স্টাফ রিপোর্টার : দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনহীন পড়ে থাকা ৪৪টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নতুন রোডম্যাপ চূড়ান্তের পথে সরকার। বিনিয়োগ প্রস্তাব গ্রহণ থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ৭৭ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করার একটি কাঠামো নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বছরের পর বছর বন্ধ থাকা এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা, অলস সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে সরকারি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সম্পদে বেসরকারি বিনিয়োগ বা অংশীদারি গ্রহণের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত ফ্লোচার্ট ও সময়সীমাভিত্তিক প্রক্রিয়াগত কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎসহ ইউটিলিটি সংযোগ পেতে দীর্ঘ সময় ও বিপুল ব্যয় প্রয়োজন হয়। কিন্তু বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে এসব সুবিধার বড় অংশ আগে থেকেই বিদ্যমান।

ফলে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে দ্রুত শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পাঁচ করপোরেশনের ৪৪ প্রতিষ্ঠান : সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিনিয়োগের জন্য চিহ্নিত ৪৪টি প্রতিষ্ঠান পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের অধীন।
এর মধ্যে বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) ১৩টি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) ১২টি, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ১০টি, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) পাঁচটি এবং বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (বিএসইসি) চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ বহু বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। কোথাও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ, কোথাও সীমিত আকারে কার্যক্রম চলছে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের জমি, ভবন, গুদাম, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ এবং অন্যান্য অবকাঠামো বর্তমানে অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে। প্রায় ১০ হাজার একর শিল্প জমি ও বিদ্যমান অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে নতুন শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ এটি।

৭৭ কার্যদিবসের অনুমোদন কাঠামো : বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর সাত কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক যাচাই সম্পন্ন করবে। এরপর প্রস্তাব গ্রহণ, সংশোধনের জন্য ফেরত দেওয়া অথবা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

দ্বিতীয় ধাপে সম্পদের ধরন অনুযায়ী মূল্যায়ন, দরকষাকষি, বিনিয়োগ কাঠামো নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হবে। এ পর্যায়ে ইন্টার-এজেন্সি পাবলিক অ্যাসেট কমিটি (আইপিএসি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ ধাপের জন্য প্রায় ৫০ কার্যদিবস সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

তৃতীয় ধাপে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি (সিসিইএ) বা উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন নেওয়া হবে। এরপর চুক্তি স্বাক্ষর ও বিনিয়োগ কার্যক্রম শুরু হবে। এ ধাপের জন্য ধরা হয়েছে আরো ২০ কার্যদিবস। সব মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে সর্বোচ্চ ৭৭ কার্যদিবস সময় লাগবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অলস সম্পদকে অর্থনীতির মূলধারায় ফেরানোর সুযোগ : বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য বর্তমানে জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং ইউটিলিটি সংযোগ পেতে দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলোর ক্ষেত্রে এসব সুবিধার বড় অংশ আগেই বিদ্যমান। ফলে নতুন বিনিয়োগকারীরা দ্রুত উৎপাদনে যেতে পারবেন। একই সঙ্গে সরকারের অলস সম্পদও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হবে।’

তিনি বলেন, ‘এসব কারখানা ও শিল্প ইউনিটের আওতায় কয়েক হাজার একর শিল্প জমি রয়েছে। অনেক এলাকায় গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, সড়ক যোগাযোগ এবং শিল্প অবকাঠামো আগে থেকেই প্রস্তুত। ফলে পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত শিল্পায়নের সুযোগ রয়েছে।’

কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রভাব : সংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্প খাতে বিনিয়োগ মন্থর হয়ে পড়ার সময়ে এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের ধারণা, বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

বিশেষ করে পাট, টেক্সটাইল, রাসায়নিক, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং প্রকৌশল খাতে নতুন বিনিয়োগ এলে আমদানি বিকল্প পণ্য উৎপাদন বাড়বে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলারও সুযোগ তৈরি হবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিনিয়োগ আহবান করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা, সহজ ঋণপ্রাপ্তি, গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইনের সুবিধা : বৈঠকে উপস্থিত শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা অলস সম্পদ হিসেবে দেখতে চাই না। এসব প্রতিষ্ঠানের জমি, অবকাঠামো ও বিদ্যমান সুবিধা কাজে লাগিয়ে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কারখানাগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

তিনি বলেন, সম্প্রতি পাস হওয়া ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন-২০২৬’ দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও গতিশীল করবে। নতুন আইনের আওতায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষকে (পিপিপিএ) একীভূত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ গঠন করা হচ্ছে। এর ফলে বিনিয়োগ অনুমোদন, শিল্পাঞ্চল ব্যবস্থাপনা এবং পিপিপি কার্যক্রম একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আসবে, যা ৪৪টি বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

সিদ্ধান্তের দিকে নজর : বৈঠকসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ, অনুমোদন কাঠামো এবং বাস্তবায়ন সময়সূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি লিজ, যৌথ উদ্যোগ (জেভি), পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) অথবা সরাসরি বিনিয়োগে কোন মডেলে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হবে, সে বিষয়েও নীতিগত সিদ্ধান্তের ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, উদ্যোগটি সফল হলে দীর্ঘদিনের অলস রাষ্ট্রীয় সম্পদ নতুন করে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। আর ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প পুনরুজ্জীবনের আরেকটি সুযোগ হাতছাড়া হবে। তাই ৪৪টি কারখানাকে ঘিরে সরকারের এই নতুন রোডম্যাপকে দেশের শিল্প খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সৌজন্যে : কালের কণ্ঠ

(ওএস/এএস/জুলাই ২৯, ২০২৬)