প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প
বিকাশ স্বর্ণকার, বগুড়া : এক সময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ছিল বাঁশের তৈরি নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ছিল ব্যাপক ব্যবহার। ঘরের চালা, তীর-তালাপাড়া থেকে শুরু করে কুলা, চালুনি, ডালা, ডালি, ঝুড়ি, তালপাখা, শিশুদের দোলনা ও গবাদিপশুর ব্যবহার্য বিভিন্ন সামগ্রী—সবকিছুতেই ছিল বাঁশের আধিপত্য। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়া, প্লাস্টিক পণ্যের ব্যাপক প্রসার এবং কাঁচামালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে বগুড়ার আদমদীঘিতে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে।
স্থানীয়দের মতে, নব্বই দশকেও গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ মাটির ঘরের খড়ের ছাউনি ও বিভিন্ন নির্মাণকাজে বাঁশের ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। প্লাস্টিক ও অন্যান্য বিকল্প পণ্যের সহজলভ্যতা এবং কম দামের কারণে বাঁশের তৈরি সামগ্রীর চাহিদা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গেছে। ফলে বংশপরম্পরায় এ পেশায় জড়িত অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।
উপজেলার সান্দিড়া, ছাতিয়ানগ্রাম, নইকুল, জিনইর, তেতুলিয়া, বশিকোড়া, বন্তইর, বরিয়াবার্তাসহ প্রায় ১৫টি গ্রামের অন্তত ১০০টি পরিবার এখনও বাঁশ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তবে অধিকাংশই অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে কোনো রকমে পেশাটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। পুরুষদের পাশাপাশি সংসারের কাজ শেষ করে নারীরাও বাঁশের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী প্রস্তুত করে পরিবারের আয়-রোজগারে সহযোগিতা করছেন।
কারিগরদের অভিযোগ, আগে যে একটি বাঁশ ৮০ থেকে ১০০ টাকায় কেনা যেত, এখন একই বাঁশ কিনতে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। অথচ উৎপাদিত পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নির্মাণকাজে বাঁশের ব্যবহার বাড়লেও নতুন বাঁশঝাড় সেভাবে গড়ে না ওঠায় কাঁচামালের সংকটও বাড়ছে।
আদমদীঘি উপজেলা সদরের হাটে গিয়ে বাঁশ শিল্প বিক্রেতা দুলাল বসাক, গোপাল চন্দ্র, আব্দুল মজিদ ও আব্দুল জলিলের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা এ পেশার সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে ধারদেনা ও বিভিন্ন সমিতি থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে কোনো রকমে বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছেন।ৎ
তারা বলেন, "সরকার যদি স্বল্প সুদে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে এবং বাঁশ শিল্পের উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয়, তাহলে আমরা এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারব। অন্যথায় অচিরেই গ্রামবাংলার প্রাচীন এই কুটির শিল্প হারিয়ে যাবে।স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প সংরক্ষণে কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা এবং বাজারজাতকরণে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে বিলুপ্তির হাত থেকে এ শিল্পকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
(বিএস/এসপি/জুলাই ৩০, ২০২৬)
