের উন্নয়নকাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্মৃতিকথা এখন প্রতি ঘরে ঘরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। ফলে এই বিশাল খেটে খাওয়া ও সাধারণ জনতা নিজেদের জীবন ও জীবিকার স্বার্থেই আওয়ামী লীগের আমলের প্রবৃদ্ধি, যুগান্তকারী উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা ও দৃঢ় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের সোনালী দিনগুলোকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণে আনছে। সাধারণ মানুষের এই পুঞ্জীভূত অসন্তোষ ও শাসকদলের প্রতি অনাস্থা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ‘জনসমর্থনের জোয়ার’ এনে দিচ্ছে। শোষিত জনগণ ও আওয়ামী লীগের এই প্রচ্ছন্ন ঐক্য রাজপথে এক অনিবার্য ‘জনবিস্ফোরণের’ ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।

বাহ্যিক দৃষ্টিতে দলটির যে নীরবতা দেখা যাচ্ছে, তা নিছক পিছিয়ে যাওয়া বা গুটিয়ে থাকা নয়—বরং তা এক সুদূরপ্রসারী কৌশলগত রূপান্তর। দৃশ্যমান বড় রাজনৈতিক সমাবেশের ওপর চরম নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজপথগুলোতে কাকডাকা ভোরে বা নিস্তব্ধ রাতে যেভাবে নিমেষের মধ্যে শত শত সুসংগঠিত কর্মীর 'ঝটিকা মিছিল' রাজপথ কাঁপিয়ে পরক্ষণেই মিলিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়া নয়; বরং তা দলের অখণ্ড 'চেইন অব কমান্ড' ও যেকোনো সময় রাজপথ দখলে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক সক্ষমতারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

একই সঙ্গে ডিজিটাল স্পেস ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ময়ধানেও আওয়ামী লীগ অত্যন্ত সচেতন ও সুপরিকল্পিত অবস্থানে রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া ও সাইবার স্পেসে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে সমর্থকদের চাঙ্গা ও ঐক্যবদ্ধ রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের কাছে চলমান নিপীড়ন ও অরাজকতার অকাট্য তথ্য-উপাত্ত নিয়মিত পৌঁছে দিয়ে তারা কূটনৈতিক ভিত্তিকে আরও মজবুত করছে।

পরিশেষে বলা যায়, আওয়ামী লীগের রাজনীতির মূল শক্তি কোনো কাঁচের ঘরের ক্ষমতার সমীকরণে গড়ে ওঠেনি; এর আসল মূল শেকড় প্রোথিত রয়েছে কোটি কোটি অনুগত ও আপসহীন তৃণমূল কর্মীর রক্তের কণিকায়। বঙ্গবন্ধুর অবমাননার তীব্র জবাব, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধার, দৃশ্যমান উন্নয়নের অম্লান স্মৃতি, সরকারের চরম প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনকে সম্বল করে আওয়ামী লীগ আজ আর কোনো আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে নেই। বরং দ্বিগুণেরও বেশি উৎসাহ, সুসংগঠিত পরিকল্পনা এবং সাধারণ জনমানুষের প্রচ্ছন্ন সমর্থনকে সঙ্গী করে দলটি এখন রাজনীতির ময়দানে এক প্রলয়ঙ্করী মোড় পরিবর্তনের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে—যে ঝড় দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে রাতারাতি নতুন রূপ দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

লেখক : একজন কবি।