তুলা চাষ নিয়ে ব্র্যাকের জাতীয় সংলাপ
দেশে তুলা চাষের অপার সম্ভাবনা, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রণোদনা
স্টাফ রিপোর্টার : জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনে সক্ষম ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ফসল হিসেবে তুলা চাষ সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। অথচ, দেশের বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত তুলার প্রায় ৯৭ ভাগই আমদানি করতে হয়, যার জন্য বছরে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে।
‘তুলাবিষয়ক জাতীয় সংলাপ: জলবায়ু-অভিযোজিত ফসল হিসেবে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আজ বৃহস্পতিবার ব্র্যাকের ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন কর্মসূচি (সিইআইপি) এই সংলাপের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে দেশে তুলা উৎপাদনের পথে বিদ্যমান কাঠামোগত বাধাগুলো পর্যালোচনা করা হয়। পাশাপাশি নীতি, গবেষণা, অর্থায়ন, সম্প্রসারণসেবা, বাজার উন্নয়ন এবং ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় বাস্তবসম্মত করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) মো. রেজাউল আমিন বলেন, সবদিক থেকেই তুলা একটি ইতিবাচক ফসল। কৃষকদের আর্থিক লাভের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে তুলা চাষ। এই খাতে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। সরকার তুলা চাষে কৃষকদের প্রণোদনা দিচ্ছে।
ব্র্যাকের ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন কর্মসূচি এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব এলাকায় কৃষিকাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে জলবায়ু সহনশীল ফসল হিসেবে তুলা ভালো বিকল্প। সরকারি-বেসরকারি অংশীজনেরা একত্রে কাজ করলে দেশে তুলা চাষ বাড়ানো সম্ভব।
কটনকানেক্ট সাউথ এশিয়া প্রাইভেট লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ কৃষিতত্ত্ব উপদেষ্টা ও পরামর্শক এবং তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে আনুমানিক ২ লাখ বেল (প্রতি বেলে ২২০ কেজি) তুলা উৎপাদিত হয়, যা জাতীয় চাহিদার ২ শতাংশের মতো। তুলা একটি কার্বন পজিটিভ ফসল। একবছর আগে সরকার তুলাকে কৃষিপণ্য ঘোষণা করেছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাঙামাটির মানিকছড়ির তুলা চাষী মিতালী চাকমা। তিনি বলেন, তুলা উন্নয়ন বোর্ড থেকে বীজ ও প্রশিক্ষণ পেয়েছিলাম। তিন বছর ধরে তুলা চাষ করছি। কৃষকদের মধ্যে তুলা চাষ নিয়ে বেশ আগ্রহ রয়েছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে পার্বত্য চট্টগ্রামে তুলা চাষ বাড়বে।
অনুষ্ঠানে আলোচকেরা বলেন, তুলা উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ কেবল চাষাবাদসংক্রান্ত নয়। জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুলাকে ধান, তামাক ও উচ্চমূল্যের শীতকালীন সবজির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। তুলা সংগ্রহের কাজও মূলত হাতে করা হয়। পাশাপাশি কৃষকেরা অর্থায়ন, কৃষি উপকরণ, সম্প্রসারণসেবা, সংরক্ষণ, জিনিং বা বীজ থেকে তুলার আঁশ আলাদা করা এবং নিশ্চিত বাজারসুবিধার ক্ষেত্রে নানা ঘাটতির মুখোমুখি হন।
আলোচনায় বরেন্দ্র অঞ্চল, উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকা, চর ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপ্রবণ অঞ্চলে তুলা চাষের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। তাপ ও খরা সহনশীল ফসল হিসেবে তুলা চাষে ধানের তুলনায় কম পানি প্রয়োজন। ফলে উপযুক্ত জমিতে এই ফসল নতুন জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে নির্বাচিত কিছু অঞ্চলে তামাক চাষের পরিবর্তে তুলা কৃষকদের জন্য আরও টেকসই বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্যে রাখেন সিইআইপি-এর কর্মসূচি প্রধান আবু সাদাত মনিরুজ্জামান খান। আরও বক্তব্য রাখেন কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. আবেদ চৌধুরী, তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক মো. কুতুব উদ্দীন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসান প্রমুখ।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক এশিয়া, প্রাইমার্ক ও উইগ্রোসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
(পিআর/এসপি/জুলাই ৩০, ২০২৬)
